১৯৩৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন, বরিস পোডলস্কি এবং নাথান রোজেন তাঁদের বিখ্যাত গবেষণাপত্রে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার সম্পূর্ণতা নিয়ে এক বৈপ্লবিক প্রশ্ন উত্থাপন করেন, যা ইতিহাসে ইপিআর প্যারাডক্স (EPR Paradox) নামে পরিচিত। আইনস্টাইন কোয়ান্টাম নন-লোকালিটিকে উপহাস করে বলেছিলেন “দূরবর্তী ভৌতিক ক্রিয়া” (Spooky action at a distance)। তাঁর যুক্তি ছিল, মহাবিশ্বের যেকোনো প্রভাব আলোর গতিসীমা মেনে চলতে বাধ্য; সুতরাং কণাগুলোর মধ্যে নিশ্চয়ই কোনো গোপন ক্ল্যাসিক্যাল তথ্য (Local Hidden Variables) আগে থেকেই লুকানো থাকে। প্রায় তিন দশক ধরে এটি একটি দার্শনিক বিতর্ক হিসেবে আটকে ছিল। কিন্তু ১৯৬৪ সালে উত্তর আয়ারল্যান্ডের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী জন স্টুয়ার্ট বেল এক অবিস্মরণীয় গাণিতিক প্রমাণের মাধ্যমে দেখান যে, প্রকৃতির কোয়ান্টাম আচরণ কোনো ধরনের লোকাল রিয়েলিস্টিক গোপন চলক দিয়ে ব্যাখ্যা করা গাণিতিকভাবে অসম্ভব। বেলের উপপাদ্য (Bell’s Theorem) এবং CHSH অসমতা কোয়ান্টাম এন্টেঙ্গলমেন্ট বা বিজড়নকে বিজ্ঞানের অন্যতম পরীক্ষিত সত্যে রূপান্তর করেছে।

১. মাল্টি-কিউবিট ও টেনসর প্রোডাক্ট স্পেস

দুটি পৃথক কোয়ান্টাম সিস্টেম $A$ এবং $B$ যখন পরস্পরের সাথে মিথস্ক্রিয়া করে, তখন তাদের যৌথ অবস্থা নির্দেশ করতে হিলবার্ট স্পেসের টেনসর প্রোডাক্ট (Tensor Product) ব্যবহার করা হয়:

$$mathcal{H}_{AB} = mathcal{H}_A otimes mathcal{H}_B cong mathbb{C}^2 otimes mathbb{C}^2 cong mathbb{C}^4$$

এর চারমাত্রিক কম্পিউটেশনাল বেসিস হলো: $|00rangle, |01rangle, |10rangle, |11rangle$।

কোয়ান্টাম বিজড়ন (Entanglement)-এর গাণিতিক সংজ্ঞা

একটি দ্বি-কণা সিস্টেম $|Psirangle$-কে পৃথকীকরণযোগ্য (Separable) বলা হবে যদি তাকে দুটি একক কণার সাধারণ গুণফল আকারে প্রকাশ করা যায়: $|Psirangle = |psirangle_A otimes |phirangle_B$।

আর যদি কোনো স্টেটকে এভাবে পৃথক করা না যায়, তবে তাকে বলা হয় বিজড়িত বা এন্ট্যাঙ্গলড স্টেট (Entangled State):

$$|Psirangle neq |psirangle_A otimes |phirangle_B$$

২. বেল স্টেট (Bell States)

সর্বোচ্চ বিজড়িত অবস্থার চারটি মৌলিক ভিত্তি হলো বেল স্টেট বা ইপিআর পেয়ার:

$$|Phi^pmrangle = frac{1}{sqrt{2}}(|00rangle pm |11rangle), quad |Psi^pmrangle = frac{1}{sqrt{2}}(|01rangle pm |10rangle)$$

যদি অ্যালিস এবং বব একটি $|Phi^+rangle$ জোড়া ভাগ করে নেয় এবং তারা মহাবিশ্বের দুই প্রান্তে চলে যায়, তবে অ্যালিস তার কিউবিট পরিমাপ করে ০ পেলে ববের কিউবিট কোনো যোগাযোগ ছাড়াই সাথে সাথে ০ অবস্থায় চলে যাবে। পরিমাপের আগে কণা দুটির কোনো নির্দিষ্ট মান ছিল না; তবুও তাদের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য নিখুঁত ঐক্য বিরাজ করে।

৩. ক্লাসিক্যাল লোকাল রিয়ালিজম ও CHSH অসমতা

১৯৬৯ সালে ক্লসার, হর্ন, শিমোনি এবং হল্ট (CHSH) আইনস্টাইনের লোকাল রিয়ালিজমের অনুমানের ওপর ভিত্তি করে একটি কঠোর গাণিতিক সীমা প্রমাণ করেন। যদি কণার আচরণ পূর্বনির্ধারিত ক্ল্যাসিক্যাল গোপন চলক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তবে অ্যালিস ও ববের পরিমাপের কোরিলেশন $S$ কখনোই ২ অতিক্রম করতে পারবে না:

$$|S_{text{classical}}| = |E(a, b) – E(a, b’) + E(a’, b) + E(a’, b’)| le 2$$

৪. কোয়ান্টাম লঙ্ঘন ও সাইরেলসনের ২√২ সীমা

কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্সে যখন বেল স্টেটের ওপর সুনির্দিষ্ট কোণে ($0, pi/4, pi/2, 3pi/4$) ডিটেক্টর বসিয়ে পরিমাপ করা হয়, তখন ফলাফল আসে:

$$S_{text{quantum}} = 2sqrt{2} approx 2.828 > 2$$

এটি লোকাল রিয়ালিজমকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে। ২০২২ সালে আল্যাঁ আস্পে, জন ক্লসার এবং আন্তন জাইলিঙ্গার এই কোয়ান্টাম নন-লোকালিটি পরীক্ষাগারে অকাট্যভাবে প্রমাণ করে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

সাইরেলসনের সীমা (Tsirelson’s Bound)

১৯৮০ সালে বরিস সাইরেলসন প্রমাণ করেন যে, কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় $S$-এর সর্বোচ্চ মান হতে পারে $2sqrt{2}$। পাউলি অপারেটরের অ্যান্টি-কমিউটেটর নিয়মের কারণে কোয়ান্টাম মেকানিক্স কখনোই $2sqrt{2}$-কে অতিক্রম করতে পারে না।

৫. নো-সিগন্যালিং উপপাদ্য: আলোর গতিসীমার সুরক্ষা

যদিও কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে কাজ করে, তবুও এর মাধ্যমে আলোর গতির চেয়ে দ্রুত কোনো তথ্য পাঠানো অসম্ভব (No-Communication Theorem)। কারণ অ্যালিস বা বব প্রত্যেকে স্থানীয়ভাবে কেবল ৫০-৫০ সম্ভাবনার র‍্যান্ডম ফলাফল দেখতে পায়। যতক্ষণ না তারা আলোর গতিতে প্রচলিত মাধ্যমে ডেটা আদান-প্রদান করে নিজেদের ফলাফল তুলনা করছে, ততক্ষণ এই পারস্পরিক সংযোগের কোনো পাঠোদ্ধার সম্ভব নয়।