প্রায় এক শতাব্দী ধরে স্নায়ুবিজ্ঞানের অবিচল অনুশাসন ছিল: প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্ক একবার তৈরি হয়ে গেলে তা পাথরের মতো অনমনীয় এবং চিরতরে অপরিবর্তনশীল। ১৯২৮ সালে সান্তিয়াগো রামোন ই কাহাল লিখেছিলেন: “প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্কে স্নায়ুপথগুলো স্থায়ী, সমাপ্ত এবং অপরিবর্তনশীল। সবকিছু মারা যেতে পারে, কিন্তু নতুন কিছু পুনর্জন্ম নিতে পারে না।” মস্তিষ্ককে ভাবা হতো এমন এক টেলিফোন এক্সচেঞ্জ যার তার শৈশবে একবার পাতা হয়ে গেলে জীবনে আর কখনো নতুন করে জোড়া লাগানো যায় না। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অস্ট্রিয়ান-আমেরিকান বিজ্ঞানী এরিক ক্যান্ডেল এক সামুদ্রিক শামুকের ওপর গবেষণা চালিয়ে এই স্থির মতবাদ গুঁড়িয়ে দিয়ে উন্মোচন করলেন চেতনার সবচেয়ে আশাজাগানিয়া সত্য: নিউরোপ্লাস্টিসিটি (Neuroplasticity)।

হেবের নীতি: যে নিউরনরা একসাথে জ্বলে, তারা একসাথে জোড়া বাঁধে

১৯৪৯ সালে কানাডিয়ান মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড হেব তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থে শেখার এক মৌলিক তাত্ত্বিক মেকানিজম প্রস্তাব করলেন। হেব বললেন, যখন নিউরন ‘ক’ বারবার নিউরন ‘খ’-কে উদ্দীপিত করে, তখন তাদের সংযোগস্থলে এমন কিছু শারীরিক পরিবর্তন ঘটে যাতে পরবর্তীতে ‘ক’ নিউরনটি অতি সহজে ‘খ’-কে জাগিয়ে তুলতে পারে:

“যে নিউরনগুলো একসাথে জ্বলে ওঠে, তাদের মধ্যে স্থায়ী বন্ধন রচিত হয় (Cells that fire together, wire together)।” — হেবের নীতি

১৯৭৩ সালে ওসলোর ল্যাবরেটরিতে টেরিয়ে লোমো খরগোশের হিপোক্যাম্পাসে উচ্চ কম্পাঙ্কের বিদ্যুৎ সংকেত পাঠিয়ে প্রমাণ করলেন যে সাইন্যাপসের কার্যক্ষমতা কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ীভাবে বেড়ে যায়—যাকে বলে লং-টার্ম পোটেনশিয়েশন (LTP)।

অ্যাপ্লিসিয়া ক্যালিফোর্নিকা: বিশালাকার সি-স্লাগের বিপ্লব

যখন অধিকাংশ বিজ্ঞানী কোটি কোটি নিউরনের জটিল স্তন্যপায়ীর মস্তিষ্কে স্মৃতির খোঁজ করছিলেন, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ গবেষক এরিক ক্যান্ডেল এক সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন: তিনি বেছে নিলেন ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্রের বিশালাকার শামুক অ্যাপ্লিসিয়া ক্যালিফোর্নিকা (Aplysia californica)।

মানুষের মস্তিষ্কে যেখানে ৮৬০০ কোটি নিউরন রয়েছে, অ্যাপ্লিসিয়ার শরীরে রয়েছে মাত্র ২০,০০০ নিউরন! আর এর স্নায়ুকোষগুলো মানুষের চেয়ে শত গুণ বড়—প্রায় ১ মিলিমিটার পর্যন্ত চওড়া, যা মাইক্রোস্কোপে সহজেই শনাক্ত করা যায় এবং প্রতিটির ভেতরে আলাদা করে ইলেকট্রোড প্রবেশ করানো সম্ভব।

স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতির আণবিক রূপান্তর

ক্যান্ডেল অ্যাপ্লিসিয়ার শ্বাস ফুলকা সঙ্কোচন রিফ্লেক্স পরীক্ষা করলেন:

  • অভ্যস্ততা (Habituation): শামুকের গায়ে বারবার আলতো পানির ধারা দিলে সে বুঝতে পারে এতে কোনো বিপদ নেই; ধীরে ধীরে ফুলকা সঙ্কোচনের মাত্রা কমে যায়। দেখা গেল সাইন্যাপসে ক্যালসিয়াম চ্যানেল নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়ে গ্লুটামেট নির্গমন বন্ধ করে দিয়েছে।
  • সংবেদনশীলতা (Sensitization): কিন্তু আলতো ছোঁয়ার সাথে লেজে মৃদু বৈদ্যুতিক শক দিলে শামুকটি সতর্ক হয়ে ওঠে। সেরোটোনিন হরমোন ক্ষরিত হয়ে সাইক্লিক এএমপি (cAMP) তৈরি করে পটাসিয়াম চ্যানেল বন্ধ করে দেয়—যার ফলে অ্যাকশন পটেনশিয়াল দীর্ঘায়িত হয়ে প্রচুর ক্যালসিয়াম ঢোকায় এবং বিপুল রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ে।
  • শারীরিক পুনর্গঠন (দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি): বারবার প্রশিক্ষণ দিলে প্রোটিন কাইনেজ এনজাইম কোষের নিউক্লিয়াসে প্রবেশ করে CREB নামক জিন সক্রিয় করে। এই জিন নতুন প্রোটিন তৈরি করে আক্ষরিক অর্থেই নিউরনের ডেনড্রাইটে নতুন নতুন শাখা ও সাইন্যাপ্টিক বোতাম গজিয়ে তোলে!

স্বল্পমেয়াদী স্মৃতি হলো বিদ্যমান প্রোটিনের রাসায়নিক পরিবর্তন; আর দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি মানে হলো মস্তিষ্কে শারীরিকভাবে নতুন নতুন স্নায়ু তারের জন্ম নেওয়া!

প্রাপ্তবয়স্ক নিউরোজেনেসিস: মস্তিষ্কে নতুন কোষের জন্ম

১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে এলিজাবেথ গোল্ড এবং ফ্রেড গেজ কাহালের শতাব্দী প্রাচীন শেষ নিষেধটিও বাতিল করলেন। তাঁরা প্রমাণ করলেন যে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হিপোক্যাম্পাসেও আজীবন প্রতিদিন শত শত নতুন নিউরন কোষ জন্ম নেয়—অ্যাডাল্ট নিউরোজেনেসিস (Adult Neurogenesis)।

২০০০ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত ক্যান্ডেলের এই গবেষণা প্রমাণ করল যে আমাদের চেতনা কোনো পাথরে খোদাই করা অনড় স্মৃতিসৌধ নয়; এটি এক চিরপ্রবাহী নদী। আমরা যা পড়ি, যা শিখি আর যা অনুভব করি—প্রতিটি অভিজ্ঞতা আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক মানচিত্রকে শারীরিকভাবে নতুন করে রূপ দান করে।