২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক দিন। মানবজাতি প্রথমবারের মতো একই মহাজাগতিক বিস্ফোরণ থেকে একই সাথে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং আলোকতরঙ্গ সনাক্ত করতে সক্ষম হয়: GW170817। দুটি নিউট্রন তারার মহাজাগতিক সংঘর্ষের ঠিক ১.৭ সেকেন্ড পর মহাকাশে জ্বলে ওঠে শর্ট গামা-রে বিস্ফোরণ এবং কয়েক ঘণ্টা পর টেলিস্কোপে ধরা পড়ে এক তেজস্ক্রিয় আলোকচ্ছটা: কিলোনোভা (Kilonova AT 2017gfo)। এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে মহাবিশ্বের সমস্ত ভারী মৌল—বিশেষ করে সোনা, প্ল্যাটিনাম ও ইউরেনিয়াম—তৈরি হয়েছে নিউট্রন তারার এই প্রলয়ঙ্করী পারমাণবিক অগ্নিকুণ্ডে।
১. মাল্টি-মেসেঞ্জার আবিষ্কারের ঐতিহাসিক তাৎপর্য
ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ থেকে কোনো আলো বের না হলেও নিউট্রন তারা পদার্থে পরিপূর্ণ। ১৩ কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এবং গামা রশ্মি পৃথিবীতে পৌঁছানোর সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ১.৭ সেকেন্ড। এই অতি-ক্ষুদ্র সময়ের ব্যবধান প্রমাণ করে যে মহাকর্ষের গতিবেগ এবং আলোর গতিবেগের পার্থক্য $১০^{-১৫}$ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম:
frac{|c_{text{GW}} – c|}{c} le ১০^{-১৫}
এটি মুহূর্তের মধ্যে পদার্থবিজ্ঞানের বহু পরিবর্তিত মহাকর্ষীয় তত্ত্বকে বাতিল করে দিয়ে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাকে বিজয়ী ঘোষণা করে। একই সাথে গ্র্যাভিটেশনাল-ওয়েভ স্ট্যান্ডার্ড সাইরেন পদ্ধতির মাধ্যমে হাবল ধ্রুবকের এক সম্পূর্ণ স্বাধীন মান ($H_0 approx ৭০text{ কিমি/সে/মেগাপারসেক}$) নির্ণয় করা সম্ভব হয়।
২. নিউক্লিয়ার পদার্থের বিচ্ছুরণ ও r-প্রসেস নিউক্লিওসিন্থেসিস
সাধারণ নক্ষত্রের অভ্যন্তরে ফিউশন বিক্রিয়ায় লোহার ($^{56}text{Fe}$) চেয়ে ভারী মৌল তৈরি হওয়া অসম্ভব, কারণ লোহার বাঁধন শক্তি সর্বোচ্চ। দুটি নিউট্রন তারা যখন সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন প্রায় কয়েকশো পৃথিবীর সমান নিউট্রন-সমৃদ্ধ পদার্থ আলোর এক-তৃতীয়াংশ বেগে মহাকাশে ছিটকে বের হয়ে আসে। সেখানে নিউট্রনের ঘনত্ব এত তীব্র থাকে ($n_n > ১০^{২০}text{ cm}^{-3}$) যে নিউক্লিয়াসগুলো বিটা ক্ষয়ের চেয়েও বহুগুণ দ্রুত নিউট্রন শোষণ করে নেয়:
tau_{text{capture}} ll tau_{betatext{-decay}}
এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় র্যাপিড নিউট্রন ক্যাপচার বা r-প্রসেস (r-Process)। নিউট্রনে উপচে পড়া এই অতি-ভারী অস্থিতিশীল পরমাণুগুলো পরবর্তীতে বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে দ্রুত রূপান্তরিত হয়ে সৃষ্টি করে মহাবিশ্বের মূল্যবান ল্যান্থানাইড মৌলসমূহ—যার মধ্যে রয়েছে সোনা ($^{197}text{Au}$), প্ল্যাটিনাম ($^{195}text{Pt}$) এবং ইউরেনিয়াম ($^{238}text{U}$)।
৩. কিলোনোভা আলোর বর্ণালী ও ল্যান্থানাইড প্রাচীর
কিলোনোভা বিস্ফোরণের ঔজ্জ্বল্য সাধারণ নোভা বিস্ফোরণের চেয়ে হাজার গুণ বেশি হলেও সুপারনোভার চেয়ে কম—তাই একে বলা হয় কিলোনোভা। এই বিস্ফোরণের আলো পরিচালিত হয় তেজস্ক্রিয় ক্ষয়জনিত তাপ দ্বারা:
- নীল কিলোনোভা (Blue Kilonova): মেরু অঞ্চল থেকে নির্গত পদার্থে নিউট্রিনোর প্রভাবে ল্যান্থানাইড তৈরি হতে পারে না। ফলে আলো সহজেই ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রথম ২৪ ঘণ্টায় অতিবেগুনি ও নীল আলোতে শীর্ষ ঔজ্জ্বল্য দেখায়।
- লাল কিলোনোভা (Red Kilonova): কিন্তু প্রধান বিষুবীয় অঞ্চলে ল্যান্থানাইড মৌলগুলোর জটিল ইলেকট্রন কক্ষপথ দৃশ্যমান আলোকে শোষণ করে নেয় (ল্যান্থানাইড অপাসিটি প্রাচীর)। ফলে এই আলো অবলোহিত (Infrared) তরঙ্গে রূপান্তরিত হয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে মহাকাশে জ্বলজ্বল করতে থাকে।
৪. মহাজাগতিক রাসায়নিক রহস্যের সমাধান
আমরা আঙুলে যে সোনার আংটি পরিধান করি বা চিকিৎসায় যে প্ল্যাটিনাম ব্যবহার করি, তা পৃথিবীর সৃষ্টিতে কোনো সাধারণ নক্ষত্র তৈরি করেনি। GW170817 থেকে নির্গত সোনার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০টি পৃথিবীর মোট ভরের সমান! এর মাধ্যমে বিজ্ঞান নিশ্চিত করেছে যে নিউট্রন তারার মহাজাগতিক মিলনই হলো মহাবিশ্বের আসল সোনার খনি।