মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে দৃঢ় অনুভূতি হলো আমাদের একীভূত ‘আমি’ সত্তা: আমরা মনে করি আমাদের সমস্ত চিন্তা, দৃষ্টি আর ইচ্ছাগুলো একটিমাত্র অখণ্ড সচেতন কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হচ্ছে। ১৯৬০-এর দশকে ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (Caltech) স্নায়ুবিজ্ঞানী রজার স্পেরি এবং তাঁর তরুণ ছাত্র মাইকেল গাজানিগা এমন কিছু রোগীর ওপর গবেষণা চালালেন যাঁদের তীব্র মৃগীরোগের চিকিৎসার জন্য মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধের সংযোগকারী ২০ কোটি স্নায়ুর সেতু—কর্পাস ক্যালোসাম (Corpus Callosum)—অস্ত্রোপচার করে কেটে ফেলা হয়েছিল। তাঁদের আবিষ্কার মানব আত্মসচেতনতার ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিল: একটিমাত্র খুলির ভেতরে আসলে বাস করে দুটি সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন সচেতন মন!

দুই গোলার্ধের সেতু: কর্পাস ক্যালোসাম

আমাদের মস্তিষ্ক শারীরবৃত্তীয়ভাবে দুটি সমান গোলার্ধে বিভক্ত, যা পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকে এক বিশাল সাদা স্নায়ুর তার দিয়ে—কর্পাস ক্যালোসাম। সুস্থ মস্তিষ্কে প্রতি সেকেন্ডে ৪০০ কোটি সংকেত আদান-প্রদান করে এই দুই গোলার্ধ এমনভাবে কাজ করে যে আমাদের মনে হয় আমরা একটি একক সত্তা।

মৃগীরোগের মারাত্মক খিঁচুনি এক গোলার্ধ থেকে অন্য গোলার্ধে ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে চিকিৎসকরা যখন এই সংযোগটি কেটে দিলেন, তখন সাধারণ দৃষ্টিতে রোগীদের মধ্যে কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা গেল না। তারা স্বাভাবিকভাবে কথা বলত, হাটত এবং খাবার খেত—ফলে অনেকে রসিকতা করে বলেছিলেন এই সেতুর কাজ বুঝি কেবল দুই গোলার্ধকে ঝুলিয়ে রাখা!

ক্যালটেকের বিভক্ত পর্দার বৈপ্লবিক পরীক্ষা

স্পেরি এবং গাজানিগা বুঝলেন সাধারণ জীবনে চোখের দ্রুত নড়াচড়ার কারণে দুই চোখ দিয়েই দুই গোলার্ধে তথ্য চলে যায়। তাঁরা এক বিশেষ টেকিস্টোস্কোপ পর্দা তৈরি করলেন যা চোখের পলকের চেয়েও দ্রুত সময়ে (এক সেকেন্ডের দশ ভাগের এক ভাগে) নির্দিষ্ট গোলার্ধে ছবি পাঠাতে পারে:

  • ডান হাত (বাম গোলার্ধ) বেছে নিল একটি মুরগি।
  • বাম হাত (ডান গোলার্ধ) বেছে নিল বরফ সরানোর বেলচা।

গাজানিগা যখন রোগীকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি বেলচা কেন বেছে নিলে?” কথা বলা বাম মস্তিষ্ক বিন্দুমাত্র স্বীকার করল না যে সে জানে না। সে তৎক্ষণাৎ বানিয়ে বানিয়ে এক কাল্পনিক গল্প সাজাল: “আরে খুব সহজ! মুরগির পায়ের সাথে মুরগি মিলে, আর মুরগির খাঁচা পরিষ্কার করতে তো বেলচা লাগবেই!”

গাজানিগা বাম মস্তিষ্কের এই মডিউলটির নাম দিলেন ইন্টারপ্রেটার (The Interpreter)। এর কাজ হলো আমাদের সমস্ত অবচেতন ও অজানা আচরণের পেছনে তাৎক্ষণিকভাবে একটি যৌক্তিক মিথ্যা গল্প বানিয়ে মনকে শান্ত রাখা!

দ্বিখণ্ডিত আত্মা ও স্পেরির নোবেল জয়

স্পেরি প্রমাণ করলেন ডান গোলার্ধ কোনো বোবা যান্ত্রিক মাংসপিণ্ড নয়; এটি স্থানিক জ্যামিতি, মুখমণ্ডল চেনা, গভীর অনুভূতি এবং স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী এক সম্পূর্ণ সচেতন মন। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দুই হাতের দ্বন্দ্ব এমন রূপ নিয়েছিল যে বাম হাত প্যান্ট পরে নিলে ডান হাত তা টেনে খুলে ফেলত, অথবা বাম হাত দিয়ে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরলে ডান হাত দিয়ে চড় মারত (এলিয়েন হ্যান্ড সিন্ড্রোম)!

“প্রতিটি গোলার্ধই আসলে নিজস্ব অধিকারে এক স্বাধীন সচেতন সত্তা—যা চিন্তা করে, উপলব্ধি করে, মনে রাখে, যুক্তি দেয় এবং অনুভূতি অনুভব করে।” — রজার স্পেরি, ১৯৭৪

১৯৮১ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত এই আবিষ্কার দেকার্তের অখণ্ড আত্মার ধারণাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল। একটি সাধারণ অস্ত্রোপচারের ছুরিতে যদি মানুষের মন দুটি স্বাধীন সচেতনতায় বিভক্ত হয়ে যেতে পারে, তবে চেতনা কোনো অভৌত অলৌকিক আত্মা হতে পারে না—এটি আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগের ভেতর থেকে প্রস্ফুটিত হওয়া এক অপূর্ব জটিল সঙ্গীত।

  • ডান দৃষ্টি ক্ষেত্র: সংকেত পাঠায় সরাসরি বাম গোলার্ধে (যা কথা বলতে পারে এবং ডান হাত নিয়ন্ত্রণ করে)।
  • বাম দৃষ্টি ক্ষেত্র: সংকেত পাঠায় সরাসরি ডান গোলার্ধে (যা বোবা, কিন্তু বাম হাত নিয়ন্ত্রণ করে এবং জটিল জ্যামিতি বোঝে)।

যখন পর্দার ডানে “RING” শব্দটি দেখানো হলো, রোগী সঙ্গে সঙ্গে মুখে বলল: “রিং”। কিন্তু যখন বামে “KEY” শব্দটি দেখানো হলো, রোগী মুখ দিয়ে বলল: “আমি কিছুই দেখিনি!” কিন্তু যখন রোগীকে পর্দার আড়ালে না দেখে হাত দিয়ে বস্তু খুঁজে নিতে বলা হলো, রোগীর বাম হাত কোনো ভুল না করে টেবিলের ওপর থেকে চাবিটি তুলে নিল!

গাজানিগা যখন রোগীকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কেন চাবি তুলে নিলে?” কথা বলা বাম গোলার্ধ—যে চাবি দেখার কথা বিন্দুমাত্র জানত না—হতভম্ব হয়ে উত্তর দিল: “আরে আমি তো জানি না, আমার আঙুল এমনিতেই এটা ধরে ফেলেছে!”

বাম মস্তিষ্কের ইন্টারপ্রেটার (The Interpreter)

আরেকটি চমকপ্রদ পরীক্ষায় বাম গোলার্ধে দেখানো হলো মুরগির পা এবং ডান গোলার্ধে বরফাচ্ছন্ন বাড়ির ছবি। রোগীকে ছবির সাথে মিলিয়ে টেবিল থেকে বস্তু বেছে নিতে বলা হলো:

  • ডান হাত (বাম গোলার্ধ) বেছে নিল একটি মুরগি।
  • বাম হাত (ডান গোলার্ধ) বেছে নিল বরফ সরানোর বেলচা।

গাজানিগা যখন রোগীকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি বেলচা কেন বেছে নিলে?” কথা বলা বাম মস্তিষ্ক বিন্দুমাত্র স্বীকার করল না যে সে জানে না। সে তৎক্ষণাৎ বানিয়ে বানিয়ে এক কাল্পনিক গল্প সাজাল: “আরে খুব সহজ! মুরগির পায়ের সাথে মুরগি মিলে, আর মুরগির খাঁচা পরিষ্কার করতে তো বেলচা লাগবেই!”

গাজানিগা বাম মস্তিষ্কের এই মডিউলটির নাম দিলেন ইন্টারপ্রেটার (The Interpreter)। এর কাজ হলো আমাদের সমস্ত অবচেতন ও অজানা আচরণের পেছনে তাৎক্ষণিকভাবে একটি যৌক্তিক মিথ্যা গল্প বানিয়ে মনকে শান্ত রাখা!

দ্বিখণ্ডিত আত্মা ও স্পেরির নোবেল জয়

স্পেরি প্রমাণ করলেন ডান গোলার্ধ কোনো বোবা যান্ত্রিক মাংসপিণ্ড নয়; এটি স্থানিক জ্যামিতি, মুখমণ্ডল চেনা, গভীর অনুভূতি এবং স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী এক সম্পূর্ণ সচেতন মন। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দুই হাতের দ্বন্দ্ব এমন রূপ নিয়েছিল যে বাম হাত প্যান্ট পরে নিলে ডান হাত তা টেনে খুলে ফেলত, অথবা বাম হাত দিয়ে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরলে ডান হাত দিয়ে চড় মারত (এলিয়েন হ্যান্ড সিন্ড্রোম)!

“প্রতিটি গোলার্ধই আসলে নিজস্ব অধিকারে এক স্বাধীন সচেতন সত্তা—যা চিন্তা করে, উপলব্ধি করে, মনে রাখে, যুক্তি দেয় এবং অনুভূতি অনুভব করে।” — রজার স্পেরি, ১৯৭৪

১৯৮১ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত এই আবিষ্কার দেকার্তের অখণ্ড আত্মার ধারণাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিল। একটি সাধারণ অস্ত্রোপচারের ছুরিতে যদি মানুষের মন দুটি স্বাধীন সচেতনতায় বিভক্ত হয়ে যেতে পারে, তবে চেতনা কোনো অভৌত অলৌকিক আত্মা হতে পারে না—এটি আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগের ভেতর থেকে প্রস্ফুটিত হওয়া এক অপূর্ব জটিল সঙ্গীত।