১৯৮৯ সালের মার্চ মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ইউরোপীয় নিউক্লিয়ার রিসার্চ অর্গানাইজেশন (CERN)-এর এক তরুণ ইংরেজ কম্পিউটার বিজ্ঞানী তাঁর পরিচালকের টেবিলে একটি সাধারণ প্রস্তাবনা জমা দেন: “ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট: আ প্রপোজাল”। পরিচালক মাইক সেন্ডাল কাগজের এক কোনায় লিখে দিলেন ঐতিহাসিক চারটি শব্দ: “অস্পষ্ট কিন্তু উত্তেজনাপূর্ণ…”। সেই ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ থেকেই জন্ম নিল ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (World Wide Web)—মানবজাতির জ্ঞানের এক মুক্ত মহাসমুদ্র, যা একাডেমিক কম্পিউটার নেটওয়ার্ককে মানব সভ্যতার উন্মুক্ত গণমঞ্চে রূপান্তরিত করল।
১. সংযুক্ত ভাবনার দর্শন: ভ্যানিভার বুশ থেকে হাইপারটেক্সট
কম্পিউটার তৈরির বহু আগে ১৯৪৫ সালে মার্কিন বিজ্ঞান উপদেষ্টা ভ্যানিভার বুশ প্রকাশ করেন বিখ্যাত প্রবন্ধ অ্যাজ উই মে থিংক (As We May Think)। মানুষের মস্তিষ্ক আলমারির ফাইলের মতো ধাপে ধাপে চিন্তা করে না; মস্তিষ্ক কাজ করে সংযোগের মাধ্যমে—একটি ধারণা থেকে পলকে আরেকটি স্মৃতিতে লাফিয়ে চলে।
বুশ কল্পনা করেছিলেন মেমেক্স (Memex) নামে এক যন্ত্রের—যেখানে মাইক্রোফিল্মের সাহায্যে একটি বইয়ের পাতার সাথে আরেকটি বইয়ের পাতার স্থায়ী সংযোগ তৈরি করা যাবে। ১৯৬৫ সালে প্রযুক্তি স্বপ্নদ্রষ্টা টেড নেলসন উদ্ভাবন করেন অমর শব্দ হাইপারটেক্সট (Hypertext)—এমন এক লেখা যার ভেতরে শব্দের সাথে নীল লিংকে ক্লিক করে সরাসরি অন্য যেকোনো লেখায় চলে যাওয়া যায়।
২. টিম বার্নার্স-লি এবং সার্ন (CERN)-এর মহাবিজ্ঞান
১৯৮৯ সালে সার্ন ছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ কণা পদার্থবিজ্ঞান গবেষণাগার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা সেখানে এসে গবেষণা করতেন, কিন্তু তাঁদের কম্পিউটারগুলো একে অপরের সাথে মিলত না। কেউ চালাত ইউনিক্স, কেউ ডস, কেউবা ম্যাকিনটোশ। গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার তথ্য বিভিন্ন ফোল্ডারে হারিয়ে যেত।
কম্পিউটার বিজ্ঞানী টিম বার্নার্স-লি উপলব্ধি করলেন যে সবার কম্পিউটার এক করার চেষ্টা না করে ইন্টারনেটের টিসিপি/আইপি নেটওয়ার্কের ওপর একটি উন্মুক্ত সার্বজনীন পর্দা বিছিয়ে দেওয়া সম্ভব। তিনি উদ্ভাবন করলেন ওয়েবের তিনটি মূল স্তম্ভ:
- ইউআরআই / ইউআরএল (URL): ইন্টারনেটের যেকোনো ফাইলের একটি সার্বজনীন স্থায়ী ঠিকানা:
http://info.cern.ch/... - এইচটিটিপি (HTTP): টেক্সট-ভিত্তিক যোগাযোগ প্রটোকল, যার সাহায্যে ব্রাউজার ওয়েব সার্ভারের কাছে পেজ চায় এবং সার্ভার তা ফেরত পাঠায়।
- এইচটিএমএল (HTML): সাধারণ ট্যাগযুক্ত ভাষা, যার মাধ্যমে লেখার ভেতর
<a href="...">লিংকের সাহায্যে বিশ্বের যেকোনো ওয়েব পেজকে সংযুক্ত করা যায়।
নেক্সটকিউব এবং ১৯৯০ সালের বড়দিন
স্টিভ জবসের তৈরি কালো রঙের নেক্সটকিউব (NeXTcube) কম্পিউটারে বসে টিম বার্নার্স-লি মাত্র তিন মাসে তৈরি করলেন বিশ্বের প্রথম ওয়েব সার্ভার সফটওয়্যার এবং প্রথম ওয়েব ব্রাউজার-এডিটর: WorldWideWeb।
১৯৯০ সালের বড়দিনে সার্নের গবেষণাগারে প্রথম ওয়েবসাইট চালু হয়। সার্ভার যাতে কেউ ভুল করে বন্ধ না করে দেয়, সেজন্য বার্নার্স-লি কম্পিউটারের গায়ে একটি চিরকুট সেঁটে দিয়েছিলেন: “This machine is a server. DO NOT POWER IT DOWN!” (এই মেশিনটি একটি সার্ভার। ভুলেও এর পাওয়ার বন্ধ করবেন না!)
৩. মুক্ত পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার: ৩০ এপ্রিল, ১৯৯৩
ইতিহাসে এমন বহু প্রযুক্তি ছিল যা কর্পোরেট লোভের কারণে হারিয়ে গেছে। কিন্তু টিম বার্নার্স-লি এক অনন্য ঐতিহাসিক নৈতিক অবস্থান নিলেন: তিনি দাবি করলেন যে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের সমস্ত প্রোটোকল সমগ্র মানবজাতির জন্য চিরকালের মতো সম্পূর্ণ উন্মুক্ত এবং প্যাটেন্টমুক্ত থাকতে হবে।
৩০ এপ্রিল, ১৯৯৩ তারিখে সার্ন একটি ঐতিহাসিক আইনি দলিল প্রকাশ করে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের সমস্ত সফটওয়্যারকে পাবলিক ডোমেইনে (Public Domain) উন্মুক্ত করে দেয়। কোনো কোম্পানি বা ব্যক্তি কাউকে এক পয়সা রয়্যালটি না দিয়ে নিজের সার্ভার তৈরি ও ব্রাউজার বানানোর স্বাধীনতা লাভ করল। এই নিঃস্বার্থ দানের কারণেই ওয়েব দাবানলের মতো গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিল।
৪. মার্ক অ্যান্ড্রিজেন এবং মোজাইক (Mosaic) ব্রাউজার বিপ্লব
১৯৯৩ সালে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশ বছর বয়সী তরুণ ছাত্র মার্ক অ্যান্ড্রিজেন এবং এরিক বিনা তৈরি করলেন এনসিএসএ মোজাইক (NCSA Mosaic) ব্রাউজার। মোজাইক এনে দিল দুটি মহা-উদ্ভাবন:
- ইনলাইন কালার ইমেজ (
<img>ট্যাগ): লেখার পাশাপাশি একই পেজে রঙিন ছবি ফুটিয়ে তোলার সুবিধা। - এক ক্লিকে ইনস্টলেশন: উইন্ডোজ ও ম্যাকিনটোশে মাউসের এক ক্লিকে ব্যাক, ফরোয়ার্ড এবং বুকমার্ক ব্যবহারের সুযোগ।
মোজাইক ওয়েবকে সাধারণ মানুষের সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করল। অ্যান্ড্রিজেন সিলিকন ভ্যালিতে গিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন নেটস্কেপ (Netscape)। ১৯৯৫ সালের ৯ আগস্ট নেটস্কেপের ঐতিহাসিক আইপিও (IPO) ওয়াল স্ট্রিটে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সূচনা করল ইতিহাসের মহাকাব্যিক ডট-কম বিপ্লব।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- Berners-Lee, T. (1989). Information Management: A Proposal. CERN.
- Berners-Lee, T., et al. (1994). The World-Wide Web. CACM, 37(8), 76–82.
- Bush, V. (1945). As We May Think. The Atlantic Monthly, 176(1), 101–108.
- Berners-Lee, T. (1999). Weaving the Web. HarperSanFrancisco.