১৯৮০-এর দশকের শেষ ভাগেও কোনো মূলধারার বিজ্ঞানীর পক্ষে চেতনার গবেষণা করা ছিল ক্যারিয়ারের আত্মহত্যা—একে মনে করা হতো কবি ও মরমী দার্শনিকদের এক অবৈজ্ঞানিক আড্ডাখানা। এই অচলাবস্থা ভেঙে দিলেন স্বয়ং ফ্রান্সিস ক্রিক—যিনি ১৯৫৩ সালে জেমস ওয়াটসনের সাথে যৌথভাবে ডিএনএ-র ডাবল হেলিক্স আবিষ্কার করে জীববিজ্ঞানে অমর হয়ে ছিলেন। জীবনের শেষ পঁচিশ বছর তিনি উৎসর্গ করলেন আত্মার রহস্য সমাধানের পেছনে। তরুণ ক্যালটেক বিজ্ঞানী ক্রিস্টফ ককের সাথে হাত মিলিয়ে ১৯৯০ সালে ক্রিক এক বৈপ্লবিক আন্দোলনের সূচনা করলেন: চেতনার ন্যূনতম ভৌত ভিত্তি—Neural Correlates of Consciousness (NCC) বা চেতনার নিউরাল সংযোগের বৈজ্ঞানিক সন্ধান।
ক্রিকের বিস্ময়কর অনুমান (The Astonishing Hypothesis)
১৯৯৪ সালে ক্রিক তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে আপসহীন বস্তুবাদী দর্শনের ঘোষণা দিলেন:
“‘আপনি’, আপনার সমস্ত আনন্দ আর বেদনা, আপনার স্মৃতি আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আপনার নিজস্ব পরিচয় ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি—বাস্তবে কোটি কোটি স্নায়ুকোষ এবং তাদের রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়। অ্যালিসের ভাষায় বলতে গেলে: ‘তোমরা নিউরনের এক সাধারণ দল ছাড়া আর কিছুই নও!'” — ফ্রান্সিস ক্রিক, ১৯৯৪
ক্রিক ও কক বললেন দর্শনের কঠিন সমস্যা আপাতত মুলতুবি রেখে আসুন পরীক্ষাগারে খুঁজি: কোনো একটি নির্দিষ্ট সচেতন অনুভূতি তৈরি হওয়ার জন্য মস্তিষ্কের ন্যূনতম কোন নিউরাল মেকানিজমটি সক্রিয় হওয়া অপরিহার্য?
বাইনোকুলার রাইভালরি: চোখের আলো বনাম মনের দৃষ্টি
চেতনার নিউরন খুঁজতে হলে এমন এক পরিস্থিতি দরকার যেখানে চোখে পড়া আলো অবিকল একই থাকবে, কিন্তু মনের ভেতরের সচেতন দৃষ্টি ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাবে। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন বাইনোকুলার রাইভালরি (Binocular Rivalry):
বিশেষ থ্রি-ডি চশমার সাহায্যে বাম চোখে দেখানো হয় লাল রঙের মানুষের মুখ আর ডান চোখে দেখানো হয় সবুজ রঙের বাড়ির ছবি। মস্তিষ্ক দুটি ছবিকে মেলাতে পারে না। ফলে আপনি দুটি ছবি একসাথে দেখবেন না; আপনার মন প্রতি কয়েক সেকেন্ড পরপর নিজে থেকেই দৃশ্যপট বদলাবে: কখনো দেখবেন শুধু মুখ, আবার কখনো দেখবেন শুধু বাড়ি!
মস্তিষ্কের ভেতর ইলেকট্রোড বসিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখলেন এক আশ্চর্য সত্য:
- ফ্রন্টোপ্যারাইটাল দল: যাঁদের মতে কপাল ও ফ্রন্টাল লোবের নিউরাল নেটওয়ার্ক ছাড়া চেতনা অসম্ভব।
- পোস্টেরিয়র হট জোন দল: ক্রিস্টফ কক ও জিউলিও তননির মতে মাথার পেছনের প্যারাইটাল ও অক্সিপিটাল লোবের সংযোগস্থলই হলো চেতনার আসল রাজধানী। ফ্রন্টাল লোবের বিশাল অংশ কাটা পড়লেও মানুষের চেতনা হারায় না; কিন্তু মাথার পেছনের এই হট জোন ক্ষতিগ্রস্ত হলেই মানুষ সমস্ত দৃষ্টি ও সচেতনতা হারিয়ে ফেলে।
ফ্রান্সিস ক্রিক বিজ্ঞানীদের শিখিয়ে গেলেন যে আত্মাকে ল্যাবরেটরির টেবিল এনে ব্যবচ্ছেদ করা সম্ভব। চেতনার নিউরাল সংযোগের এই সন্ধানই পথ তৈরি করেছে আধুনিক গাণিতিক চেতনা তত্ত্বের।
- চোখ থেকে আসা প্রথম দৃষ্টি অঞ্চল V1-এ নিউরনগুলো অবিরাম ফায়ার করে চলেছে, মানুষ ছবিটি দেখতে পাক আর না পাক। সুতরাং V1 চেতনার অংশ নয়!
- কিন্তু সংকেত যখন উচ্চতর ফিউসিফর্ম ফেস এরিয়া (FFA) বা প্যারা-হিপোক্যাম্পাল এরিয়ায় পৌঁছায়, তখন নিউরনগুলোর ফায়ারিং হুবহু মানুষের মনের ভেতরের সচেতন দেখার সাথে ৯০% নির্ভুলতায় তালে তাল মেলায়।
গামা তরঙ্গের ৪০ হার্টজ ঐকতান ও বাইন্ডিং সমস্যা
একটি বস্তুর রঙ, আকার ও গতি মস্তিষ্কের ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে তৈরি হয়ে কীভাবে এক অখণ্ড অনুভূতির জন্ম দেয় (Binding Problem)? উলফ সিঙ্গার দেখালেন যে একই বস্তুর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রক্রিয়াজাতকারী নিউরনগুলো প্রতি সেকেন্ডে ৪০ বার (৪০ হার্টজ গামা তরঙ্গ) একযোগে তাল মিলিয়ে জ্বলে ওঠে:
$$text{Phase Synchrony: } Delta phi approx 0$$
ক্রিক ও কক ধারণা করলেন এই ৪০ হার্টজের ছন্দই হলো ছড়িয়ে থাকা নিউরনদের এক সূতায় বেঁধে চেতনা সৃষ্টির আসল সুর।
পোস্টেরিয়র হট জোন: চেতনার আসল সিংহাসন
২০০৪ সালের জুলাইয়ে মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তে শেষ গবেষণাপত্রে ক্রিক ক্লস্ট্রাম (Claustrum) নামক মস্তিষ্কের এক পাতলা নিউরাল স্তরের কথা লিখে যান—যা পুরো কর্টেক্সকে অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরের মতো সুর মেলায়।
বর্তমানে চেতনার NCC নিয়ে স্নায়ুবিজ্ঞান দুটি মূল ধারায় বিভক্ত:
- ফ্রন্টোপ্যারাইটাল দল: যাঁদের মতে কপাল ও ফ্রন্টাল লোবের নিউরাল নেটওয়ার্ক ছাড়া চেতনা অসম্ভব।
- পোস্টেরিয়র হট জোন দল: ক্রিস্টফ কক ও জিউলিও তননির মতে মাথার পেছনের প্যারাইটাল ও অক্সিপিটাল লোবের সংযোগস্থলই হলো চেতনার আসল রাজধানী। ফ্রন্টাল লোবের বিশাল অংশ কাটা পড়লেও মানুষের চেতনা হারায় না; কিন্তু মাথার পেছনের এই হট জোন ক্ষতিগ্রস্ত হলেই মানুষ সমস্ত দৃষ্টি ও সচেতনতা হারিয়ে ফেলে।
ফ্রান্সিস ক্রিক বিজ্ঞানীদের শিখিয়ে গেলেন যে আত্মাকে ল্যাবরেটরির টেবিল এনে ব্যবচ্ছেদ করা সম্ভব। চেতনার নিউরাল সংযোগের এই সন্ধানই পথ তৈরি করেছে আধুনিক গাণিতিক চেতনা তত্ত্বের।