“যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?”—১৯৫০ সালে এই অমর প্রশ্নটি তুলেছিলেন অ্যালান টুরিং। ঠিক ছয় বছর পর, ১৯৫৬ সালের আর্দ্র গ্রীষ্মে ডার্টমাউথ কলেজে সমবেত হলেন একদল তরুণ গণিতবিদ, মনোবিজ্ঞানী এবং কম্পিউটার বিজ্ঞানী। তাঁদের প্রস্তাব ছিল অবিশ্বাস্যরকম সাহসী: মানুষের বুদ্ধি ও শেখার প্রতিটি ক্ষেত্রকে এতো নিখুঁতভাবে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব, যাতে একটি কম্পিউটার দিয়ে হুবহু তার অনুকরণ করা যায়। ঠিক সেই মুহূর্তে রূপকথা ও কল্পবিজ্ঞান থেকে বের হয়ে বিজ্ঞান হিসেবে জন্ম নিল ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’।

১. অ্যালান টুরিংয়ের ভবিষ্যৎবাণী: দ্য ইমিটেশন গেম

১৯৫০ সালের অক্টোবরে দর্শন সাময়িকী মাইন্ড (Mind)-এ অ্যালান টুরিং প্রকাশ করেন তাঁর সাড়া জাগানো গবেষণাপত্র: কম্পিউটিং মেশিনারি অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স। “যন্ত্র কি চিন্তা করতে পারে?”—এই প্রশ্নের দার্শনিক বিতর্ক এড়াতে তিনি উদ্ভাবন করেন এক ব্যবহারিক পরীক্ষা: ইমিটেশন গেম (Imitation Game / Turing Test)।

এই পরীক্ষায় একজন বিচারক একটি বন্ধ ঘরে বসে কীবোর্ডের মাধ্যমে পাশের ঘরের দুজন সত্তার সাথে টেক্সট চ্যাট করবেন—যার একজন মানুষ এবং অপরজন একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম। যদি পাঁচ মিনিট কথোপকথনের পর বিচারক নিশ্চিতভাবে বলতে না পারেন কোনটি মানুষ আর কোনটি কম্পিউটার, তবে ধরে নেওয়া হবে যন্ত্রটি মানুষের বুদ্ধিমত্তার সমকক্ষ আচরণ করতে সক্ষম হয়েছে।

২. ডার্টমাউথ ১৯৫৬: এআইয়ের আনুষ্ঠানিক নামকরণ

১৯৫৫ সালের আগস্টে ডার্টমাউথ কলেজের তরুণ গণিতের সহকারী অধ্যাপক জন ম্যাকার্থি, হার্ভার্ডের মারভিন মিনস্কি, আইবিএমের নাথানিয়েল রচেস্টার এবং বেল ল্যাবসের ক্লড শ্যানন রকফেলার ফাউন্ডেশনের কাছে ৭,৫০০ ডলারের আর্থিক অনুদানের একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাঠান।

নরবার্ট উইনারের প্রচলিত ‘সাইবারনেটিক্স’ শব্দটির জটিলতা এড়িয়ে ম্যাকার্থি নতুন একটি সাহসী নামের প্রস্তাব করলেন: “আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial Intelligence)” বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।

১৯৫৬ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসব্যাপী চলা এই ঐতিহাসিক ওয়ার্কশপে অংশ নেন অ্যালেন নেভেল এবং হার্বার্ট সাইমন। তাঁরা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন ইতিহাসের প্রথম সচল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রোগ্রাম: লজিক থিওরিস্ট (Logic Theorist)।

৩. লজিক থিওরিস্ট এবং সাধারণ সমস্যা সমাধানকারী (GPS)

র‍্যান্ড করপোরেশনের জোহনিয়াক (JOHNNIAC) কম্পিউটারে চালানো লজিক থিওরিস্ট সাধারণ ক্যালকুলেটরের মতো সংখ্যার যোগ-বিয়োগ করত না; এটি মানুষের মতো হিউরিস্টিক প্রতীকী যুক্তি (Symbolic Manipulation) প্রয়োগ করত।

বার্ট্রান্ড রাসেল এবং হোয়াইটহেডের অমর গ্রন্থ প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা-র দ্বিতীয় অধ্যায়ের জটিল উপপাদ্যগুলো প্রমাণ করার দায়িত্ব দেওয়া হয় এই প্রোগ্রামকে। লজিক থিওরিস্ট ৫২টি উপপাদ্যের মধ্যে ৩৮টি নিখুঁতভাবে প্রমাণ করে দেখায়! সবচেয়ে অবিশ্বাস্য বিষয় হলো—উপপাদ্য ২.৮৫ প্রমাণের ক্ষেত্রে স্বয়ং রাসেল ও হোয়াইটহেড যে দীর্ঘ প্রমাণ লিখেছিলেন, লজিক থিওরিস্ট তার চেয়ে অনেক সংক্ষিপ্ত ও চমৎকার এক বিকল্প প্রমাণ খুঁজে বের করে!

নেভেল ও সাইমন প্রতিষ্ঠা করেন ফিজিক্যাল সিম্বল সিস্টেম হাইপোথিসিস: উপযুক্ত প্রতীকী ব্যবস্থার সাহায্যে একটি যন্ত্র মানুষের যেকোনো যৌক্তিক চিন্তাভাবনা সম্পাদন করতে পারে। বুদ্ধিমান আচরণ হলো আসলে একটি বিশাল সম্ভাব্য বিকল্পের গ্রাফের ভেতর দিয়ে সঠিক পথটি খুঁজে নেওয়ার হিউরিস্টিক সার্চ:

$$f(n) = g(n) + h(n)$$

৪. রোবট শেকী: বাস্তব জগতে বুদ্ধিমান যন্ত্রের পদচারণা

১৯৬৬ থেকে ১৯৭২ সালের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটে (SRI) বিজ্ঞানীরা তৈরি করেন বিশ্বের প্রথম বুদ্ধিমান মোবাইল রোবট: শেকী (Shakey the Robot)। চলার সময় এর লম্বা অ্যান্টেনা ও ক্যামেরার রড থরথর করে কাঁপত বলে এর নাম দেওয়া হয়েছিল শেকী।

শেকীর মাথায় ছিল একটি টিভি ক্যামেরা, অপটিক্যাল রেঞ্জ ফাইন্ডার এবং স্পর্শকাতর ক্যাট-হুইস্কার সেন্সর। একটি রেডিও লিংকের মাধ্যমে এটি ঘরের সমান বড় একটি এসডিএস ৯৪০ কম্পিউটারের সাথে যুক্ত ছিল। শেকীর প্রোগ্রামিং করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা তিনটি অমর অ্যালগরিদম উদ্ভাবন করেন, যা আজও রোবটিক্স ও এআইয়ের মূল ভিত্তি:

  • এ-স্টার ($A^*$) সার্চ অ্যালগরিদম: যেকোনো বাধা এড়িয়ে最短 এবং সবচেয়ে নিরাপদ পথ খুঁজে বের করার গাণিতিক অ্যালগরিদম, যা আজকের গুগল ম্যাপস থেকে শুরু করে ভিডিও গেমে ব্যবহৃত হয়।
  • স্ট্রিপস (STRIPS) প্ল্যানার: কোনো লক্ষ্য পূরণ করতে হলে ধাপে ধাপে কী কী পূর্বশর্ত ও অ্যাকশন নিতে হবে, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাজানোর লজিক ইঞ্জিন।
  • হাফ ট্রান্সফর্ম (Hough Transform): ক্যামেরার ঝাপসা পিক্সেল থেকে সোজা দেয়াল বা বস্তুর সীমানা চিনে নেওয়ার কম্পিউটার ভিশন কৌশল।

যখন শেকীকে সাধারণ ইংরেজি ভাষায় নির্দেশ দেওয়া হতো: “লাল বাক্সটিকে ধাক্কা দিয়ে প্ল্যাটফর্ম থেকে নিচে ফেলো”—শেকী কোনো পূর্বনির্ধারিত ছক মেনে চলত না। সে ক্যামেরায় দেখে পরিবেশের মানচিত্র বানাত, এ-স্টার অ্যালগরিদম দিয়ে পথ বের করত এবং নিজের যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বাক্সটিকে ঠেলে দিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রথম বাস্তব জগতের স্পর্শ লাভ করল।


প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • Turing, A. M. (1950). Computing Machinery and Intelligence. Mind, 59(236), 433–460.
  • McCarthy, J., et al. (1955). A Proposal for the Dartmouth Summer Research Project on Artificial Intelligence.
  • Newell, A., & Simon, H. A. (1956). The logic theory machine. IRE Transactions on Information Theory, 2(3), 61–79.
  • Nilsson, N. J. (1984). Shakey the Robot. SRI International.