১৯১৬ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন প্রতিপাদন করেন যে মহাবিশ্বে ত্বরিত ভরের গতিশীলতার ফলে স্থান-কালের জ্যামিতিতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তরঙ্গের সৃষ্টি হয় যা আলোর গতিতে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে: মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (Gravitational Waves)। তড়িচ্চুম্বকীয় তরঙ্গ যেমন স্থান-কালের ওপর দিয়ে প্রবাহিত একটি ভেক্টর তরঙ্গের কম্পন, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ হলো স্বয়ং স্থান-কালের নিজস্ব সংকোচন ও প্রসারণ—যা এর গতিপথের সাথে লম্বভাবে স্থান-কালকে প্রসারিত ও সংকুচিত করতে করতে এগিয়ে চলে।

১. দুর্বল ক্ষেত্রে লিনিয়ারাইজড আইনস্টাইন সমীকরণ

মহাকর্ষীয় উৎস থেকে বহুদূরে স্থান-কালকে সমতল মিনকোভস্কি মেট্রিক $eta_{munu}$ এবং একটি অতি-ক্ষুদ্র বিচ্যুতি $h_{munu}$-এর যোগফল হিসেবে প্রকাশ করা যায় ($|h_{munu}| ll 1$):

g_{munu} = eta_{munu} + h_{munu}

লরেন্টজ গেজ শর্ত ($partial^mu bar{h}_{munu} = 0$) আরোপ করলে জটিল ফিল্ড সমীকরণটি একটি নিখুঁত রৈখিক তরঙ্গ সমীকরণে রূপান্তরিত হয়:

Box bar{h}_{munu} = left( -frac{1}{c^2} frac{partial^2}{partial t^2} + nabla^2 right) bar{h}_{munu} = -frac{16pi G}{c^4} T_{munu}

শূন্যস্থানে ($T_{munu} = 0$) এটি রূপ নেয় $Box bar{h}_{munu} = 0$, যা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শূন্য মাধ্যমে ঠিক আলোর সমান গতিবেগেই ($v = c$) ধাবিত হয়।

২. ট্রান্সভার্স-ট্রেসলেস (TT) গেজ ও পোলারাইজেশন

স্থান-কালের স্থানাঙ্ক স্বাধীনতার পূর্ণ সুবিধা নিয়ে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বিশুদ্ধ বিকিরণকে ট্রান্সভার্স-ট্রেসলেস (TT) গেজে প্রকাশ করা হয়। $z$-অক্ষ বরাবর ধাবিত তরঙ্গের জন্য টেনসরে কেবল দুটি স্বাধীন পোলারাইজেশন অবস্থা অবশিষ্ট থাকে:

h_{ij}^{text{TT}}(t, z) = begin{pmatrix} h_+ & h_times & 0 \ h_times & -h_+ & 0 \ 0 & 0 & 0 end{pmatrix} e^{i(omega t – kz)}

এখানে $h_+$ হলো প্লাস পোলারাইজেশন এবং $h_times$ হলো ক্রস পোলারাইজেশন (যা ৪৫° কোণে আবর্তিত)। মহাকাশে মুক্তভাবে ভাসমান একটি বৃত্তাকার কণা বলয়ের মধ্য দিয়ে যখন একটি প্লাস মোডের তরঙ্গ অতিক্রম করে, তখন প্রথম অর্ধচক্রে বৃত্তটি অনুভূমিকভাবে প্রসারিত ও উলম্বভাবে সংকুচিত হয়, এবং পরবর্তী অর্ধচক্রে ঠিক বিপরীত পরিবর্তন ঘটে।

৩. আইনস্টাইনের কোয়াড্রুপোল বিকিরণ সূত্র

মহাকর্ষে কোনো মনোপোল বা ডাইপোল বিকিরণ সম্ভব নয়। ভরের সংরক্ষণশীলতার কারণে মনোপোল শূন্য, এবং রৈখিক ভরবেগের সংরক্ষণশীলতার কারণে ডাইপোল শূন্য। ফলে মহাকর্ষীয় বিকিরণ শুরু হয় দ্বিতীয় ভর-মোমেন্ট বা কোয়াড্রুপোল মোমেন্ট (Quadrupole Moment) থেকে:

I_{ij} = int rho(t, mathbf{x}) left( x_i x_j – frac{1}{3} r^2 delta_{ij} right) d^3x

১৯১৮ সালে আইনস্টাইন প্রতিপাদন করেন মহাকর্ষীয় তরঙ্গের মোট বিকিরণ ক্ষমতা:

L_{text{GW}} = frac{G}{5 c^5} leftlangle dddot{I}_{jk} dddot{I}^{jk} rightrangle

এখানে $G/c^5$ ধ্রুবকটি এত ক্ষুদ্র ($১০^{-৬০}$ স্কেলের) যে সাধারণ ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা কোনো বস্তুর ঘূর্ণন থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পরিমাপ করা অসম্ভব। কেবল ব্ল্যাক হোল বা নিউট্রন তারার মতো মহাজাগতিক বস্তুর তীব্র সংঘর্ষ থেকেই শক্তিশালী তরঙ্গ জন্ম নেয়।

৪. হাল্স-টেলর বাইনারি পালসার ও প্রথম পরোক্ষ প্রমাণ

দুটি নিউট্রন তারা যখন পরস্পরের চারপাশে ঘোরে, তখন ক্রমাগত মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নির্গত হওয়ার ফলে তাদের মোট কক্ষপথ শক্তি হ্রাস পায়। এর ফলে তারা দুটি ধীরে ধীরে পরস্পরের কাছাকাছি আসতে থাকে এবং তাদের আবর্তন সময়কাল ($P_b$) কমে যায়:

dot{P}_b propto -frac{m_1 m_2}{(m_1 + m_2)^{1/3}} P_b^{-5/3}

রাসেল হাল্স ও জোসেফ টেলর ত্রিশ বছর ধরে PSR B1913+16 নামক বাইনারি পালসার পর্যবেক্ষণ করে দেখেন যে এর কক্ষপথ হ্রাসের হার আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার ভবিষ্যৎবাণীর সাথে ৯৯.৮% নির্ভুলভাবে মিলে গেছে—যা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের অস্তিত্বের প্রথম অকাট্য পরোক্ষ প্রমাণ হিসেবে ১৯৯৩ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করে।