যখন ৮ থেকে ২৫ সৌর ভরের কোনো নক্ষত্রে সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটে, তখন মহাকর্ষীয় চাপে ইলেকট্রন এবং প্রোটনগুলো একত্রিত হয়ে নিউট্রনে রূপান্তরিত হয় ($p + e^- to n + nu_e$)। সৃষ্টি হয় এক অভাবনীয় মহাজাগতিক বিস্ময়: নিউট্রন তারা (Neutron Star)। প্রায় দেড় থেকে দুই সৌর ভর সংকুচিত হয়ে পরিণত হয় মাত্র ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটি অতি-ঘন গোলকে, যার কেন্দ্রীয় ঘনত্ব প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে শত ট্রিলিয়ন গ্রামেরও বেশি ($sim ১০^{১৫}text{ g/cm}^3$)। এই চরম বাস্তবতায় নিউটনীয় পদার্থবিদ্যা বাতিল হয়ে যায় এবং স্থান-কালের সাধারণ আপেক্ষিকতা নির্ধারিত হয় টলম্যান-ওপেনহাইমার-ভোলকফ (TOV) সমীকরণের মাধ্যমে।

১. টলম্যান-ওপেনহাইমার-ভোলকফ (TOV) সমীকরণ

১৯৩৯ সালে রিচার্ড টলম্যান, জে. রবার্ট ওপেনহাইমার এবং জর্জ ভোলকফ সাধারণ আপেক্ষিকতায় চরম ঘনত্বের নক্ষত্রের সাম্যাবস্থা সমীকরণ প্রতিপাদন করেন:

frac{dP}{dr} = -frac{G M(r) rho}{r^2} left[ 1 + frac{P}{rho c^2} right] left[ 1 + frac{4pi r^3 P}{M(r) c^2} right] left[ 1 – frac{2GM(r)}{c^2 r} right]^{-1}

বন্ধনীযুক্ত তিনটি উপাদানই সাধারণ আপেক্ষিকতার প্রত্যক্ষ প্রভাব প্রকাশ করে:

  • চাপের নিজস্ব আপেক্ষিক জড়তা ($P / rho c^2$)।
  • সাধারণ আপেক্ষিকতায় স্বয়ং চাপও মহাকর্ষ সৃষ্টি করে ($4pi r^3 P / M c^2$)।
  • স্থান-কালের জ্যামিতিক প্রসারণ ($g_{rr}$ সংশোধনী)।

যেহেতু চাপ বৃদ্ধি পেলে তা উল্টো মহাকর্ষীয় টান বাড়িয়ে দেয়, তাই একটি নির্দিষ্ট ভরের পর চাপ আর মহাকর্ষকে ঠেকাতে পারে না। এটিই হলো টিওভি সর্বোচ্চ ভর সীমা (TOV Limit), যার মান প্রায় ২.১ থেকে ২.৩ সৌর ভর। এর চেয়ে ভারী কোনো নিউট্রন তারা টিকে থাকতে পারে না—তা সোজা ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়।

২. অভ্যন্তরীণ স্তরবিন্যাস ও নিউক্লিয়ার পাস্তা

একটি নিউট্রন তারার গঠন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় এবং চরম পদার্থের জটিল রূপ ধারণ করে:

  1. বহিঃত্বক (Outer Crust): ভারী লোহা ও নিকেলের নিউক্লিয়াসের কঠিন ক্রিস্টাল ল্যাটিস এবং তার ভেতরে ইলেকট্রন মেঘ।
  2. অন্তঃত্বক ও নিউট্রন ড্রিপ: ঘনত্ব বাড়তে বাড়তে নিউক্লিয়াস থেকে মুক্ত নিউট্রন উপচে পড়ে সৃষ্টি করে এক অতি-তরল নিউট্রন সমুদ্র।
  3. নিউক্লিয়ার পাস্তা (Nuclear Pasta): ত্বকের গভীরে পৃষ্ঠটান ও কুলম্ব বিকর্ষণের তীব্র প্রতিযোগিতায় নিউক্লিয়াসগুলো লম্বা নলের মতো (স্প্যাগেটি), চ্যাপ্টা স্তরের মতো (লাসানিয়া) বা ছিদ্রযুক্ত গোলকের মতো রূপ ধারণ করে। এটি মহাবিশ্বের সবচেয়ে কঠিনতম পদার্থ, যা ইস্পাতের চেয়ে দশ বিলিয়ন গুণ বেশি শক্তিশালী!
  4. কেন্দ্রস্থল (Core): সম্পূর্ণ সুপারফ্লুইড নিউট্রন ও সুপারকন্ডাক্টিং প্রোটনের এক অবিচ্ছিন্ন তরল, যা চরম গভীরে কোয়ার্ক-গ্লুয়ন প্লাজমায় রূপান্তরিত হতে পারে।

৩. পালসার ও ম্যাগনেটার: মহাজাগতিক চৌম্বক দানব

নক্ষত্র সংকোচনের সময় চৌম্বক ফ্লাক্সের সংরক্ষণশীলতার কারণে চৌম্বক ক্ষেত্র বিলিয়ন গুণ বৃদ্ধি পেয়ে তৈরি হয় রেডিও পালসার (Pulsar), যার চৌম্বক ক্ষেত্র প্রায় $১০^{১২}text{ গাউস}$।

আর যদি আদি নক্ষত্রের ঘূর্ণন অতি দ্রুত হয়, তবে তৈরি হয় ম্যাগনেটার (Magnetar)—যার পৃষ্ঠের চৌম্বক ক্ষেত্র $১০^{১৪} – ১০^{১৫}text{ গাউস}$ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এটি কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্সের (QED) ক্রিটিক্যাল ফিল্ডকেও ছাড়িয়ে যায়। সেখানে শূন্যস্থান দ্বৈত প্রতিসরণ দেখায় এবং তীব্র স্টারকোয়েক বা ভূকম্পনের ফলে কয়েক মিলি-সেকেন্ডে সূর্য থেকে হাজার বছরের সমপরিমাণ গামা রশ্মির মহাবিস্ফোরণ ঘটে।