আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্কের (DNN) মাধ্যমে দাবা খেলা, প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক ভাঁজ বা ভাষা অনুবাদের মতো বহু ক্ষেত্রে অতিমানবীয় দক্ষতা অর্জন করেছে। কিন্তু আজকের এই ডিপ লার্নিংয়ের মূল চালিকাশক্তি—ব্যাকপ্রপাগেশন (Backpropagation) অ্যালগরিদম—জীবন্ত মানব মস্তিষ্কে প্রয়োগ করা জীবতাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ অসম্ভব। বিখ্যাত “ওয়েট ট্রান্সপোর্ট প্রবলেম” থেকে শুরু করে মানব মস্তিষ্কের অবিশ্বাস্য ২০ ওয়াটের শক্তি বাজেট—তাত্ত্বিক স্নায়ুবিজ্ঞান জৈব স্নায়ুতন্ত্র ও কৃত্রিম সিলিকনের এই বৈপরীত্য বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতের নিউরোমরফিক কম্পিউটিং (Neuromorphic Computing)-এর পথ তৈরি করছে।
১. ব্যাকপ্রপাগেশন কেন জীবতাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব?
কৃত্রিম নেটওয়ার্কে লস বা ভুলের গ্র্যাডিয়েন্ট বের করতে আউটপুট থেকে ইনপুটের দিকে ভুলকে পিছন দিকে ঠেলে দিতে হয়:
delta_l = left( W_{l+1}^top delta_{l+1} right) odot sigma'(a_l)
জীবন্ত মস্তিষ্কে এটি কাজ না করার কারণগুলো হলো:
- ওয়েট ট্রান্সপোর্ট সংকট (Weight Transport Problem): ব্যাকপ্রপাগেশনের জন্য ফরোয়ার্ড ওজন ম্যাট্রিক্সের ঠিক ট্রান্সপোজ ($W^top$) প্রয়োজন। মস্তিষ্কে সামনের দিকে যাওয়া অ্যাক্সন এবং পিছন থেকে আসা ফিডব্যাক সংযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন সিন্যাপস দ্বারা গঠিত। একটি রিভার্স সিন্যাপস কোনোভাবেই ফরোয়ার্ড সিন্যাপসের সঠিক ওজন জানতে পারে না।
- ডেলের নীতি লঙ্ঘন: ব্যাকপ্রপে ঋণাত্মক বা নেগেটিভ গ্র্যাডিয়েন্টের প্রয়োজন হয়। কিন্তু একটি গ্লুটামেটার্জিক নিউরন পলকের মধ্যে ইনহিবিটরি নিউরনে রূপান্তরিত হতে পারে না।
- ক্লক সিনক্রোনাইজেশন: ব্যাকপ্রপের সময় ফরোয়ার্ড প্রবাহ বন্ধ রেখে ভুল আসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়, অথচ জীবন্ত মস্তিষ্ক অবিরাম ও গতিশীলভাবে কাজ করে যায়।
২. ক্রেডিট অ্যাসাইনমেন্ট ও ফিডব্যাক অ্যালাইনমেন্ট
তবে মস্তিষ্ক কীভাবে শেখে? ২০১৬ সালে টিমোথি লিলিক্র্যাপ এবং তাঁর দল এক যুগান্তকারী আবিষ্কার করেন: র্যান্ডম ফিডব্যাক অ্যালাইনমেন্ট (Feedback Alignment)।
তাঁরা দেখান যে ব্যাকপ্রপাগেশনের $W^top$-এর বদলে যদি একটি অপরিবর্তনীয় সম্পূর্ণ এলোমেলো ম্যাট্রিক্স $B$ ব্যবহার করা হয়, তবুও গভীর নেটওয়ার্ক সফলভাবে শিখতে পারে! ফরোয়ার্ড ওজনগুলো সময়ের সাথে সাথে এই র্যান্ডম ম্যাট্রিক্সের সাথে নিজেদের মানিয়ে নেয়—যা প্রমাণ করে জীবতাত্ত্বিক ফিডব্যাক সংযোগের নিখুঁত প্রতিরূপ হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
৩. তাপগতিীয় পরম বৈপরীত্য: ২০ ওয়াট বনাম মেগাওয়াট
মানব মস্তিষ্কে রয়েছে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন নিউরন এবং ১৫০ ট্রিলিয়ন সিন্যাপস। এই মহাজাগতিক নেটওয়ার্কটি সমগ্র দৃষ্টি, চিন্তা, মোটর নিয়ন্ত্রণ এবং চেতনা পরিচালনা করে মাত্র ২০ ওয়াট শক্তিতে—যা একটি সাধারণ ঘরের বাল্ব জ্বালানোর সমান।
এর বিপরীতে আজকের একটি ফ্রন্টিয়ার লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (LLM) প্রশিক্ষণ দিতে হাজার হাজার জিপিইউ এবং মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। এই চরম পার্থক্যের কারণ হলো আর্কিটেকচার:
- ভন নিউম্যান বটলনেক বনাম ইন-মেমরি কম্পিউটিং: কম্পিউটারে মেমরি এবং প্রসেসর পৃথক থাকায় ডেটা বাসে প্রচুর শক্তি অপচয় হয়। মস্তিষ্কে প্রতিটি সিন্যাপস একই সাথে মেমরি এবং প্রসেসর।
- ইভেন্ট-ড্রিভেন স্পাইকিং: এআই সার্বক্ষণিক ৩২-বিট ফ্লোটিং পয়েন্ট ম্যাট্রিক্স গুণ করে। মস্তিষ্ক কেবল তথ্য এলেই স্পার্স বাইনারি স্পাইক নির্গমন করে, অন্যথায় শান্ত থেকে বিপুল শক্তি বাঁচায়।
৪. নিউরোমরফিক ইঞ্জিনিয়ারিং: ভবিষ্যতের সিলিকন
মস্তিষ্কের এই ২০ ওয়াটের শক্তি দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যে কার্ভার মিড প্রতিষ্ঠিত নিউরোমরফিক কম্পিউটিং (যেমন Intel Loihi, IBM TrueNorth) সরাসরি মস্তিষ্কের পদার্থবিজ্ঞানকে সিলিকনে রূপ দিচ্ছে। এনালগ মেমরিস্টর ও স্পাইকিং নিউরাল নেটওয়ার্কের (SNN) মেলবন্ধনে আগামী দিনের প্রযুক্তি মস্তিষ্কের মতো অবিশ্বাস্য কম শক্তিতে জটিল চেতনা ও বুদ্ধিমত্তা পরিচালনার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে।