১৯৫৮ সালের এক তপ্ত গ্রীষ্মে মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষণাগার থেকে ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে এমন এক যন্ত্রের ঘোষণা দেওয়া হলো যা সায়েন্স ফিকশনকেও হার মানায়: এমন এক ইলেকট্রনিক মেশিন যা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিখতে পারে, চোখ দিয়ে দেখতে পারে এবং ভবিষ্যতে একা একা হাঁটতে, কথা বলতে ও নিজের অনুরূপ বংশবৃদ্ধি করতে পারবে! এটি ছিল ফ্র্যাঙ্ক রোজেনব্ল্যাটের পারসেপট্রন। কিন্তু মাত্র এগারো বছর পর মারভিন মিনস্কি ও সেমুর পাপার্টের এক নির্মম গাণিতিক সমালোচনা পুরো এআই জগতকে এক দশকে দীর্ঘ বরফযুগে নিক্ষেপ করে: শুরু হয় প্রথম এআই শীতকাল।

১. জৈবিক অনুপ্রেরণা: ম্যাককুলক, পিটস এবং হেব

ডার্টমাউথের বিজ্ঞানীরা যখন দাবা খেলা ও আনুষ্ঠানিক লজিক দিয়ে মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে উপর থেকে নিচে (Top-down) সাজানোর চেষ্টা করছিলেন, তখন বিজ্ঞানীদের অপর একটি দল মস্তিষ্ক থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে নিচ থেকে উপরে (Bottom-up) বুদ্ধিমত্তা তৈরির পথ খুঁজছিলেন—যাকে বলা হয় কানেকশনিজিম (Connectionism) বা কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক।

১৯৪৩ সালে নিউরোফিজিওলজিস্ট ওয়ারেন ম্যাককুলক এবং প্রতিভাবান তরুণ গণিতবিদ ওয়াল্টার পিটস জীবদেহের একটি নিউরনকে সরল গাণিতিক মডেলে রূপ দেন:

$$y = \Theta \left( \sum_{i=1}^{n} w_i x_i – \theta \right)$$

১৯৪৯ সালে কানাডীয় মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড হেব নিউরনের শেখার মূল জৈবিক সূত্র প্রকাশ করেন, যা হিবিয়ান লার্নিং (Hebbian Learning) নামে পরিচিত:

“যেসব নিউরন একসাথে সক্রিয় হয়, তাদের মধ্যকার সংযোগ শক্ত হয় (Neurons that fire together, wire together)।”

২. ফ্র্যাঙ্ক রোজেনব্ল্যাট এবং মার্ক ১ পারসেপট্রন

১৯৫৭ সালে কর্নেল অ্যারোনটিক্যাল ল্যাবরেটরিতে মনোবিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্ক রোজেনব্ল্যাট তৈরি করেন পৃথিবীর প্রথম কার্যকর কৃত্রিম নিউরাল নেটওয়ার্ক মেশিন: মার্ক ১ পারসেপট্রন (Mark I Perceptron)।

এটি কোনো সফটওয়্যার ছিল না; এটি ছিল একটি বিশাল এনালগ হার্ডওয়্যার যন্ত্র:

  • রেটিনা: ২০x২০ আকারের ৪০০টি ক্যাডমিয়াম-সালফাইড ফটোকোষযুক্ত ক্যামেরা, যা অক্ষরের ছবি ইনপুট হিসেবে গ্রহণ করত।
  • মোটর-চালিত সিন্যাপটিক ওয়েট: প্রতিটি সিন্যাপটিক ওয়েট ছিল একটি করে ইলেকট্রিক্যাল পটেনশিওমিটার, যা ছোট ছোট মোটরের সাহায্যে ঘুরে ঘুরে রেজিস্ট্যান্স পরিবর্তন করত! ভুল হলে মোটর উল্টো দিকে ঘুরে মান ঠিক করে দিত।

পারসেপট্রন কনভার্জেন্স থিওরেম

রোজেনব্ল্যাট গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেন বিখ্যাত পারসেপট্রন কনভার্জেন্স থিওরেম (Perceptron Convergence Theorem): যদি দুটি ক্লাসের ডেটাকে একটি সমতল বা হাইপারপ্লেন দিয়ে আলাদা করা সম্ভব হয় (Linearly Separable), তবে পারসেপট্রন অ্যালগরিদম নিশ্চিতভাবে সীমিত সংখ্যক ধাপে সঠিক ওজন খুঁজে বের করে নিখুঁত শ্রেণিবিন্যাস সম্পন্ন করবে!

৩. মিনস্কি ও পাপার্টের চরম আঘাত: এক্সওআর (XOR) সংকট

পারসেপট্রন নিয়ে সংবাদমাধ্যমের অতিরিক্ত অতিরঞ্জন এবং রোজেনব্ল্যাটের আকাশচুম্বী দাবির কারণে ক্ষুব্ধ হন এমআইটির প্রতীকী এআইয়ের প্রবক্তারা। ১৯৬৯ সালে এমআইটি এআই ল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা মারভিন মিনস্কি এবং সেমুর পাপার্ট প্রকাশ করেন এক কালান্তক গবেষণামূলক গ্রন্থ: পারসেপট্রনস (Perceptrons)।

মিনস্কি ও পাপার্ট কোনো তর্কে যাননি; তাঁরা অকাট্য জ্যামিতিক প্রমাণের সাহায্যে দেখিয়ে দিলেন যে একটি একক স্তরের পারসেপট্রন গণিতের অতি সাধারণ এক্সক্লুসিভ-অর (XOR) লজিকও শিখতে পারে না!

দ্বিমাত্রিক তলে একটি সরলরেখা টেনে কখনো XOR-এর চারটি বিন্দুকে ($০, ০ \to ০$; $১, ০ \to ১$; $০, ১ \to ১$; $১, ১ \to ০$) আলাদা করা সম্ভব নয়। এটি একটি নন-লিনিয়ার সমস্যা।

যদিও মাল্টিলেয়ার পারসেপট্রন দিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব, কিন্তু মিনস্কি ও পাপার্ট বইতে চরম হতাশা ব্যক্ত করে লিখেছিলেন যে ভেতরের লুকায়িত স্তরগুলোকে (Hidden Layers) প্রশিক্ষণ দেওয়ার মতো কোনো কার্যকর গাণিতিক অ্যালগরিদম হয়তো কোনোদিনই খুঁজে পাওয়া যাবে না!

৪. লাইটহিল রিপোর্ট এবং প্রথম এআই শীতকাল (AI Winter)

মিনস্কি ও পাপার্টের এই বইয়ের প্রভাব ছিল প্রলয়ঙ্করী। নিউরাল নেটওয়ার্কের সমস্ত গবেষণা তহবিল রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেল। যে বিজ্ঞানীরা নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করতেন, তাদের গবেষণা অনুদান বাতিল করা হলো এবং বিজ্ঞান জার্নালগুলো তাঁদের গবেষণাপত্র প্রকাশ করা বন্ধ করে দিল।

এর পরপরই ১৯৭৩ সালে যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত হয় বিখ্যাত লাইটহিল রিপোর্ট (Lighthill Report)। বিজ্ঞানী স্যার জেমস লাইটহিল প্রমাণ করেন যে এআই গবেষকরা যেসব বিশাল প্রতিশ্রুতি দিয়ে কোটি কোটি পাউন্ড অনুদান নিয়েছিলেন, বাস্তব জগতে তার সামান্য অংশও পূরণ হয়নি। খেলনা জগতের বাইরে বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হলেই এআই কম্বিনেটোরিয়াল এক্সপ্লোশন (Combinatorial Explosion) বা সূচকীয় জটিলতার মুখে পড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রে একই সাথে পাস হয় ম্যানসফিল্ড সংশোধনী, যার ফলে সামরিক উদ্দেশ্যহীন মুক্ত এআই গবেষণায় পেন্টাগনের অর্থায়ন চিরতরে নিষিদ্ধ হয়। ১৯৭৪ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত পুরো এআই জগৎ ঢেকে গেল নিস্তব্ধ বরফের চাদরে—ইতিহাসে যার নাম প্রথম এআই শীতকাল (First AI Winter)।


প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • McCulloch, W. S., & Pitts, W. (1943). A logical calculus of ideas. Bull. Math. Biophys., 5(4), 115–133.
  • Rosenblatt, F. (1958). The perceptron: a probabilistic model. Psychological Review, 65(6), 386–408.
  • Minsky, M., & Papert, S. (1969). Perceptrons. MIT Press.
  • Lighthill, J. (1973). Artificial Intelligence: A General Survey. SRC.