১৯৭০ সালে কম্পিউটার ছিল এক বিশেষ অভিজাত শ্রেণীর নিয়ন্ত্রণে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাচের ঘরে লক্ষ লক্ষ ডলারের মেইনফ্রেম কম্পিউটার চলত সাদা অ্যাপ্রন পরা প্রকৌশলীদের মাধ্যমে। সাধারণ মানুষের সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না। কিন্তু উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ার একদল দূরদর্শী স্বপ্নদ্রষ্টা বিশ্বাস করতেন—কম্পিউটার কোনো কর্পোরেশন বা সেনাবাহিনীর একচ্ছত্র সম্পত্তি হতে পারে না; এটি হওয়া উচিত প্রতিটি লেখক, শিল্পী, শিশু এবং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার হাতিয়ার। ব্যক্তিগত কম্পিউটার, মাউস এবং গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস আবিষ্কারের মাধ্যমে তাঁরা মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।
১. ডগলাস এঙ্গেলবার্ট এবং “মাদার অব অল ডেমোজ” (১৯৬৮)
ইন্টারেক্টিভ কম্পিউটিংয়ের ঐতিহাসিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল ৯ ডিসেম্বর, ১৯৬৮ তারিখে সান ফ্রান্সিসকোতে। স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ড. ডগলাস এঙ্গেলবার্ট ১,০০০ প্রকৌশলীর সামনে ৯০ মিনিটের একটি সরাসরি উপস্থাপনা দেন, যা প্রযুক্তির ইতিহাসে “মাদার অব অল ডেমোজ (Mother of All Demos)” নামে অমর হয়ে আছে।
একটি বিশাল ২২-ফুটের পর্দায় এঙ্গেলবার্ট এমন সব প্রযুক্তি প্রদর্শন করলেন, যা তৎকালীন বিজ্ঞানীদের কাছে সায়েন্স ফিকশন বা অলৌকিক মনে হয়েছিল:
- কম্পিউটার মাউস (Mouse): কাঠের তৈরি একটি ছোট্ট বাক্সের নিচে দুটি চাকা বসিয়ে টেবিলের ওপর হাত নাড়িয়ে স্ক্রিনের কার্সর নিয়ন্ত্রণ।
- হাইপারটেক্সট ও উইন্ডো: ডকুমেন্টের ভেতরে নীল লিংকে ক্লিক করে নতুন ফাইলে যাওয়া এবং স্ক্রিনকে দুই ভাগে ভাগ করে একই সাথে কাজ করা।
- রিয়েল-টাইম ভিডিও কনফারেন্সিং: ৩০ মাইল দূরে মেনলো পার্কের সহকর্মীর সাথে একই ডকুমেন্টে একসাথে কাজ করা এবং স্ক্রিনের কোনায় সহকর্মীর ভিডিও ও স্বাধীন কার্সর প্রদর্শন!
এঙ্গেলবার্ট কম্পিউটারকে কেবল হিসাবযন্ত্র হিসেবে দেখেননি; তিনি একে দেখেছিলেন মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষমতা বৃদ্ধির এক মহাজাগতিক হাতিয়ার হিসেবে।
২. জেরক্স পার্ক (Xerox PARC): পালো অল্টোর স্বর্ণযুগ
১৯৭০ সালে ফটোকপিয়ার কোম্পানি জেরক্স নিজেদের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ক্যালিফোর্নিয়ায় গড়ে তোলে পালো অল্টো রিসার্চ সেন্টার (PARC)। পরিচালক বব টেলরের নেতৃত্বে সেখানে জড়ো হলেন বিশ্বের সর্বকালের সেরা কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা: অ্যালান কে, বাটলার ল্যাম্পসন, চার্লস সিমনি, বব মেটক্যাফ এবং গ্যারি স্টার্কওয়েদার।
জেরক্স আল্টো (Xerox Alto, ১৯৭৩): প্রথম আধুনিক ব্যক্তিগত কম্পিউটার
১৯৭৩ সালে বাটলার ল্যাম্পসন এবং চাক থ্যাকার তৈরি করেন জেরক্স আল্টো। এটি কোনো মেইনফ্রেমের সাথে যুক্ত টার্মিনাল ছিল না; এটি ছিল একজন মানুষের জন্য তৈরি সত্যিকারের ব্যক্তিগত কম্পিউটার:
- বিটম্যাপড ডিসপ্লে: পর্দার প্রতিটি পিক্সেল সরাসরি মেমোরির একটি নির্দিষ্ট বিট দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হতো। ফলে যেকোনো ফন্ট, ছবি এবং গ্রাফিক্স পর্দায় ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয় (*WYSIWYG* – যা দেখছেন তাই পাবেন)।
- গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস (GUI): অ্যালান কে এবং ড্যান ইনগালসের তৈরি উইন্ডো, মেনুবার, আইকন এবং স্ক্রলবার।
- স্মলটক (Smalltalk): বিশুদ্ধ অবজেক্ট-ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং ভাষা।
- ইথারনেট (Ethernet): বব মেটক্যাফের উদ্ভাবিত লোকাল নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা।
- লেজার প্রিন্টিং: গ্যারি স্টার্কওয়েদারের তৈরি প্রথম লেজার প্রিন্টার।
নিউ ইয়র্কের জেরক্সের কর্পোরেট কর্তারা বুঝতে পারেননি তাঁদের বিজ্ঞানীরা কী অবিশ্বাস্য জিনিস বানিয়েছেন; তারা আল্টোকে একটি অপ্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল খেলনা মনে করে ফেলে রেখেছিলেন!
৩. হোমব্রু কম্পিউটার ক্লাব এবং অ্যাপল টু (Apple II)
জেরক্সের অলসতার সুযোগে সিলিকন ভ্যালির গ্যারেজে শুরু হলো শৌখিন প্রযুক্তিপ্রেমীদের এক গণঅভ্যুত্থান। ১৯৭৫ সালে শুরু হলো বিখ্যাত হোমব্রু কম্পিউটার ক্লাব (Homebrew Computer Club)।
সেখানে উপস্থিত হতেন হিউলেট-প্যাকার্ডের তরুণ প্রকৌশলী স্টিভ ওজনিয়াক। মাত্র ২৫ ডলারের এমওএস ৬৫০২ প্রসেসর দিয়ে ওজনিয়াক রাতের পর রাত জেগে তৈরি করলেন ঘরের টিভির সাথে যুক্ত করার মতো কম্পিউটার। তাঁর বন্ধু স্টিভ জবস এই সার্কিট বোর্ড বিক্রির সিদ্ধান্ত নেন—জন্ম হলো অ্যাপল ওয়ান (Apple I)।
১৯৭৭ সালে তাঁরা উন্মোচন করেন অ্যাপল টু (Apple II)। সুন্দর প্লাস্টিকের ক্যাবিনেট, রঙিন গ্রাফিক্স, সাউন্ড এবং ড্যান ব্রিকলিনের তৈরি প্রথম স্প্রেডশিট ভিসিক্যালক (VisiCalc)-এর কারণে অ্যাপল টু বিশ্বজুড়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ পরিবারের ঘরে ঘরে প্রবেশ করতে শুরু করে।
৪. ১৯৮৪: ম্যাকিনটোশ এবং জনতার মুক্তি
১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে স্টিভ জবস জেরক্স পার্ক পরিদর্শন করেন। সেখানে আল্টোর বিটম্যাপড স্ক্রিনে মাউস দিয়ে উইন্ডো নাড়াচাড়া করতে দেখে জবস বিদ্যুতাহত হয়ে পড়েন। তিনি উপলব্ধি করলেন—ভবিষ্যতে পৃথিবীর প্রতিটি কম্পিউটার ঠিক এভাবেই চলবে!
জবস অ্যাপলে ফিরে এসে তৈরি করলেন ঐতিহাসিক ম্যাকিনটোশ (Macintosh) দল। বিল অ্যাটকিনসন, অ্যান্ডি হার্টজফেল্ড এবং সুসান কেয়ারের মতো প্রতিভারা জেরক্সের গবেষণাকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজবোধ্য রূপ দিলেন—তৈরি হলো ট্র্যাশ ক্যান আইকন, মেনুবার এবং সহজে ক্লিক করার পরিবেশ।
১৯৮৪ সালের ২৪ জানুয়ারি স্টিভ জবস একটি ব্যাগ থেকে ম্যাকিনটোশ বের করলেন। কম্পিউটারটি নিজ কণ্ঠে কথা বলে নিজের পরিচয় দিল এবং স্ক্রিনে গ্রাফিক্স এঁকে দেখাল। কমান্ড লাইনের কালো পর্দার দিন শেষ হলো; কম্পিউটিং হয়ে উঠল জীবন্ত, ভিজ্যুয়াল এবং ব্যক্তিগত।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- Engelbart, D. C. (1968). A research center for augmenting human intellect. AFIPS FJCC, 33, 395–410.
- Kay, A., & Goldberg, A. (1977). Personal Dynamic Media. Computer, 10(3), 31–41.
- Thacker, C. P., et al. (1982). Alto: A personal computer. In Computer Structures, McGraw-Hill.
- Hiltzik, M. A. (1999). Dealers of Lightning: Xerox PARC. HarperBusiness.