১৯৪৩ সালের শীতের আগ পর্যন্ত পৃথিবীর সমস্ত গণকযন্ত্রের গতি সীমাবদ্ধ ছিল যান্ত্রিক পিতলের চাকা এবং ইলেক্ট্রোমেকানিক্যাল রিলে সুইচের ধীরগতির ভেতরে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জীবন-মরণ লড়াই সেই সীমাবদ্ধতাকে গুঁড়িয়ে দিল। ব্লেচলি পার্কের গোপন কুটির এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল গবেষণাগারে বিজ্ঞানীরা ভ্যাকুয়াম টিউবের ভেতর দিয়ে আলোর গতিতে ছুটে চলা ইলেকট্রনের প্রবাহকে যুক্তির শৃঙ্খলে বাঁধলেন—যার মাধ্যমে জন্ম নিল ডিজিটাল ইলেকট্রনিক কম্পিউটিং যুগ।
১. লরেঞ্জ সাইফারের সংকট এবং কলোসাসের জন্ম
অ্যালান টুরিংয়ের বম্ব যখন জার্মান নৌবাহিনীর এনিগমা কোড ভাঙছিল, তখন খোদ অ্যাডলফ হিটলার ও তাঁর শীর্ষ জেনারেলদের মধ্যে গোপন যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হতো আরও বহু গুণ শক্তিশালী এক সামরিক সাইফার: লরেঞ্জ এসজেড৪০/৪২ (Lorenz SZ40/42)। এতে এনিগমার ৩ বা ৪টি রোটরের পরিবর্তে ছিল ১২টি পিন-হুইল, যা ৫-বিট বাউডট টেলিপ্রিন্টার কোডে $১০^{১৩১}$ টি সম্ভাব্য কি (Key) তৈরি করতে পারত।
এই কোড ভাঙার জন্য ব্রিটিশ পোস্ট অফিসের দূরদর্শী টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী টমাস “টমি” ফ্লাওয়ার্স এক অবিশ্বাস্য প্রস্তাব দিলেন: কোনো যান্ত্রিক কাগজের ফিতা বা গিয়ার ব্যবহার না করে থার্মায়োনিক ভালভ (ভ্যাকুয়াম টিউব) ব্যবহার করে পুরো জার্মান রোটর প্রক্রিয়াকে ইলেকট্রনিক রূপ দেওয়া হোক।
ফ্লাওয়ার্স মাত্র ১১ মাসে তৈরি করেন কলোসাস মার্ক ১ (Colossus Mark 1)। ১৯৪৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্লেচলি পার্কে কাজ শুরু করা এই কলোসাসই ছিল বিশ্বের প্রথম কার্যকর প্রোগ্রামযোগ্য ইলেকট্রনিক ডিজিটাল কম্পিউটার:
- ইলেকট্রনিক সুইচিং গতি: ১,৫০০টি ভ্যাকুয়াম টিউব সেকেন্ডে ৫,০০০টি ক্যারেক্টার পড়ার গতিতে বুলিয়ান লজিক অপারেশন সম্পাদন করত।
- প্যারালাল প্রসেসিং: দ্বিতীয় সংস্করণ কলোসাস মার্ক ২-এ ২,৪০০টি টিউব এবং ৫-মুখী প্যারালাল শিফট রেজিস্টার ব্যবহার করে কার্যক্ষমতা সেকেন্ডে ২৫,০০০ ক্যারেক্টারে উন্নীত করা হয়।
- সামরিক প্রভাব: কলোসাস সরাসরি হিটলারের যুদ্ধবার্তা উদ্ধার করে জেনারেল আইজেনহাওয়ারকে নিশ্চিত করেছিল যে মিত্রবাহিনীর নরম্যান্ডি অবতরণ (D-Day) সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু যুদ্ধকালীন চরম গোপনীয়তার কারণে চার্চিলের নির্দেশে যুদ্ধের পরপরই কলোসাসের সমস্ত মডেল কুড়াল দিয়ে ভেঙে লোহা-লক্কড় হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়!
২. জন মকলি, একার্ট এবং ৩০ টনের এনিয়াক (ENIAC)
আটলান্টিকের ওপারে মার্কিন সেনাবাহিনী তখন কামানের গোলার ব্যালিস্টিক ট্র্যাজেক্টরি হিসাব করতে গিয়ে মহাসংকটে পড়েছিল। একটি ৬০-সেকেন্ডের কামানের গোলার গতিপথ হিসাব করতে একজন দক্ষ হিসাবরক্ষকের ২০ ঘণ্টা সময় লেগে যেত।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ জন মকলি এবং প্রতিভাবান তরুণ প্রকৌশলী জে. প্রেসপার একার্ট প্রস্তাব করেন সম্পূর্ণ ইলেকট্রনিক গণকযন্ত্র: এনিয়াক (ENIAC – Electronic Numerical Integrator and Computer)। ১৯৪৩ সালের জুনে শুরু হয়ে ১৯৪৫ সালে সমাপ্ত হওয়া এই যন্ত্রটি ছিল ভ্যাকুয়াম টিউব প্রযুক্তির এক বিশাল দানব:
- বিশাল আয়তন: ১৭,৪৬৮টি ভ্যাকুয়াম টিউব, ৭,২০০টি ক্রিস্টাল ডায়োড এবং ৫০ লাখ হাত দিয়ে ঝালাই করা তারের সংযোগে গঠিত এই যন্ত্রের ওজন ছিল ৩০ টন এবং এটি দখল করেছিল ১,৮০০ বর্গফুট জায়গা।
- বিদ্যুৎ খরচ: ১৫০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হতো, যার কারণে গুজব রটেছিল যে এনিয়াক চালু করলেই ফিলাডেলফিয়া শহরের বাতি টিমটিম করে জ্বলত!
- ক্লক স্পিড: ১০০ কিলোহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সিতে এটি প্রতি সেকেন্ডে ৫,০০০টি যোগফল বের করতে পারত—যা যেকোনো তৎকালীন ক্যালকুলেটরের চেয়ে ১,০০০ গুণ দ্রুত।
ভ্যাকুয়াম টিউবের স্থায়িত্বের পদার্থবিজ্ঞান
সমালোচকরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে ১৭ হাজার টিউবযুক্ত যন্ত্রে প্রতি কয়েক সেকেন্ডে একটি করে টিউব ফিউজ হয়ে পুড়ে যাবে, ফলে এটি একটানা এক মিনিটও চলতে পারবে না। একার্ট এর এক অসাধারণ প্রকৌশলগত সমাধান বের করেন: তিনি টিউবগুলোকে তাদের মূল ক্ষমতার মাত্র ২৫% ভোল্টেজে চালাতেন এবং হিটার কারেন্ট ১০% কমিয়ে দেন। এর ফলে টিউব নষ্ট হওয়ার হার কমে দাঁড়িয়েছিল প্রতি দুই দিনে মাত্র একটিতে—যার ফলে এনিয়াক একটানা বহু দিন চলতে পেরেছিল।
৩. এনিয়াক সিক্স: প্রোগ্রামিংয়ের প্রথম ছয় নারী
এনিয়াকের বিশাল হার্ডওয়্যার তৈরি করেছিলেন পুরুষ প্রকৌশলীরা, কিন্তু এই যন্ত্রকে গণনা করতে শেখানোর জন্য যে সফটওয়্যার লজিক প্রয়োজন ছিল—তা তৈরি করেছিলেন ছয়জন অসাধারণ নারী গণিতবিদ: ক্যাথলিন ম্যাকনাল্টি, ফ্রান্সেস বিলাস, বেটি জিন জেনিংস, রুথ লিখটারম্যান, এলিজাবেথ স্নাইডার এবং মার্লিন ওয়েকফ।
তৎকালীন সময়ে কোনো প্রোগ্রামিং ভাষা, সি বা পাইথন তো দূরের কথা, কোনো অপারেটিং সিস্টেমও ছিল না। এনিয়াককে প্রোগ্রাম করতে হতো শারীরিকভাবে তার টেনে টেনে প্লাগবোর্ডে লাগিয়ে। এই ছয়জন প্রোগ্রামারকে মূল ব্যালিস্টিক ডিফারেনশিয়াল সমীকরণকে ২০টি অ্যাকুমুলেটরে ভাগ করে, ৩,০০০টি রোটারি সুইচ ঘুরিয়ে এবং ভারী কালো প্যাচ কর্ড প্লাগ করে কোডিং সম্পন্ন করতে হতো।
১৯৪৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি যখন এনিয়াককে প্রথম জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়, তখন এটি একটি কামানের গোলার গতিপথ হিসাব করেছিল মাত্র ২০ সেকেন্ডে—একটি আসল কামানের গোলা আকাশে উড়ে গিয়ে লক্ষ্যে আঘাত হানার সময়ের চেয়েও কম সময়ে! এভাবেই বিশ্ব প্রবেশ করে ইলেকট্রনিক গণনার নতুন দিগন্তে।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- Flowers, T. H. (1983). The Design of Colossus. Annals of the History of Computing, 5(3), 239–252.
- Eckert, J. P., & Mauchly, J. W. (1945). The ENIAC. Moore School of Electrical Engineering.
- Light, J. S. (1999). When computers were women. Technology and Culture, 40(3), 455–483.
- Copeland, B. J. (2006). Colossus: The Secrets of Bletchley Park’s Codebreaking Computers. Oxford University Press.