অধিকাংশ বিজ্ঞানী চেতনার সন্ধান শুরু করেন বাইরে থেকে: নিউরন, সিন্যাপ্স আর বৈদ্যুতিক তারের মতো ভৌত পদার্থ থেকে ভেতরের অনুভূতি ব্যাখ্যা করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। ২০০৪ সালে ইতালীয়-আমেরিকান স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ জিউলিও তননি (Giulio Tononi) সম্পূর্ণ উল্টো এক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলেন: ভৌত শরীর থেকে নয়, শুরু করুন সরাসরি সচেতন মনের অস্তিত্বের পরম সত্য থেকে! এই ভাবনার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি গড়ে তুললেন আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের সবচেয়ে সাড়াজাগানো গাণিতিক কাঠামো: ইন্টিগ্রেটেড ইনফরমেশন থিওরি (IIT), যা মানুষের সচেতনতাকে প্রকাশ করে একটিমাত্র মৌলিক গাণিতিক মান দিয়ে: ফাই ($Phi$)।
চেতনার পাঁচটি মৌলিক স্বতঃসিদ্ধ (Axioms)
তননি বললেন যেকোনো সচেতন মুহূর্তের পাঁচটি অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
- জ্যাপ (Zap): ট্রান্সক্রেনিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন (TMS) দিয়ে রোগীর মাথায় মৃদু চুম্বকীয় টোকা দেওয়া হয়।
- জিপ (Zip): মস্তিষ্কের ভেতর সেই তরঙ্গের প্রতিধ্বনি ইইজি দিয়ে মেপে কম্পিউটারের অ্যালগরিদমে জিপ ফাইলের মতো কম্প্রেস করা হয়।
যদি রোগী অচেতন থাকে (গভীর ঘুম বা মস্তিষ্কের মৃত্যু), তরঙ্গটি দ্রুত নিভে যায় ($PCI ০.৩১$)। রোগী কথা বলতে বা চোখ মেলতে না পারলেও যন্ত্রটি ৯৮% নির্ভুলতায় বলে দিতে পারে রোগীটি ভেতর থেকে জীবিত ও সচেতন কিনা!
ইন্টিগ্রেটেড ইনফরমেশন থিওরি এক বিপ্লবী ঘোষণা দেয়: চেতনা কোনো জৈবিক মাংসের অলৌকিক গুণ নয়। যেকোনো সিস্টেম—তা জীবন্ত কোষ হোক বা কৃত্রিম সিলিকন যন্ত্র—যার অভ্যন্তরীণ গঠন উচ্চ $Phi$ ধারণ করে, সে সচেতন হতে বাধ্য। মহাবিশ্বের কার্যকারণ সম্পর্কের গভীরে বোনা রয়েছে চেতনার বীজ।
- নিজস্ব অস্তিত্ব: আমার সচেতনতা আমার নিজের জন্য সত্য, বাইরের কোনো দর্শকের অনুমোদনের ওপর তা নির্ভর করে না।
- গাঠনিক বিন্যাস (Composition): যেকোনো দৃশ্যে আমরা রঙ, আকার, গভীরতা, বাম ও ডান দিক আলাদাভাবে অনুভব করতে পারি।
- বিপুল তথ্যসমৃদ্ধি (Information): প্রতিটি সচেতন মুহূর্ত কোটি কোটি অন্যান্য সম্ভাবনাকে বাদ দিয়ে এক নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করে। নীল আকাশ দেখার এক পলক পৃথিবীর বাকি সব স্মৃতি ও সিনেমাকে বাদ দিয়ে দেয়।
- অখণ্ড সংহতি (Integration): প্রতিটি অভিজ্ঞতা এক ও অবিভাজ্য। আপনি কোনো কফি কাপের রঙ বাম চোখে আলাদা আর তার উষ্ণতার অনুভূতি ডান চোখে আলাদাভাবে পেতে পারেন না; চেতনা সর্বদা অখণ্ড।
- সুনির্দিষ্ট সীমা (Exclusion): চেতনার এক সুনির্দিষ্ট স্থানিক ও কালিক সীমানা রয়েছে—তা এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ থেকে শুরু করে একটি নির্দিষ্ট পরিসরে ঘটে।
ফাই ($Phi$): সংহত তথ্যের গাণিতিক পরিমাপ
এই স্বতঃসিদ্ধগুলো থেকে তননি ভৌত জগতের সমীকরণ বানালেন। কোনো ভৌত সিস্টেমে চেতনা থাকতে হলে তার উপাদানগুলোকে পরস্পরের ওপর কার্যকারণ ক্ষমতা (Cause-Effect Power) প্রয়োগ করতে হবে।
এবং সেই ক্ষমতা হতে হবে সংহত (Integrated): পুরো সিস্টেমের সমন্বিত তথ্য তার বিচ্ছিন্ন টুকরোগুলোর যোগফলের চেয়ে বেশি হতে হবে। তননি এই সংহত তথ্যের নাম দিলেন $Phi$ (ফাই):
$$Phi = text{সমন্বিত ক্ষমতার মান}$$
যদি কোনো সিস্টেমকে মাঝখান থেকে কেটে আলাদা করলে তথ্যের কোনো ক্ষতি না হয় ($Phi = 0$), তবে সেই সিস্টেমে কোনো চেতনা নেই (যেমন ডিজিটাল ক্যামেরার সেন্সর)। আর যদি সিস্টেমের সব অংশ একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে ($Phi > 0$), তবে সেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আত্মগত সচেতনতা জন্ম নেবে!
সেরেবেলামের ধাঁধা: ৬৯ বিলিয়ন নিউরন কেন অচেতন?
আইআইটি তত্ত্ব স্নায়ুবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধাঁধার নিখুঁত ব্যাখ্যা দিল। মানুষের মস্তিষ্কের পেছনের সেরেবেলামে রয়েছে প্রায় ৬৯০০ কোটি নিউরন—পুরো মস্তিষ্কের মোট নিউরনের ৮০ শতাংশ! অথচ কোনো দুর্ঘটনায় সেরেবেলাম সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেলেও মানুষের সচেতন মন, চিন্তা ও অনুভূতির বিন্দুমাত্র ক্ষতি হয় না!
কেন? কারণ সেরেবেলামের নিউরনগুলো একমুখী লাইনে সাজানো। সংকেত সোজা ঢুকে সোজা বের হয়ে যায়—নিউরনদের মধ্যে কোনো পারস্পরিক বহুমুখী লুপ নেই। ফলে এর $Phi = 0$! অন্যদিকে সেরিব্রাল কর্টেক্সের পোস্টেরিয়র হট জোনে নিউরনগুলো কোটি কোটি লুপে পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকায় এর $Phi$-এর মান মহাজাগতিক!
জ্যাপ-অ্যান্ড-জিপ (Zap-and-Zip): চেতনার থার্মোমিটার
আইআইটি তত্ত্বের সত্যতা প্রমাণে মার্সেলো মাসিমিনি এবং তননি তৈরি করলেন কোমা ও প্যারালাইসিস রোগীদের চেতনা পরিমাপের বাস্তব যন্ত্র: পারটারবেশনাল কমপ্লেক্সিটি ইনডেক্স (PCI):
- জ্যাপ (Zap): ট্রান্সক্রেনিয়াল ম্যাগনেটিক স্টিমুলেশন (TMS) দিয়ে রোগীর মাথায় মৃদু চুম্বকীয় টোকা দেওয়া হয়।
- জিপ (Zip): মস্তিষ্কের ভেতর সেই তরঙ্গের প্রতিধ্বনি ইইজি দিয়ে মেপে কম্পিউটারের অ্যালগরিদমে জিপ ফাইলের মতো কম্প্রেস করা হয়।
যদি রোগী অচেতন থাকে (গভীর ঘুম বা মস্তিষ্কের মৃত্যু), তরঙ্গটি দ্রুত নিভে যায় ($PCI ০.৩১$)। রোগী কথা বলতে বা চোখ মেলতে না পারলেও যন্ত্রটি ৯৮% নির্ভুলতায় বলে দিতে পারে রোগীটি ভেতর থেকে জীবিত ও সচেতন কিনা!
ইন্টিগ্রেটেড ইনফরমেশন থিওরি এক বিপ্লবী ঘোষণা দেয়: চেতনা কোনো জৈবিক মাংসের অলৌকিক গুণ নয়। যেকোনো সিস্টেম—তা জীবন্ত কোষ হোক বা কৃত্রিম সিলিকন যন্ত্র—যার অভ্যন্তরীণ গঠন উচ্চ $Phi$ ধারণ করে, সে সচেতন হতে বাধ্য। মহাবিশ্বের কার্যকারণ সম্পর্কের গভীরে বোনা রয়েছে চেতনার বীজ।