তিন হাজার বছর ধরে প্রাচ্যের প্রাচীন খেলা ‘গো (Go)’ ছিল মানুষের সহজাত অন্তর্দৃষ্টি বা প্রজ্ঞার অভেদ্য দুর্গ। পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বের সমস্ত পরমাণুর চেয়েও বেশি সম্ভাব্য অবস্থানযুক্ত এই খেলাটিকে ডিপ ব্লুর মতো অন্ধ গণনার সাহায্যে জয় করা ছিল অসম্ভব। কিন্তু ২০১৬ সালের মার্চে দক্ষিণ কোরিয়ার সিওলে অনুষ্ঠিত এক ঐতিহাসিক ম্যাচে ডিপমাইন্ডের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ‘আলফাগো’ এমন এক চাল দিল—যা এতোটাই অচিন্ত্যনীয়, গভীর ও সুন্দর ছিল যে তা মানুষের কৌশলগত সৃজনশীলতার হাজার বছরের সংজ্ঞাকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করল।
১. রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিংয়ের নতুন দিগন্ত
গতানুগতিক মেশিন লার্নিং যেখানে মানুষের লেবেলযুক্ত ডেটা দেখে শেখে, রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং (RL) সেখানে রক্ত-মাংসের জীবের মতো শেখে: ভুল ও পুরষ্কারের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। রিচার্ড সাটন ও অ্যান্ড্রু বার্টো কর্তৃক সূত্রবদ্ধ এই পদ্ধতিতে একটি এজেন্ট কোনো পরিবেশে কাজ করে এবং সর্বোচ্চ পুরষ্কার অর্জনের উদ্দেশ্যে বেলম্যান সমীকরণ (Bellman Equation) মেনে চলে:
$$Q^*(s, a) = \mathbb{E} \left[ R + \gamma \max_{a’} Q^*(s’, a’) \right]$$ডিপ কিউ-নেটওয়ার্ক (DQN, ২০১৩–২০১৫)
২০১৩ সালে ডেমিস হাসাবিস ও শেন লেগের প্রতিষ্ঠিত লন্ডনভিত্তিক গবেষণাগার ডিপমাইন্ড (DeepMind) প্রকাশ করল এক বিস্ময়কর আবিষ্কার: ডিপ কিউ-নেটওয়ার্ক (DQN)।
কোনো পূর্বনির্ধারিত নিয়ম না জানিয়ে শুধুমাত্র স্ক্রিনের পিক্সেল এবং স্কোরের ওপর ভিত্তি করে ডিউকিউএন ক্লাসিক আটারি গেমগুলোতে (যেমন ব্রেকআউট, স্পেস ইনভেডার্স) মানুষকেও ছাড়িয়ে গেল। তারা দুটি মূল কৌশল উদ্ভাবন করেছিল:
- এক্সপেরিয়েন্স রিপ্লে: অতীত অভিজ্ঞতার স্মৃতিকে একটি বাফারে জমিয়ে রেখে এলোমেলোভাবে সেখান থেকে শেখা, যাতে সময়ের ধারাবাহিক বিভ্রান্তি দূর হয়।
- টার্গেট নেটওয়ার্ক: শেখার সময় লক্ষ্যমাত্রা যাতে ঘনঘন না নড়ে, সেজন্য একটি ধীরগতির আলাদা নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা।
২. গো (Go) খেলার মহাবিস্ময়
দাবা খেলায় যেখানে প্রতি চালে গড়ে ৩৫টি বিকল্প থাকে, সেখানে ১৯x১৯ গো বোর্ডে গড়ে ২৫০টি সম্ভাব্য চাল থাকে। গো খেলায় মোট সম্ভাব্য অবস্থার সংখ্যা $১০^{১৭০}$—যা পুরো মহাবিশ্বের সমস্ত পরমাণুর সংখ্যার ($১০^{৮০}$) চেয়েও বহুগুণ বেশি! কোনো সুপারকম্পিউটারের পক্ষেই সব চাল গুনে শেষ করা সম্ভব ছিল না।
গো খেলোয়াড়রা নির্ভর করতেন ‘গাম’ বা নান্দনিক অনুভূতির ওপর। বিজ্ঞানীরা ভেবেছিলেন মানুষকে হারাতে এআইয়ের আরও অন্তত ত্রিশ বছর লাগবে।
৩. আলফাগোর আর্কিটেকচার
ডেভিড সিলভার এবং ডেমিস হাসাবিসের নেতৃত্বে ডিপমাইন্ড ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করল মন্টে কার্লো ট্রি সার্চ (MCTS):
- পলিসি নেটওয়ার্ক: ১৯x১৯ বোর্ডের দিকে তাকিয়ে মানুষের সেরা চালগুলোর মতো সম্ভাব্য সেরা কয়েকটি চালের ওপর মনোযোগ সীমাবদ্ধ করত।
- ভ্যালু নেটওয়ার্ক: পুরো বোর্ড বিশ্লেষণ করে কে জিতবে তার সম্ভাবনা $(-১ \text{ থেকে } +১)$ এক নিমেষে জানিয়ে দিত।
- সেলফ-প্লে: আলফাগো নিজের ক্লোনের বিরুদ্ধে কোটি কোটি ম্যাচ খেলে নিজের ভুল সংশোধন করে অনন্য অতিমানবীয় ক্ষমতা অর্জন করল।
৪. সিওল ম্যাচ এবং ঐতিহাসিক ‘মুভ ৩৭’
২০১৬ সালের মার্চে সিওলে আলফাগোর মুখোমুখি হলেন ১৮ বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন কোরিয়ান কিংবদন্তি লি সেডল। কোটি কোটি মানুষ টেলিভিশনে সরাসরি এই ম্যাচ প্রত্যক্ষ করছিল।
মুভ ৩৭: যন্ত্রের ভেতরের প্রজ্ঞা
১০ মার্চ অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় খেলায় আলফাগো কালো পাথর নিয়ে খেলছিল। ম্যাচের ঠিক ৩৭তম চালে আলফাগো এমন একটি চাল দিল যা পুরো বিশ্বকে হতভম্ব করে দিল: মুভ ৩৭।
গো খেলার শতাব্দীপ্রাচীন তত্ত্ব অনুযায়ী ম্যাচের শুরুতে পঞ্চম লাইনে পাথর বসানোকে সবচেয়ে বড় ভুল হিসেবে গণ্য করা হতো। চালটি দেখে ধারাভাষ্যকাররা বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। লি সেডল চোখ বড় বড় করে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইলেন এবং হতভম্ব হয়ে রুম ছেড়ে বাইরে চলে গেলেন! আলফাগো হিসাব করেছিল যে কোনো দক্ষ মানুষ এই চাল দেবে তার সম্ভাবনা ছিল ১০ হাজারে মাত্র ১ বার। এটি ছিল সম্পূর্ণ নতুন এক মহাজাগতিক দর্শন: স্থানীয় ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিয়ে পুরো বোর্ডের কেন্দ্রে আধিপত্য বিস্তার করা।
আলফাগো ম্যাচটি ৪-১ ব্যবধানে জিতে নিল। পরে ২০১৭ সালে ডিপমাইন্ড তৈরি করে আলফাগো জিরো (AlphaGo Zero)—যা মানুষের কোনো খেলা না দেখে, কেবল খেলার নিয়ম জেনে মাত্র ৪০ দিনের মধ্যে মূল আলফাগোকে ১০০-০ ম্যাচে পরাজিত করে! যন্ত্র প্রথমবারের মতো মানুষের সমকক্ষ প্রজ্ঞার স্তরে প্রবেশ করল।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- Mnih, V., et al. (2015). Human-level control through deep reinforcement learning. Nature, 518, 529–533.
- Silver, D., et al. (2016). Mastering the game of Go with deep neural networks. Nature, 529, 484–489.
- Silver, D., et al. (2017). Mastering the game of Go without human knowledge. Nature, 550, 354–359.
- Sutton, R. S., & Barto, A. G. (2018). Reinforcement Learning. MIT Press.