১৯৯০-এর দশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক গভীর দার্শনিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেল। হাত দিয়ে লেখা নিয়মভিত্তিক এক্সপার্ট সিস্টেম বাস্তব জগতের অনিশ্চয়তার মুখে ভেঙে পড়ার পর বিজ্ঞানীরা অনুধাবন করলেন: বুদ্ধিমত্তা কোনো নিখুঁত নিয়ম দিয়ে তৈরি করা সম্ভব নয়; একে গড়ে তুলতে হবে সম্ভাবনা, পরিসংখ্যান এবং বহু-মাত্রিক রৈখিক বীজগণিতের সাহায্যে। ১৯৯৭ সালের ১১ মে নিউ ইয়র্কের এক টেলিভিশন স্টুডিওতে মানুষের মেধা ও সিলিকন কম্পিউটারের এই ঐতিহাসিক দ্বৈরথ এক চরম শিখরে পৌঁছাল—যখন বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভ একটি কম্পিউটারের সামনে মাত্র ১৯ চালে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলেন।
১. পরিসংখ্যানগত মোড়: অনিশ্চয়তাকে আলিঙ্গন
চার দশক ধরে এআই গবেষকরা অনিশ্চয়তাকে একটি ত্রুটি হিসেবে বিবেচনা করতেন। কিন্তু ১৯৮৮ সালে ইউসিএলএ-র কম্পিউটার বিজ্ঞানী জুডিয়া পার্ল তাঁর যুগান্তকারী গ্রন্থ প্রবাবিলিস্টিক রিজনিং ইন ইন্টেলিজেন্ট সিস্টেমস-এ দেখালেন যে অনিশ্চয়তা বাস্তব জগতের এক চিরন্তন ধর্ম।
পার্ল উদ্ভাবন করেন বায়েসিয়ান নেটওয়ার্ক (Bayesian Networks): একটি ডিরেক্টেড অ্যাসাইক্লিক গ্রাফ, যা বিভিন্ন ঘটনার মধ্যকার শর্তসাপেক্ষ সম্ভাবনাকে (Conditional Probability) বায়েসের সূত্রের সাহায্যে যুক্ত করে:
$$P(X_1, X_2, \dots, X_n) = \prod_{i=1}^{n} P(X_i \mid \text{Parents}(X_i))$$এর ফলে অসম্পূর্ণ ও কোলাহলপূর্ণ তথ্যের মধ্যেও কম্পিউটার যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা লাভ করল—যা আধুনিক সার্চ ইঞ্জিন, চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং স্পিচ রিকগনিশনের ভিত্তি রচনা করে।
২. ভ্লাদিমির ভ্যাপনিক এবং সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন (SVM)
১৯৯০-এর দশকে বেল ল্যাবসের গণিতবিদ ভ্লাদিমির ভ্যাপনিক এবং কোরিনা কর্টেস উদ্ভাবন করেন সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন (SVM)।
যেকোনো সাধারণ রেখা টানার বদলে এসভিএম এমন একটি বিভাজন তল বা ম্যাক্সিমাম-মার্জিন হাইপারপ্লেন খুঁজে বের করে—যা উভয় ক্লাসের নিকটতম ডেটা পয়েন্টগুলোর (সাপোর্ট ভেক্টর) থেকে সর্বোচ্চ জ্যামিতিক দূরত্ব বজায় রাখে ($M = \frac{২}{\|\mathbf{w}\|}$):
$$\min_{\mathbf{w}, b} \frac{1}{2} \|\mathbf{w}\|^2 \quad \text{subject to } y_i (\mathbf{w}^T \mathbf{x}_i + b) \ge 1$$কার্নেল ট্রিক: অসীম মাত্রার জাদু
কিন্তু ডেটা যদি বাঁকা বা নন-লিনিয়ার হয়? ভ্যাপনিক এর এক অবিস্মরণীয় সমাধান দিলেন, যার নাম কার্নেল ট্রিক (Kernel Trick)। মার্সারের উপপাদ্য ব্যবহার করে ডেটাকে সরাসরি উচ্চ মাত্রায় রূপান্তর না করেই একটি কার্নেল ফাংশনের মাধ্যমে হিসাব করা সম্ভব:
$$K(\mathbf{x}, \mathbf{x}’) = \exp\left( -\gamma \|\mathbf{x} – \mathbf{x}’\|^2 \right)$$এর ফলে ডেটাটি গাণিতিকভাবে একটি অসীম-মাত্রিক হিলবার্ট স্পেসে উন্নীত হয়—যেখানে খুব সহজেই একটি সরল রৈখিক তলের সাহায্যে জটিল প্যাটার্নকে নিখুঁতভাবে আলাদা করা যায়! উত্তল গাণিতিক কাঠামো এবং নিখুঁত ফলাফলের কারণে নব্বইয়ের দশকের শেষে এসভিএম নিউরাল নেটওয়ার্ককে পুরোপুরি পেছনে ফেলে মেশিন লার্নিংয়ের রাজত্ব দখল করে নেয়।
৩. এনসেম্বল লার্নিং এবং র্যান্ডম ফরেস্ট (Random Forest)
একই সময়ে ইউসি বার্কলের পরিসংখ্যানবিদ লিও ব্রেইম্যান উদ্ভাবন করেন র্যান্ডম ফরেস্ট (Random Forests)। একটিমাত্র সিদ্ধান্ত বৃক্ষ (Decision Tree) প্রায়ই অতিরিক্ত ভ্যারিয়েন্সের কারণে ভুল করে। ব্রেইম্যান শত শত সিদ্ধান্ত বৃক্ষকে দুটি স্তরের দৈবচয়নের (Randomness) মাধ্যমে যুক্ত করেন:
- বুটস্ট্র্যাপ স্যাম্পলিং (Bagging): প্রতিটি গাছ মূল ডেটাসেট থেকে এলোমেলোভাবে বাছাই করা স্বাধীন নমুনার ওপর শেখে।
- র্যান্ডম ফিচার সিলেকশন: প্রতিটি শাখায় সেরা বিভাজন খোঁজার সময় সব ফিচারের বদলে দৈবভাবে মাত্র কয়েকটি ফিচার বিবেচনা করা হয়।
শত শত গাছের সম্মিলিত ভোটের মাধ্যমে একটি অসাধারণ স্থিতিশীল ও শক্তিশালী মডেল তৈরি হলো, যা আজকের ব্যাংকিং ও ডেটা সায়েন্স প্রতিযোগিতায় বহুল ব্যবহৃত হয়।
৪. ডিপ ব্লু বনাম গ্যারি কাসপারভ: মে ১৯৯৭
পরিসংখ্যানগত গণিত যখন প্যাটার্ন চিনছিল, তখন দাবা খেলায় মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের শেষ সীমানা ভাঙার প্রস্তুতি নিচ্ছিল আইবিএমের তৈরি এক দানবীয় যন্ত্র: ডিপ ব্লু (Deep Blue)।
১৯৯৭ সালের মে মাসে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাসপারভ বসলেন ডিপ ব্লুর মুখোমুখি।
ডিপ ব্লুর যান্ত্রিক স্থাপত্য
- সুপারকম্পিউটার ক্ষমতা: ৩২-নোডের আইবিএম আরএস/৬০০০ এসপি সুপারকম্পিউটারে ছিল ৪৮০টি বিশেষায়িত দাবা ভিএলএসআই (VLSI) চিপ।
- বিশাল গতি: সেকেন্ডে ২০ কোটি (২০০ মিলিয়ন) চালের অবস্থান বিশ্লেষণ করতে পারত (যেখানে মানুষের মস্তিষ্ক সেকেন্ডে গড়ে মাত্র ২ থেকে ৩টি অবস্থান দেখতে পায়)।
- গভীরতা: আলফা-বিটা মিনিম্যাক্স সার্চের মাধ্যমে এটি সাধারণ খেলায় ১৪ অর্ধ-চাল (Ply) এবং জটিল ট্যাকটিক্যাল অবস্থায় ৪০ অর্ধ-চাল পর্যন্ত ভবিষ্যৎ দেখতে পেত। সাথে ছিল ৭ লাখ গ্র্যান্ডমাস্টার চালের বিশাল ওপেনিং ডেটাবেস।
১১ মে, ১৯৯৭: ঐতিহাসিক ষষ্ঠ গেম
পাঁচটি গেম শেষে ফলাফল ছিল ২.৫-২.৫ সমতায়। ষষ্ঠ ও চূড়ান্ত গেমে কাসপারভ খেললেন ক্যারো-কান ডিফেন্স। কিন্তু মাত্র ৮ম চালে ডিপ ব্লু এক অবিশ্বাস্য আগ্রাসী নাইট স্যাক্রিফাইস ($৮. \text{Nxe৬}!$) করে কাসপারভের প্রতিরক্ষাকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। হতচকিত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত কাসপারভ ভুল চাল দিয়ে বসেন এবং মাত্র ১৯ চালে পরাজয় স্বীকার করে বোর্ড ছেড়ে উঠে যান—যা ছিল তাঁর পুরো ক্যারিয়ারের সংক্ষিপ্ততম পরাজয়।
ডিপ ব্লুর কোনো মানবিক চেতনা বা অনুভূতি ছিল না; এটি ছিল কেবল সিলিকন চিপের এক অন্ধ দ্রুতগতির গণকযন্ত্র। কিন্তু মানুষের মেধার সর্বোচ্চ কৌশলগত খেলায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকে পরাজিত করে এটি দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করেছিল যে বুদ্ধিমত্তার যেকোনো নির্দিষ্ট জটিল ক্ষেত্রে কম্পিউটার মানব মেধার সমকক্ষ এবং তার চেয়েও বহু গুণ শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- Pearl, J. (1988). Probabilistic Reasoning in Intelligent Systems. Morgan Kaufmann.
- Cortes, C., & Vapnik, V. (1995). Support-vector networks. Machine Learning, 20(3), 273–297.
- Breiman, L. (2001). Random Forests. Machine Learning, 45(1), 5–32.
- Campbell, M., et al. (2002). Deep Blue. Artificial Intelligence, 134(1-2), 57–83.