বহু দশক ধরে গেম থিওরি কাজ করছিল এই অনুমানের ওপর যে মানব খেলোয়াড়রা হলেন অসীম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন গাণিতিক গণকযন্ত্র। কিন্তু ১৯৭৩ সালে এক বিমান প্রকৌশলী থেকে বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী হওয়া জন মেনার্ড স্মিথ এবং জনসংখ্যা বংশগতিবিদ জর্জ আর. প্রাইস নেচার জার্নালে এক অবিস্মরণীয় গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন: “The Logic of Animal Conflict”। মেনার্ড স্মিথ অনুধাবন করেন যে গেম থিওরির কার্যকর হতে কোনো সচেতন চেতনা বা মানবিক বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন নেই। জীবজগতে কৌশলগুলো জিনোমে কোড করা থাকে, পে-অফ পরিমাপ করা হয় ডারউইনীয় প্রজনন সাফল্যে (Fitness), আর সাম্যাবস্থার ইঞ্জিন হলো খোদ প্রাকৃতিক নির্বাচন। এভাবেই জন্ম নেয় বিবর্তনীয় গেম থিওরি (Evolutionary Game Theory)।

হক-ডোভ খেলা: পশু রাজ্যের দ্বন্দ্ব

প্রকৃতিতে খাদ্যের উৎস, অঞ্চল বা সঙ্গীর মতো মূল্যবান জৈবিক সম্পদ $V > ০$ নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত একটি প্রাণী জনগোষ্ঠীর কথা ভাবা যাক। প্রতিটি প্রাণী দুটি জন্মগত আচরণের একটি প্রদর্শন করে:

  • হক (Hawk): চরম আক্রমণাত্মক। সে রক্তক্ষয়ী লড়াই চালিয়ে যায় যতক্ষণ না নিজে আহত হয় বা প্রতিপক্ষ পালায়।
  • ডোভ (Dove): অহিংস ও শান্তিপ্রিয়। সে ভয় দেখায়, কিন্তু প্রতিপক্ষ আক্রমণ করলে আঘাত না পেয়ে তৎক্ষণাৎ পালিয়ে যায়।

যদি দুটি ডোভের দেখা হয়, তবে তারা কোনো রক্তপাত ছাড়াই সম্পদ ভাগ করে ($V/২$)। কিন্তু একটি হক ও ডোভের দেখা হলে হক সম্পূর্ণ সম্পদ ছিনিয়ে নেয় ($V$), আর ডোভ পায় শূন্য ($০$)। আর যখন দুটি হকের দেখা হয়, তখন শুরু হয় প্রাণঘাতী সংঘাত: উভয়ের জয়ের সম্ভাবনা ৫০%, কিন্তু পরাজিতের মারাত্মক আঘাত পাওয়ার ক্ষতি $C > ০$। ফলে প্রত্যাশিত পে-অফ: $(V – C)/২$।

বিবর্তনীয় স্থিতিশীল কৌশল (ESS)

ন্যাশ তত্ত্বে সাম্যাবস্থা হলো এমন এক অবস্থা যেখানে কোনো যুক্তিশীল মানুষ একা নিজের সিদ্ধান্ত বদলাতে চায় না। জীববিজ্ঞানে মেনার্ড স্মিথ সংজ্ঞায়িত করলেন ইভোলিউশনারি স্টেবল স্ট্র্যাটেজি (ESS): এটি এমন একটি জিনগত আচরণগত বৈশিষ্ট্য যা একটি জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ প্রাণী গ্রহণ করলে কোনো বিরল মিউট্যান্ট বৈশিষ্ট্য বাইরে থেকে এসে তাদের আক্রমণ বা প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

হক-ডোভ সংকটের সমাধান

বাস্তব প্রকৃতিতে মারামারির শারীরিক ক্ষতি সম্পদের মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি ($C > V$):

  • সবাই যদি ডোভ হয়, তবে কি জনগোষ্ঠী স্থিতিশীল থাকবে? না! কারণ একটি মিউট্যান্ট হকের জন্ম হলে সে সমস্ত ডোভকে পরাজিত করে বিপুল প্রজনন সুবিধা পাবে এবং বিস্তার ঘটাবে।
  • সবাই যদি হক হয়, তবে গড় পে-অফ হবে নেতিবাচক ($(V – C)/২ < ০$)। তখন একটি অহিংস ডোভ কোনো মারামারি না করে পালিয়েও হকের চেয়ে বেশি বংশবৃদ্ধি করবে!

ফলে বিশুদ্ধ কোনো প্রজাতি টিকে থাকতে পারে না। একমাত্র স্থিতিশীল ভারসাম্য বা ESS হলো একটি মিশ্র জনগোষ্ঠী যেখানে হকের অনুপাত ঠিক $x^* = frac{V}{C}$ হয়। মারামারির ঝুঁকি যত প্রাণঘাতী হয় ($C gg V$), প্রকৃতিতে আগ্রাসী হকের অনুপাত তত কমে যায়।

রেপ্লিকেটর ডাইনামিক্স (Replicator Dynamics)

১৯৭৮ সালে পিটার টেলর এবং লিও জনকার গাণিতিক সমীকরণের মাধ্যমে দেখান কীভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রবাহে জিনের অনুপাত পরিবর্তিত হয়:

$$dot{x}_i = x_i left( f_i(x) – bar{f}(x) right)$$

কোনো কৌশল যদি জনগোষ্ঠীর গড় ফিটনেসের চেয়ে ভালো ফল দেয়, পরবর্তী প্রজন্মে তার জিনগত বিস্তার ঘটে; অন্যথায় তা বিলুপ্তির দিকে ধাবিত হয়। কোনো সচেতন চিন্তা ছাড়াই প্রাকৃতিক নির্বাচন এক মহাশক্তিশালী অপ্টিমাইজেশন অ্যালগরিদম হিসেবে জীবজগৎকে গেম থিওরির সাম্যাবস্থায় স্থিতিশীল রাখে।