১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর দশকে প্রতিটি কম্পিউটার ছিল সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন, বোবা দ্বীপের মতো। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কম্পিউটারে কাজ করতে চাইলে একজন গবেষককে সশরীরে সেখানে যেতে হতো অথবা ডাকযোগে পাঞ্চ কার্ডের বাক্স পাঠাতে হতো। স্নায়ুযুদ্ধের পারমাণবিক হুমকির ছায়ায় বিজ্ঞানীরা গড়ে তুললেন এক চরম সহনশীল ও অবিনশ্বর নেটওয়ার্ক আর্কিটেকচার—যা মানুষের জ্ঞানকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ডিজিটাল প্যাকেটে বিভক্ত করে তৈরি করল আজকের বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট।

১. সার্কিট বনাম প্যাকেট সুইচিংয়ের মহাবিপ্লব

টেলিফোনের আবিষ্কার থেকে শুরু করে সেকালের সমস্ত যোগাযোগব্যবস্থা চলত সার্কিট সুইচিং (Circuit Switching) পদ্ধতিতে: দুজন মানুষ কথা বলার সময় পুরো লাইনে একটি অবিচ্ছিন্ন শারীরিক তারের সংযোগ সংরক্ষিত থাকত। কোনো একটি কেন্দ্রীয় টেলিফোন এক্সচেঞ্জ পারমাণবিক বোমায় ধ্বংস হলে পুরো যোগাযোগ এক নিমেষে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত।

১৯৬০ সালে র‍্যান্ড করপোরেশনের গবেষক পল বারান পারমাণবিক হামলার মুখে টিকে থাকার মতো এক বিকেন্দ্রীভূত নেটওয়ার্কের প্রস্তাব দেন। প্রায় একই সময়ে যুক্তরাজ্যে ডোনাল্ড ডেভিস বেসামরিক ব্যবহারের জন্য অভিন্ন ধারণা উদ্ভাবন করেন এবং নাম দেন প্যাকেট সুইচিং (Packet Switching)।

প্যাকেট কীভাবে কাজ করে?

পুরো লাইনে একটিমাত্র স্থায়ী সংযোগ আটকে না রেখে যেকোনো ফাইল বা বার্তাকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ডিজিটাল টুকরো বা প্যাকেটে বিভক্ত করা হয়। প্রতিটি প্যাকেটে থাকে:

  • হেডার (Header): প্রেরকের ঠিকানা, প্রাপকের ঠিকানা এবং প্যাকেটের ক্রমিক নম্বর।
  • পেলোড (Payload): মূল তথ্যের ক্ষুদ্র অংশ (সাধারণত ১২৮ থেকে ১,০২৪ বাইট)।
  • চেকসাম (Checksum): পথে কোনো তথ্য বিকৃত হয়েছে কিনা তা যাচাই করার গাণিতিক কোড।

প্যাকেটগুলো স্টোর-অ্যান্ড-ফরোয়ার্ড রাউটিংয়ের মাধ্যমে নেটওয়ার্কের বিভিন্ন নোড বা রাউটার দিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ভিন্ন ভিন্ন পথে ছুটে চলে। একটি লাইন কেটে গেলেও প্যাকেটগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য রাস্তা খুঁজে নেয় এবং প্রাপকের কম্পিউটারে পৌঁছে পুনরায় ক্রমানুসারে নিখুঁতভাবে জোড়া লেগে যায়।

২. আরপানেটের জন্ম এবং ২৯ অক্টোবর ১৯৬৯

এমআইটিতে লিওনার্ড ক্লেইনরক কিউয়িং থিওরি ($M/M/1$ Queues) ব্যবহার করে প্যাকেট যোগাযোগের গাণিতিক ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯৬৮ সালে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি (DARPA)-র অর্থায়নে শুরু হয় আরপানেট (ARPANET) প্রকল্প। বোস্টনের বিবিএন (BBN) কোম্পানি তৈরি করে নেটওয়ার্কের বিশেষ রাউটার: ইন্টারফেস মেসেজ প্রসেসর (IMP)।

ইতিহাসের প্রথম বার্তা: “LO”

১৯৬৯ সালের ২৯ অক্টোবর রাত ১০:৩০ মিনিটে ইউসিএলএ (UCLA)-র ছাত্র চার্লি ক্লাইন কীবোর্ডে বসে টেলিফোন লাইনের মাধ্যমে স্ট্যানফোর্ডের কম্পিউটারে টাইপ করেন L; ওপাশ থেকে শব্দ এলো: “L পাওয়া গেছে”। তিনি টাইপ করলেন O; ওপাশ থেকে জানানো হলো: “O পাওয়া গেছে”। এরপর তিনি টাইপ করলেন G… আর অমনি পুরো সিস্টেম ক্র্যাশ করে বন্ধ হয়ে গেল!

ইন্টারনেটে পাঠানো মানব ইতিহাসের প্রথম বার্তাটি ছিল কেবল দুটি অক্ষর: “LO”—যা কাকতালীয়ভাবে এক ভবিষ্যৎবাণীর মতো শোনাল (“Lo and behold” বা ‘চেয়ে দেখো!’)। এক ঘণ্টা পর ত্রুটি সংশোধন করে পূর্ণ শব্দ LOGIN সফলভাবে পাঠানো হয়। ১৯৬৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চারটি নোড যুক্ত হয়ে ইতিহাসের প্রথম কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বাস্তবে রূপ লাভ করে।

৩. ভিন্ট সার্ফ, বব কান এবং টিসিপি/আইপি (TCP/IP)

১৯৭০-এর দশকে রেডিও নেটওয়ার্ক, স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এবং ইথারনেটের মতো ভিন্ন ভিন্ন নেটওয়ার্ক তৈরি হতে লাগল। কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো সাধারণ ভাষা ছিল না।

১৯৭৩ সালে ডারপার রবার্ট কান এবং স্ট্যানফোর্ডের ভিন্টন সার্ফ এই বহুধা বিভক্ত নেটওয়ার্কগুলোকে একটি সার্বজনীন জালে বাঁধার সমাধান বের করেন। ১৯৭৪ সালে তাঁরা প্রকাশ করেন তাঁদের অমর প্রটোকল: টিসিপি/আইপি (TCP/IP)।

এন্ড-টু-এন্ড প্রিন্সিপাল

সার্ফ এবং কান একটি অমর স্থাপত্য নীতি গ্রহণ করেন: ভেতরের রাউটারগুলোকে থাকবে সম্পূর্ণ সাধারণ ও হালকা—তারা শুধু প্যাকেটগুলোকে যতো দ্রুত সম্ভব গন্তব্যে ঠেলে দেবে (“Best-effort delivery”)। আর কোনো প্যাকেট হারিয়ে গেল কিনা, ঠিকমতো জোড়া লাগল কিনা—সেই সমস্ত জটিল কাজ পরিচালনা করবে প্রান্তে থাকা কম্পিউটারগুলো (End Hosts)।

  • আইপি (IP – Internet Protocol): ৩২-বিট আইপি ঠিকানার সাহায্যে প্যাকেটগুলোকে এক নেটওয়ার্ক থেকে অন্য নেটওয়ার্কে পৌঁছে দেয়।
  • টিসিপি (TCP – Transmission Control Protocol): থ্রি-ওয়ে হ্যান্ডশেক (Three-Way Handshake)-এর মাধ্যমে নিরাপদ সংযোগ তৈরি করে এবং কোনো প্যাকেট নষ্ট হলে পুনরায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে।

৪. ১ জানুয়ারি, ১৯৮৩: ইন্টারনেটের আনুষ্ঠানিক জন্মদিন

১৯৮৩ সালের ১ জানুয়ারি একটি বাধ্যতামূলক “ফ্ল্যাগ ডে” ঘোষণা করা হয়: আরপানেটের সমস্ত কম্পিউটারকে পুরোনো প্রোটোকল বন্ধ করে একযোগে টিসিপি/আইপি প্রোটোকলে রূপান্তর করা হয়। সেদিনই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জন্ম নেয় আজকের আধুনিক ইন্টারনেট।

টিসিপি/আইপি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ও কোনো কর্পোরেট প্যাটেন্টের অধীন না হওয়ায় এটি অবলীলায় গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবল, স্যাটেলাইট ও ওয়াইফাই—যুগান্তকারী সব প্রযুক্তি এসেও সার্ফ ও কানের এই মূল আর্কিটেকচারকে বদলাতে পারেনি। সমগ্র মানবজাতি আজ এই অদৃশ্য ডিজিটাল স্নায়ুতন্ত্রের মাধ্যমে একক সত্তায় পরিণত হয়েছে।


প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • Baran, P. (1964). On Distributed Communications Network. RAND Corporation.
  • Kleinrock, L. (1964). Communication Nets: Stochastic Message Flow and Delay. McGraw-Hill.
  • Cerf, V. G., & Kahn, R. E. (1974). A Protocol for Packet Network Intercommunication. IEEE Trans. Comm., 22(5), 637–648.
  • Abbate, J. (1999). Inventing the Internet. MIT Press.