মহাজাগতিক বস্তুসমূহের ওপর পদার্থের মহাকর্ষীয় পতন বা অ্যাক্রিশন (Accretion) হলো মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ও দক্ষ শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থা। এটি পতিত পদার্থের মোট ভরের প্রায় ৪২% পর্যন্ত বিশুদ্ধ শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে—যা থার্মোনিউক্লিয়ার ফিউশনের দক্ষতার (০.৭%) চেয়ে বহু গুণ বেশি। কিন্তু গ্যাসীয় চাকতি থেকে কৌণিক ভরবেগ কীভাবে স্থানান্তরিত হয়ে পদার্থ ব্ল্যাক হোলে প্রবেশ করে, তা দীর্ঘকাল এক রহস্য ছিল। ১৯৯১ সালে ম্যাগনেটো-রোটেশনাল অস্থিরতা (MRI) আবিষ্কারের মাধ্যমে এই রহস্যের সমাধান হয়, যা একই সাথে আল্ট্রা-রিলেটিভিস্টিক প্লাজমা জেটের জন্মপ্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে।

১. শকুরা-সুনিয়ায়েভ আলফা অ্যাক্রিশন মডেল

১৯৭৩ সালে নিকোলাই শকুরা ও রাশিদ সুনিয়ায়েভ জ্যামিতিকভাবে পাতলা ($H/R ll 1$) এবং অপটিক্যালি ঘন অ্যাক্রিশন ডিস্কের মডেল প্রস্তাব করেন। কেপলারীয় গতিতে থাকা গ্যাসের ক্ষেত্রে ব্যাসার্ধ বাড়ার সাথে সাথে সুনির্দিষ্ট কৌণিক ভরবেগ বাড়তে থাকে ($d(R^2Omega)/dR > 0$)। গ্যাসকে ভেতরের দিকে নামতে হলে সান্দ্রতার মাধ্যমে কৌণিক ভরবেগকে বাইরে ঠেলে দিতে হয়:

T_{Rphi} = nu rho R frac{dOmega}{dR} = -frac{3}{2} nu rho Omega

যেহেতু সাধারণ আণবিক সান্দ্রতা অত্যন্ত নগণ্য, শকুরা ও সুনিয়ায়েভ টার্বুলেন্ট বা বিক্ষুব্ধ প্রবাহের জন্য একটি মাত্রাহীন প্যারামিটার $alpha$ সংজ্ঞায়িত করেন:

nu = alpha c_s H

যেখানে $c_s$ হলো শব্দের বেগ এবং $H$ হলো চাকতির পুরুত্ব বা স্কেল হাইট।

২. বিকিরণ দক্ষতা ও স্থিতিশীল কক্ষপথের শেষ সীমা (ISCO)

গ্যাস ভেতরের দিকে সর্পিলাকারে নামতে নামতে পৌঁছায় ইনারমোস্ট স্টেবল সার্কুলার অরবিট (ISCO)-তে। এই ব্যাসার্ধের ভেতরে কোনো স্থিতিশীল কক্ষপথ সম্ভব নয় এবং গ্যাস সোজা ব্ল্যাক হোলে পতিত হয়। ব্ল্যাক হোলের ঘূর্ণনের ওপর ভিত্তি করে শক্তি রূপান্তরের দক্ষতা $eta$ নির্ধারিত হয়:

  • অ-ঘূর্ণায়মান সোয়ার্জশিল্ড ব্ল্যাক হোলে ($a_* = 0$): $R_{text{ISCO}} = 6GM/c^2 = 3 r_s$, রূপান্তর দক্ষতা প্রায় ৫.৭২%।
  • চরম ঘূর্ণায়মান কার ব্ল্যাক হোলে ($a_* = 1$): $R_{text{ISCO}} = GM/c^2 = r_+$, রূপান্তর দক্ষতা অভূতপূর্ব ৪২.৩% পর্যন্ত পৌঁছায়।

৩. ম্যাগনেটো-রোটেশনাল অস্থিরতা (MRI)

র‍্যালের স্থিতিশীলতা নীতি অনুসারে যেকোনো অ-চৌম্বকীয় ঘূর্ণায়মান প্রবাহ স্থিতিশীল থাকে। কিন্তু ১৯৯১ সালে স্টিভেন ব্যালবাস ও জন হলি আবিষ্কার করেন যে সামান্য দুর্বল চৌম্বক ক্ষেত্রের উপস্থিতিও প্রবাহকে চরম অস্থির করে তোলে। চৌম্বক বলরেখা দুটি সন্নিহিত গ্যাসকণার মাঝে একটি স্থিতিস্থাপক স্প্রিং-এর মতো কাজ করে:

  1. ভেতরের কণাটি দ্রুত ঘোরে এবং স্প্রিং-এর টানে পেছনের দিকে বাধা পেয়ে তার কৌণিক ভরবেগ হারায়। ফলে এটি দ্রুত ব্ল্যাক হোলের দিকে ধাবিত হয়।
  2. বাইরের কণাটি স্প্রিং-এর টানে অতিরিক্ত কৌণিক ভরবেগ অর্জন করে আরও বাইরের দিকে ছিটকে যায়।

এই প্রক্রিয়াটি এক প্রচণ্ড টার্বুলেন্স সৃষ্টি করে, যা শকুরা-সুনিয়ায়েভ সান্দ্রতার প্রকৃত ভৌত ভিত্তি প্রদান করে।

৪. আপেক্ষিক জেট নির্গমন: ব্ল্যান্ডফোর্ড-জন্যায়েক মেকানিজম

রেডিও-লাউড সক্রিয় গ্যালাক্সিক নিউক্লিয়াস থেকে আলোর গতির ৯৯% বেগে ছুটে চলা প্লাজমা জেট নির্গত হয়। ১৯৭৭ সালে রজার ব্ল্যান্ডফোর্ড ও রোমান জন্যায়েক প্রমাণ করেন যে একটি ঘূর্ণায়মান কার ব্ল্যাক হোল চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে একটি মহাজাগতিক ডায়নামোর মতো কাজ করে। স্থান-কালের নিজস্ব ঘূর্ণন চৌম্বক ক্ষেত্ররেখাগুলোকে পেঁচিয়ে এক তীব্র পয়েন্টিং ফ্লাক্স (Poynting Flux) তৈরি করে, যা ব্ল্যাক হোলের ঘূর্ণন শক্তিকে সরাসরি আল্ট্রা-রিলেটিভিস্টিক কণার জেটে রূপান্তর করে গ্যালাক্সির বাইরে নিক্ষেপ করে।