১৯৯৮ সালে দুটি স্বাধীন আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী দল দূরবর্তী সুপারনোভার ঔজ্জ্বল্য পর্যবেক্ষণ করে সমগ্র মানবজাতিকে স্তম্ভিত করে দেয়: মহাকর্ষের টানে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি ধীর হচ্ছে না, বরং এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে মহাবিশ্ব সময়ের সাথে সাথে ক্রমশ তীব্র গতিতে ত্বরান্বিত হয়ে প্রসারিত হচ্ছে! মহাবিশ্বের মোট শক্তির প্রায় ৬৮ শতাংশ দখল করে থাকা এই রহস্যময় উপাদানের নাম দেওয়া হয়েছে ডার্ক এনার্জি বা অন্ধকার শক্তি (Dark Energy)। আলবার্ট আইনস্টাইনের কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট ($Lambda$) হিসেবে বিবেচিত এই শক্তি আধুনিক তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় ধাঁধা।
১. স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল হিসেবে টাইপ ১এ সুপারনোভা
যেহেতু একটি শ্বেত বামন ঠিক চন্দ্রশেখর সীমার (১.৪৪ সৌর ভর) কাছে পৌঁছালেই বিস্ফোরিত হয়, তাই সমস্ত টাইপ ১এ সুপারনোভার (Type Ia Supernovae) সর্বোচ্চ ঔজ্জ্বল্য প্রায় সমান ও সুনির্দিষ্ট। ফলে এদের দূরত্ব পরিমাপের ‘স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্ডেল’ হিসেবে ব্যবহার করা যায়:
d_L = left( frac{L}{4pi F} right)^{1/2}
দূরবর্তী সুপারনোভাগুলোর উজ্জ্বলতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে তারা সাধারণ অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি অস্পষ্ট বা বহুদূরে সরে গেছে। এর একমাত্র ব্যাখ্যা হলো যে আজ থেকে প্রায় ৬০০ কোটি বছর আগে ($z approx ০.৬$) মহাবিশ্বের প্রসারণ মহাকর্ষীয় বাধা অতিক্রম করে ত্বরান্বিত হওয়া শুরু করেছে।
২. ঋণাত্মক চাপ ও মহাজাগতিক ত্বরণ
সাধারণ আপেক্ষিকতার দ্বিতীয় ফ্রিডম্যান সমীকরণ অনুসারে প্রসারণের ত্বরণ হলো:
frac{ddot{a}}{a} = -frac{4pi G}{3} left( rho + frac{3P}{c^2} right)
মহাবিশ্বকে ত্বরান্বিত হতে হলে ($ddot{a} > 0$) কার্যকরী চাপ অবশ্যই ঋণাত্মক হতে হবে: $P < -frac{1}{3}rho c^2$। অবস্থার সমীকরণ প্যারামিটার $w = P / (rho c^2)$ দ্বারা ডার্ক এনার্জির প্রকৃতি নির্ধারিত হয়:
- আইনস্টাইনের কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্টের ক্ষেত্রে স্থান প্রসারিত হলেও শক্তির ঘনত্ব অপরিবর্তিত থাকে ($rho_Lambda = text{ধ্রুবক}$)। ফলে এর চাপ ঠিক ঋণাত্মক ঘনত্বের সমান:
P_Lambda = -rho_Lambda c^2 quad Longrightarrow quad w = -১
প্ল্যাঙ্ক স্যাটেলাইট এবং দূরবীক্ষণ যন্ত্রের যৌথ পরিমাপে $w$-এর মান পাওয়া গেছে $w = -১.০৩ pm ০.০৩$, যা নিখুঁতভাবে আইনস্টাইনের কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্টকেই সমর্থন করে।
৩. কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট সমস্যা: পদার্থবিজ্ঞানের সর্বনিকৃষ্ট গণনা
কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি অনুসারে শূন্যস্থান কখনো ফাঁকা নয়; সেখানে প্রতিনিয়ত ভার্চুয়াল কণার শূন্যবিন্দু শক্তি ($E_0 = frac{1}{2}hbaromega$) তৈরি হচ্ছে। প্ল্যাঙ্ক স্কেলে সমগ্র শূন্যস্থানের তাত্ত্বিক কোয়ান্টাম শক্তি গণনা করলে পাওয়া যায়:
rho_{text{QFT}} sim ১০^{৭৬}text{ GeV}^4 sim ১০^{১১৪}text{ J/m}^3
অথচ জ্যোতির্বিজ্ঞানে ডার্ক এনার্জির বাস্তব পর্যবেক্ষণকৃত ঘনত্ব হলো মাত্র:
rho_{text{obs}} sim ১০^{-৪৭}text{ GeV}^4 sim ১০^{-৯}text{ J/m}^3
তাত্ত্বিক ভবিষ্যৎবাণী বাস্তব পর্যবেক্ষণের চেয়ে ১২০টি শূন্যের গুণিতকে ($১০^{১২০}$ গুণ) বেশি! একে বলা হয় পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসের সবচেয়ে শোচনীয় অসঙ্গতি। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও সাধারণ আপেক্ষিকতা একত্র না হওয়া পর্যন্ত এই ১২০ ঘাতের রহস্যের সমাধান সম্ভব নয়।
৪. পরিবর্তনশীল ডার্ক এনার্জি: কুইনটেসেন্স
এই সংকট নিরসনে বিজ্ঞানীরা প্রস্তাব করেছেন কুইনটেসেন্স (Quintessence) মডেল—যেখানে ডার্ক এনার্জি কোনো স্থির ধ্রুবক নয়, বরং একটি গতিশীল স্কেলার ফিল্ড যার শক্তি সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে পারে। যদি $w < -1$ হয়, তবে তাকে বলে ফ্যান্টম এনার্জি, যা ভবিষ্যতে মহাবিশ্বকে 'বিগ রিপ'-এর মাধ্যমে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারে।