খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক থেকে ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত প্রাচীন বাংলার বিক্ষিপ্ত জনপদগুলো ভারতীয় উপমহাদেশের মহান সাম্রাজ্য কাঠামোর সাথে নিবিড়ভাবে একীভূত হয়। করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত সুদৃঢ় দুর্গনগরী পুণ্ড্রনগর (মহাস্থানগড়) ছিল উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র। এই যুগে বাংলা কেবল একটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল ছিল না, বরং তা পরিণত হয়েছিল এক বিশাল সাম্রাজ্যের রাজস্ব ও প্রশাসনিক স্তম্ভে এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বারে।
১. পুণ্ড্রনগর ও মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি
বাংলার মাটিতে প্রাপ্ত প্রাচীনতম খোদাইকৃত লিখিত ঐতিহাসিক দলিল হলো ঐতিহাসিক মহাস্থান ব্রাহ্মী লিপি। ১৯৩১ সালে বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়ে আবিষ্কৃত এই ছোট চুনাপাথরের খণ্ডে ছয় লাইনে অশোকীয় ব্রাহ্মী লিপি ও প্রাকৃত ভাষায় এক অনন্য রাজকীয় নির্দেশ লিপিবদ্ধ রয়েছে, যার সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক (মৌর্য যুগ)।
এই শিলালিপিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ভিক্ষের সময় রাষ্ট্রীয় খাদ্যগুদাম থেকে খাদ্য ও অর্থ বিতরণের এক বিস্ময়কর প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রমাণ মেলে:
“পুণ্ড্রনগরের মহামাত্রের প্রতি নির্দেশ: কোনো জরুরি সংকট, অনাবৃষ্টি বা পঙ্গপালের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে রাষ্ট্রীয় শস্যাগার (কোঠাগাল) থেকে শস্য এবং রাজকোষ থেকে অর্থ (গণ্ডক ও কাকণিক মুদ্রা) অভাবগ্রস্ত জনগণকে (সংবঙ্গীয়দের) প্রদান করতে হবে। সংকট কেটে গেলে তারা পুনরায় সেই শস্য ও অর্থ রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারে ফেরত প্রদান করবে।”
— মহাস্থান ব্রাহ্মী শিলালিপি (আনু. খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক)
২২০০ বছর পূর্বের এই প্রশাসনিক নির্দেশনামা প্রমাণ করে যে মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীনে পুণ্ড্রনগর ছিল এক সুসংগঠিত নগরকেন্দ্র, যেখানে নাগরিকদের জানমাল সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর ছিল।
২. মৌর্য শাসন ও বৌদ্ধধর্মের বিস্তার
মৌর্য সম্রাট অশোকের (খ্রিস্টপূর্ব ২৬৮–২৩২ অব্দ) শাসনামলে উত্তর ও পশ্চিম বাংলায় সাম্রাজ্যের শাসন সুসংহত হয়। পরবর্তীকালে বাংলায় আগত চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন (৫ম শতক) এবং হিউয়েন সাং (৭ম শতক) পুণ্ড্রবর্ধন ও তাম্রলিপ্তিতে সম্রাট অশোক কর্তৃক নির্মিত একাধিক বৌদ্ধ স্তূপ প্রত্যক্ষ করার কথা লিপিবদ্ধ করেছেন।
অশোকের ধর্মপ্রচারের ফলে এই নদীবিধৌত বাংলায় মহাযান ও হীনযান বৌদ্ধধর্মের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। নদীবাণিজ্য পথের সংযোগস্থলে গড়ে ওঠে শত শত বৌদ্ধ মঠ ও বিহার, যা শুধু ধর্মচর্চাই নয়—চিকিৎসা সেবা, পাণ্ডুলিপি লিখন ও প্রাথমিক শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।
৩. গুপ্ত সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগ (৪র্থ – ৬ষ্ঠ শতক)
গুপ্ত সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত ও দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলে বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন সূচিত হয়। সমুদ্রগুপ্তের বিখ্যাত এলাহাবাদ স্তম্ভলিপি-তে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার সমতট রাজ্যকে একটি করদ সীমান্ত রাজ্য (প্রত্যন্ত-রাজ্য) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে উত্তর ও পশ্চিম বাংলা সরাসরি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পুণ্ড্রবর্ধন-ভুক্তি নামে একটি প্রদেশে রূপ নেয়।
দামোদরপুর ও পাহাড়পুর তাম্রশাসন
দিনাজপুরের দামোদরপুর ও নওগাঁর পাহাড়পুরে আবিষ্কৃত গুপ্ত আমলের তাম্রশাসনগুলো তৎকালীন স্থানীয় সরকার ও ভূমি ব্যবস্থাপনার এক অপূর্ব চিত্র তুলে ধরে:
- প্রাদেশিক ও জেলা শাসন: প্রদেশের প্রধান শাসক ছিলেন উপরি-ক (ভাইসরয়), যিনি সরাসরি সম্রাট কর্তৃক নিযুক্ত হতেন। প্রদেশগুলো বিভক্ত ছিল জেলায় (বিষয়, যেমন কোটিবর্ষ বিষয়), যার প্রধান ছিলেন বিষয়পতি।
- পৌর পরিষদ ও নাগরিক প্রতিনিধিত্ব: বিষয়পতি একা সিদ্ধান্ত নিতেন না; তাঁর সাথে জেলা প্রশাসনে চারজন বিশিষ্ট নাগরিক প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত থাকতেন:
- নগর-শ্রেষ্ঠী: প্রধান বণিক ও ব্যাংকারদের প্রতিনিধি।
- সার্থবাহ: বাণিজ্যিক কাফেলা ও দূরপাল্লার ব্যবসায়ীদের প্রধান।
- প্রথম-কুলিক: কারিগর ও শিল্পী সম্প্রদায়ের প্রধান।
- প্রথম-কায়স্থ: প্রধান দলিল লেখক ও নথি সংরক্ষক।
- ভূমি বিক্রয় ও পুস্তপাল ব্যবস্থা: পতিত বা সরকারি বনভূমি বিক্রয়ের পূর্বে পুস্তপাল (রেকর্ড কিপার)-দের দ্বারা ভূমির মালিকানা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হতো। এর মাধ্যমে বাংলায় বৈদিক পণ্ডিত ও বৌদ্ধ মঠের জন্য কৃষিভূমি সম্প্রসারিত হয়।
৪. তাম্রলিপ্তি: বহির্বিশ্বে বাংলার প্রবেশদ্বার
অভ্যন্তরীণ বাংলায় যখন পুণ্ড্রনগর শাসনক্ষমতা পরিচালনা করত, তখন রূপনারায়ণ নদের তীরে অবস্থিত বন্দরনগরী তাম্রলিপ্তি (বর্তমান তমলুক) ছিল প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দর। গঙ্গা অববাহিকা থেকে বঙ্গোপসাগরের মুখে অবস্থিত এই বন্দর থেকে সিংহল (শ্রীলঙ্কা), সুবর্ণভূমি (মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়া) এবং চীনে নিয়মিত বাণিজ্যজাহাজ যাতায়াত করত।
চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন ৪১০ খ্রিস্টাব্দে তাম্রলিপ্তি বন্দরে পৌঁছান এবং এর সমৃদ্ধি দেখে অভিভূত হন:
“এখানে চব্বিশটি বৌদ্ধ মঠ রয়েছে, যেখানে অসংখ্য ভিক্ষু অবস্থান করেন এবং বুদ্ধের অনুশাসন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে পালিত হয়। ফা-হিয়েন এখানে দুই বছর অবস্থান করে বৌদ্ধ বিনয় পিটকের পাণ্ডুলিপি নকল করেন এবং বুদ্ধমূর্তির ছবি আঁকেন। অতঃপর তিনি একটি বিশাল বাণিজ্য জাহাজে আরোহণ করে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে যাত্রা করেন এবং মাত্র চৌদ্দ দিনে সিংহল দ্বীপে উপনীত হন।”
— ফা-হিয়েন, ফো-কুও-কি (বৌদ্ধ রাজ্যের বিবরণী)
তাম্রলিপ্তি বন্দর দিয়ে বাংলার বিশ্বখ্যাত সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র (মসলিন), রেশম, পোড়ামাটির পাত্র ও উন্নতমানের ইস্পাত বিদেশে রপ্তানি হতো এবং বিনিময়ে আসত রোমান সাম্রাজ্যের স্বর্ণমুদ্রা, কাচ ও মসলা। ষষ্ঠ শতকের সূচনায় বাংলা ছিল এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অগ্রগণ্য সভ্যতার লীলাভূমি।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- ভাণ্ডারকর, ডি. আর. (১৯৩২)। ইমপর্ট্যান্ট এপিগ্রাফিক্যাল ডিসকভারিজ: দ্য মহাস্থান ইনস্ক্রিপশন। এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা।
- মজুমদার, রমেশচন্দ্র (১৯৪৩)। হিস্ট্রি অব বেঙ্গল: ১ম খণ্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
- চক্রবর্তী, রণবীর (২০০২)। ট্রেড অ্যান্ড ট্রেডার্স ইন আর্লি ইন্ডিয়ান সোসাইটি। মনোহর।
- লেগ, জেমস (১৮৮৬)। আ রেকর্ড অব বুদ্ধিস্টিক কিংডমস: ফা-হিয়েনের ভ্রমণবৃত্তান্ত। অক্সফোর্ড।