২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর সান ফ্রান্সিসকোর একটি ছোট্ট গবেষণাগার সাধারণ মানুষের পরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত করে দিল একটি চ্যাটবট: চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)। মাত্র পাঁচ দিনে ১০ লাখ ব্যবহারকারী এবং দুই মাসের মধ্যে ১০ কোটি ব্যবহারকারী যুক্ত হলো এতে—যা মানব ইতিহাসের দ্রুততম গ্রাহক বৃদ্ধির রেকর্ড। কম্পিউটিং এক ঐতিহাসিক সীমা অতিক্রম করল: কম্পিউটার আর কেবল মানুষের তৈরি তথ্য বিশ্লেষণ করছিল না; যন্ত্র এখন নিজ থেকেই সৃষ্টি করতে শুরু করল ভাষা, ছবি, সঙ্গীত এবং জটিল কম্পিউটার কোড।
১. জেনারেটিভ দৃষ্টির গণিত: গ্যান (GAN) থেকে ডিফিউশন
২০১৪ সালে পিএইচডি ছাত্র ইয়ান গুডফেলো উদ্ভাবন করেন জেনারেটিভ অ্যাডভারসারিয়াল নেটওয়ার্ক (GAN)। এটি দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী নেটওয়ার্কের জিরো-সাম গেম হিসেবে কাজ করে:
- জেনারেটর ($G$): কৃত্রিমভাবে ছবি তৈরি করে বিচারককে বোকা বানানোর চেষ্টা করে।
- ডিসক্রিমিনেটর ($D$): আসল ছবি ও জেনারেটরের তৈরি জাল ছবি আলাদা করার চেষ্টা করে।
ডিফিউশন মডেল (Diffusion Models): পদার্থবিজ্ঞান থেকে শিল্পের জন্ম
২০২০ সালে জনাথন হো প্রমুখ থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র প্রয়োগ করে উদ্ভাবন করলেন ডিনয়েজিং ডিফিউশন প্রবাবিলিস্টিক মডেল (DDPM)। এর কার্যপদ্ধতি দুটি ধাপে বিভক্ত:
- সম্মুখমুখী ধাপ (ধ্বংস): একটি নিখুঁত ছবির ওপর ধাপে ধাপে গাউসিয়ান নয়েজ (Noise) ছড়িয়ে দিয়ে তাকে সম্পূর্ণ অর্থহীন ঝাপসা পর্দায় পরিণত করা।
- বিপরীতমুখী ধাপ (সৃষ্টি): একটি ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্ক শেখে কীভাবে সেই অর্থহীন নয়েজ থেকে ধাপে ধাপে শব্দগুলো মুছে ফেলে একটি নিখুঁত বাস্তবসম্মত ছবি ফুটিয়ে তুলতে হয়!
২০২২ সালে রবিন রমব্যাচ উদ্ভাবন করলেন ল্যাটেন্ট ডিফিউশন (Stable Diffusion)। এর সাথে ওপেনএআইয়ের ক্লিপ (CLIP) যুক্ত হওয়ায় সাধারণ মানুষের ইংরেজি বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে মিডজার্নি ও স্টেবল ডিফিউশন কয়েক সেকেন্ডে রাজকীয় পেইন্টিং তৈরি করার ক্ষমতা লাভ করল।
২. অ্যালাইনমেন্ট সংকট এবং আরএলএইচএফ (RLHF)
ইন্টারনেটের কোটি কোটি লেখার ওপর প্রশিক্ষিত একটি সাধারণ ভাষা মডেল কোনো বাধ্য সহকারী হতে পারে না। তাকে সাধারণ প্রশ্ন করলে সে ভুল তথ্য দিতে পারে, বাজে কথা বলতে পারে বা বিভ্রান্তিকর উত্তর তৈরি করতে পারে—যাকে বলা হয় হ্যালুসিনেশন।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্ভাবিত হলো হিউম্যান ফিডব্যাক চালিত রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং (RLHF):
- সুপারভাইজড ফাইন-টিউনিং (SFT): মানুষের তৈরি আদর্শ প্রশ্নোত্তর দিয়ে মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
- রিওয়ার্ড মডেল (Reward Model): একাধিক উত্তরের মধ্যে মানুষ কোনটিকে বেশি পছন্দ করে, তার ওপর ভিত্তি করে একটি স্কোরিং সিস্টেম তৈরি।
- পিকেও (PPO): রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিংয়ের মাধ্যমে মডেলের আচরণকে মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ও নিরাপত্তার সাথে সমন্বয় (Alignment) করা।
৩. চ্যাটজিপিটি মহাবিস্ফোরণ: নভেম্বর ২০২২
যখন এই অ্যালাইন্ড মডেলটিকে একটি সাধারণ চ্যাটবটের পর্দায় জুড়ে দিয়ে ওপেনএআই ২০২২ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটি হিসেবে প্রকাশ করল, তখন বিশ্বজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। মানুষ দেখল এই যন্ত্র জটিল আইনি দলিল তৈরি করতে পারে, পাইথন কোডের বাগ সংশোধন করতে পারে, কবিতার ছন্দে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারে।
৪. মাল্টিমোডাল যুগ
২০২৪ সালের মধ্যে এআই শুধু টেক্সটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না। জিপিটি-৪ও (GPT-4o), গুগলের জেমিনাই (Gemini) এবং ক্লড ৩.৫ সনেটের মতো মডেলগুলো একই সাথে মানুষের কণ্ঠ শুনতে পারে, ক্যামেরা দিয়ে বাস্তব পৃথিবী দেখতে পারে এবং রিয়েল-টাইমে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। মানুষের তৈরি জ্ঞানের মহাসমুদ্রের সাথে একাকার হয়ে কম্পিউটিং প্রবেশ করল এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ে।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- Goodfellow, I., et al. (2014). Generative adversarial nets. NeurIPS, 27.
- Ho, J., et al. (2020). Denoising diffusion probabilistic models. NeurIPS, 33.
- Rombach, R., et al. (2022). High-resolution image synthesis with latent diffusion. CVPR.
- Ouyang, L., et al. (2022). Training language models to follow instructions. NeurIPS, 35.