প্রথম এআই শীতকালের তীব্র তুষারপাতের পর ১৯৮০-এর দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। তৎকালীন কর্পোরেট বিশ্ব ঝুঁকে পড়েছিল ‘এক্সপার্ট সিস্টেম’-এর দিকে: মানুষের পেশাগত জ্ঞানকে হাজার হাজার কঠিন নিয়মে লিপিবদ্ধ করে বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিভৃত গবেষণাগারে একদল তরুণ বিজ্ঞানী নিউরাল নেটওয়ার্কের স্বপ্নকে মরতে দেননি। ভেক্টর ক্যালকুলাস প্রয়োগ করে তাঁরা প্রমাণ করলেন যে উপযুক্ত গাণিতিক অ্যালগরিদমের সাহায্যে নিউরাল নেটওয়ার্ক নিজ থেকেই জটিল প্যাটার্ন ও অভ্যন্তরীণ উপস্থাপনা শিখে নিতে পারে।
১. এক্সপার্ট সিস্টেমের উত্থান: জ্ঞানের বাণিজ্যায়ন
১৯৮০ সালের দিকে সাধারণ-উদ্দেশ্যমূলক যুক্তি বাদ দিয়ে বিজ্ঞানীরা সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রের বাস্তব জ্ঞানের ওপর জোর দিতে শুরু করেন। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এডওয়ার্ড ফিজেনবাউম ঘোষণা করেন তাঁর বিখ্যাত নীতি: মানুষের বুদ্ধি কোনো অলৌকিক যুক্তির কারণে নয়, বরং তার দীর্ঘদিনের অর্জিত গভীর বাস্তব জ্ঞানের ভাণ্ডার থেকেই উৎসারিত হয়।
জন্ম হলো এক্সপার্ট সিস্টেম (Expert Systems)—যা চিকিৎসা, ভূতত্ত্ব বা ব্যাংকিংয়ের মতো সুনির্দিষ্ট পেশায় মানুষের বিশেষজ্ঞ সিদ্ধান্তের অনুকরণ করত। এর মূল কাঠামো ছিল দুটি অংশে বিভক্ত:
- নলেজ বেস (Knowledge Base): মানুষের বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে হাজার হাজার
IF <শর্ত> THEN <সিদ্ধান্ত>নিয়মে লিপিবদ্ধ করে রাখা। - ইনফারেন্স ইঞ্জিন (Inference Engine): যুক্তির ইঞ্জিন, যা ফরওয়ার্ড বা ব্যাকওয়ার্ড চেইনিংয়ের মাধ্যমে লক্ষণগুলো বিচার করে সিদ্ধান্তে পৌঁছাত।
মাইসিন (MYCIN) এবং এক্সকন (XCON)
স্ট্যানফোর্ডের তৈরি মাইসিন (MYCIN) রক্তের মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ নির্ণয় করে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করত। চিকিৎসা জগতের অনিশ্চয়তা পরিমাপের জন্য এটি উদ্ভাবন করে সার্টেইনটি ফ্যাক্টর (Certainty Factor – CF)। পরীক্ষায় দেখা গেছে, শীর্ষ চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশনের চেয়ে মাইসিনের সিদ্ধান্ত শতকরা ৬৫ ভাগ ক্ষেত্রে বেশি নির্ভুল ছিল!
১৯৮০ সালে ডিইসি (DEC) কোম্পানি কম্পিউটার হার্ডওয়্যার তৈরির স্বয়ংক্রিয় নির্দেশনার জন্য ব্যবহার শুরু করে এক্সকন (XCON)। বছরে ২০,০০০ কম্পিউটারের অর্ডার নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করে এটি কোম্পানিকে বছরে ৪ কোটি ডলার সাশ্রয় করে দিত। জাপান ঘোষণা করল তাদের ৮৫ কোটি ডলারের ফিফথ জেনারেশন কম্পিউটার সিস্টেম (FGCS) প্রকল্প।
২. জন হপফিল্ড এবং শক্তি ল্যান্ডস্কেপ (Hopfield Networks)
১৯৮২ সালে তাত্ত্বিক পদার্থবিদ জন হপফিল্ড একটি যুগান্তকারী পেপার প্রকাশ করেন। হপফিল্ড দেখান যে পরস্পর যুক্ত নিউরাল নেটওয়ার্কের আচরণ হুবহু পদার্থবিজ্ঞানের আইসিং স্পিন গ্লাস (Ising spin glass) মডেলের মতো আচরণ করে। তিনি নেটওয়ার্কের সামগ্রিক অবস্থাকে একটি শক্তি অপেক্ষক বা এনার্জি ফাংশন (Energy Function – $E$) দিয়ে সংজ্ঞায়িত করেন:
$$E = -\frac{1}{2} \sum_{i=1}^{N} \sum_{j=1}^{N} w_{ij} s_i s_j + \sum_{i=1}^{N} \theta_i s_i$$হপফিল্ড প্রমাণ করেন যে নেটওয়ার্কের নিউরনগুলো যখন কাজ করে, তখন পুরো সিস্টেমটি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসার মতো তার সর্বনিম্ন শক্তির অবস্থানে (Local Energy Minimum) পৌঁছে যায়। হপফিল্ড নেটওয়ার্ক ছিল একটি চমৎকার স্মৃতিভাণ্ডার: একটি ঝাপসা বা কাটাছেঁড়া ছবি ইনপুট দিলে এটি নিজের মেমোরি থেকে সম্পূর্ণ নিখুঁত মূল ছবিটি উদ্ধার করে ফুটিয়ে তুলতে পারত!
৩. ব্যাকপ্রোপাগেশন বিপ্লব (১৯৮৬): এক্সওআর অভিশাপের মুক্তি
হপফিল্ডের সাফল্য সত্ত্বেও নিউরাল নেটওয়ার্কের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল: মিনস্কি ও পাপার্টের ১৯৬৯ সালের আক্রমণ। একক স্তরের নিউরাল নেটওয়ার্ক XOR ফাংশন শিখতে পারে না, আর একাধিক স্তরের নিউরাল নেটওয়ার্কের ভেতরের লুকায়িত স্তরকে (Hidden Layers) প্রশিক্ষণ দেওয়ার কোনো উপায় কারও জানা ছিল না।
১৯৮৬ সালে বিখ্যাত নেচার (Nature) জার্নালে প্রকাশিত মাত্র তিন পৃষ্ঠার একটি অমর পেপারে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন ডেভিড রিউমেলহার্ট, জিওফ্রি হিন্টন এবং রোনাল্ড উইলিয়ামস: লার্নিং রিপ্রেজেন্টেশনস বাই ব্যাক-প্রোপাগেটিং এররস।
ব্যাকপ্রোপাগেশনের গণিত
হিন্টন এবং তাঁর সহকর্মীরা দুটি বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটালেন:
- রোজেনব্ল্যাটের অপূর্ণাঙ্গ স্টেপ ফাংশনের বদলে মসৃণ ও ডিফারেনশিয়েবল সিগময়েড অ্যাক্টিভেশন ফাংশন ব্যবহার: $\sigma(z) = \frac{1}{1 + e^{-z}}$।
- ক্যালকুলাসের চেইন রুল (Chain Rule) ব্যবহার করে আউটপুটের ত্রুটিকে (Error Loss) নেটওয়ার্কের শেষ থেকে উল্টো দিকে পেছনের সমস্ত লুকায়িত স্তরে সঞ্চালিত করা।
আউটপুট লেয়ারের ত্রুটি সংকেত:
$$\delta_k = (\hat{y}_k – y_k) \cdot \sigma'(z_k) = (\hat{y}_k – y_k) \hat{y}_k (1 – \hat{y}_k)$$আর ভেতরের লুকায়িত স্তরের নিউরনের ত্রুটি পেছনের সমস্ত সংযুক্ত নিউরনের ওজনের গুণফল থেকে সংগৃহীত হয়:
$$\delta_j = \left( \sum_{k} \delta_k w_{jk} \right) \cdot a_j (1 – a_j)$$এবং ওজনের পরিবর্তন হয় গ্রেডিয়েন্ট ডিসেন্ট নিয়মে: $\Delta w_{ij} = -\eta \cdot \delta_j \cdot a_i$।
হিন্টনরা দেখালেন যে এই ব্যাকপ্রোপাগেশন অ্যালগরিদম দিয়ে মাত্র দুটি হিডেন নিউরন ব্যবহার করেই কুখ্যাত XOR সমস্যা এক নিমেষে সমাধান করা যায়! এক নিউরন শেখে OR লজিক, অপরটি শেখে NAND লজিক—আর আউটপুট নিউরন তাদের মিলিয়ে নিখুঁত XOR তৈরি করে ফেলে। ১৭ বছর পর মিনস্কি ও পাপার্টের দেওয়া অভিশাপ চিরতরে চুরমার হয়ে গেল।
৪. এক্সপার্ট সিস্টেমের পতন: দ্বিতীয় এআই শীতকাল
বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন ব্যাকপ্রোপাগেশনের জয়জয়কার, ঠিক তখনই ১৯৮৭ সালে কর্পোরেট এক্সপার্ট সিস্টেমের বাজারে বিপর্যয় নেমে এলো:
- ভঙ্গুরতা সমস্যা (Brittleness): কোনো রোগী বা সমস্যার লক্ষণ যদি পূর্বনির্ধারিত ৫,০০০ নিয়মের সামান্য বাইরে চলে যেত, তবে পুরো এক্সপার্ট সিস্টেম চরম অদ্ভুত ও ভুল উত্তর দিতে শুরু করত।
- রুলের স্ববিরোধিতা: নলেজ বেসে নিয়মের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়ে গেলে একটি নিয়মের সাথে আরেকটি নিয়মের দ্বন্দ্ব তৈরি হতো, যা সমাধান করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
- হার্ডওয়্যার পতন: সিম্বলিক্সের মতো কোম্পানিগুলো যেসব বিশেষায়িত লিস্প মেশিন ১ লাখ ডলারে বিক্রি করত, সাধারণ ইন্টেল ৩৮৬ ও সান ওয়ার্কস্টেশন তার চেয়ে অনেক সস্তায় সেই সফটওয়্যার চালাতে শুরু করল।
১৯৮৭ সালে রাতারাতি কয়েক ডজন এআই কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেল। শুরু হলো ইতিহাসের দ্বিতীয় এআই শীতকাল (Second AI Winter)। কিন্তু এবারের শীতকাল ছিল অস্থায়ী; কারণ ভেতরে ভেতরে আধুনিক মেশিন লার্নিং ও ইন্টারনেটের মহাসমুদ্র তৈরি হচ্ছিল।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- Rumelhart, D. E., Hinton, G. E., & Williams, R. J. (1986). Learning representations by back-propagating errors. Nature, 323, 533–536.
- Hopfield, J. J. (1982). Neural networks with emergent computational abilities. PNAS, 79(8), 2554–2558.
- Shortliffe, E. H. (1976). MYCIN. Elsevier.
- Feigenbaum, E. A. (1977). The art of artificial intelligence. IJCAI, 1014–1029.