বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি এসে ইলেকট্রনিক কম্পিউটার এক দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীরের মুখোমুখি হলো। ১ লাখ ভ্যাকুয়াম টিউবের একটি কম্পিউটার বানাতে গেলে যে পরিমাণ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ও উত্তাপ তৈরি হতো, তাতে অপারেটররা পুড়ে যাওয়া টিউব বদলাতে বদলাতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ত। কম্পিউটিংয়ের এই মহাত্রাণ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে আসেনি; এটি এসেছিল সলিড-স্টেট কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞান থেকে: সিলিকন ক্রিস্টালের পরমাণুর ভেতর ইলেকট্রনের আচরণকে বশ মানানোর মাধ্যমে।
১. সংখ্যার অত্যাচার এবং বেল ল্যাবসের মহাবিস্ময়
১৯৪৫ সালে টেলিফোন এক্সচেঞ্জ এবং প্রাথমিক কম্পিউটারগুলো এক চরম সংকটের মুখে পড়েছিল, যাকে বেল ল্যাবসের প্রকৌশলীরা বলতেন “টাইরানি অব নাম্বারস (Tyranny of Numbers)”: যন্ত্র যতো বড় হতো, যন্ত্রের তার ও উপাদানের সংখ্যা ততো বাড়ত, আর কোনো না কোনো অংশ নষ্ট হয়ে পুরো সিস্টেম ভেঙে পড়ার সম্ভাবনাও গুণোত্তর হারে বেড়ে যেত।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য বেল ল্যাবসে গড়ে তোলা হয় একটি যুগান্তকারী দল: তাত্ত্বিক পদার্থবিদ জন বার্ডিন, পরীক্ষামূলক পদার্থবিদ ওয়াল্টার ব্র্যাটেন এবং দলনেতা উইলিয়াম শকলি।
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৪৭: পয়েন্ট-কনট্যাক্ট ট্রানজিস্টর
১৯৪৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ওয়াল্টার ব্র্যাটেন একটি প্লাস্টিকের ত্রিকোণ খণ্ডের মাথায় খুব সূক্ষ্ম সোনার পাত মুড়ে দেন এবং ব্লেড দিয়ে ঠিক শীর্ষে একটি চির ধরান, যার ফলে সোনার পাতটি মাত্র ৫০ মাইক্রোমিটার ব্যবধানে দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে যায়।
এই প্লাস্টিকের অগ্রভাগকে একটি জার্মেনিয়াম ক্রিস্টাল খণ্ডের ওপর শক্ত করে চেপে বসানো হয়। একটি পাতকে বলা হয় ইমিটার (Emitter) এবং অপরটিকে কালেক্টর (Collector)। যখন ইমিটারে সামান্য বিদ্যুৎ প্রবাহ পাঠানো হলো, তখন জার্মেনিয়াম ক্রিস্টালের ভেতর হোল বা পজিটিভ চার্জের বন্যা বয়ে গেল—যা কালেক্টরে বহুগুণ শক্তিশালী বিদ্যুৎ প্রবাহকে এক নিমেষে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল!
জন্ম হলো মানব ইতিহাসের প্রথম ট্রানজিস্টর (Transistor)। কোনো ভ্যাকুয়াম নেই, উত্তপ্ত ফিলামেন্ট নেই, কোনো কাচের টিউব নেই—একটি খাঁটি কঠিন ক্রিস্টালের ভেতর দিয়ে ইলেকট্রনের প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হতে লাগল। এই অমর আবিষ্কারের জন্য ১৯৫৬ সালে বার্ডিন, ব্র্যাটেন এবং শকলিকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
২. শকলি ল্যাব এবং ‘বিশ্বাসঘাতক আটজন’ (Traitorous Eight)
ট্রানজিস্টরের বাণিজ্যিক উৎপাদনের লক্ষ্যে উইলিয়াম শকলি ক্যালিফোর্নিয়ার পালো অল্টোতে প্রতিষ্ঠা করেন শকলি সেমিকন্ডাক্টর। কিন্তু শকলি ছিলেন চরম অহংকারী ও স্বেচ্ছাচারী পরিচালক।
১৯৫৭ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁর অধীনে থাকা আটজন প্রতিভাবান তরুণ বিজ্ঞানী—রবার্ট নয়েস, গর্ডন মুর, জুলিয়াস ব্ল্যাঙ্ক, ভিক্টর গ্রিনিচ, জিন হোয়ার্নি, ইউজিন ক্লাইনার, জে লাস্ট এবং শেল্ডন রবার্টস—একযোগে পদত্যাগ করেন। শকলি এদের নাম দিয়েছিলেন “ট্রেইটরাস এইট” বা ‘বিশ্বাসঘাতক আটজন’।
শিল্পপতি শেরম্যান ফেয়ারচাইল্ডের আর্থিক সহায়তায় এই আটজন প্রতিষ্ঠা করেন ফেয়ারচাইল্ড সেমিকন্ডাক্টর (Fairchild Semiconductor)। এই তরুণদের হাত ধরেই সৃষ্টি হয় ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সংস্কৃতি এবং জন্ম নেয় পৃথিবীর প্রযুক্তি রাজধানী সিলিকন ভ্যালি (Silicon Valley)।
৩. ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (IC): কিলবি এবং নয়েস
আলাদা আলাদা ট্রানজিস্টর তৈরি করলেও সেগুলোকে তার দিয়ে সার্কিট বোর্ডে ঝালাই করার ঝামেলা তখনো শেষ হয়নি। এই সমস্যার সমাধান করেন দুজন মহান উদ্ভাবক:
- জ্যাক কিলবি (টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টস, ১৯৫৮): ল্যাবরেটরির গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময় কিলবি একটিমাত্র জার্মেনিয়াম খণ্ডের ওপর ট্রানজিস্টর, রেজিস্টার এবং ক্যাপাসিটর বসিয়ে তারের সাহায্যে যুক্ত করেন—বিশ্বের প্রথম কাজ করা ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট বা মাইক্রোচিপ।
- রবার্ট নয়েস (ফেয়ারচাইল্ড, ১৯৫৯): জিন হোয়ার্নির প্ল্যানার প্রসেস ব্যবহার করে নয়েস সিলিকনের মসৃণ স্তরের ওপর রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় ফটোগ্রাফির মতো অ্যালুমিনিয়ামের সংযোগ খোদাই করে তৈরি করেন সম্পূর্ণ মনোলিথিক ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট। কোনো হাতের ঝালাই ছাড়া লক্ষ লক্ষ সার্কিট একসাথে মুদ্রণের পথ উন্মুক্ত হলো।
৪. মুরের সূত্র (Moore’s Law): আধুনিক সভ্যতার গতিসূত্র
১৯৬৫ সালের এপ্রিলে ইলেকট্রনিক্স ম্যাগাজিনের জন্য ফেয়ারচাইল্ডের গবেষণা পরিচালক গর্ডন মুর লেখেন এক সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ। বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে মুর লক্ষ্য করেন যে একটি সিলিকন চিপে সর্বনিম্ন খরচে যে পরিমাণ ট্রানজিস্টর বসানো যায়, প্রতি বছর সেই সংখ্যা দ্বিগুণ হচ্ছে।
১৯৭৫ সালে মুর এই সময়সীমা সংশোধন করে বলেন—প্রতি দুই বছরে চিপের ট্রানজিস্টর সংখ্যা দ্বিগুণ হবে:
$$N(t) = N_0 \cdot 2^{\frac{t – t_0}{2}}$$মুরের সূত্র কোনো প্রাকৃতিক নিয়ম ছিল না; এটি ছিল বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের এক অলিখিত শপথ। বিগত চার দশক ধরে কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ এবং চরম অতিবেগুনি রশ্মির (EUV Lithography) সাহায্যে এই সূচকীয় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা হয়েছে—যার ফলে ঘরের সমান দানবাকৃতির কম্পিউটার আজকের প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠোয় স্মার্টফোন হয়ে প্রবেশ করেছে।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- Bardeen, J., & Brattain, W. H. (1948). The Transistor, A Semi-Conductor Triode. Physical Review, 74(2), 230–231.
- Kilby, J. S. (1976). Invention of the integrated circuit. IEEE Transactions on Electron Devices, 23(7), 648–654.
- Noyce, R. N. (1961). Semiconductor device-and-lead structure. US Patent 2,981,877.
- Moore, G. E. (1965). Cramming more components onto integrated circuits. Electronics, 38(8), 114–117.