ক্লাসিক্যাল বিগ ব্যাং তত্ত্ব মহাবিশ্বের বিবর্তন ব্যাখ্যায় অসাধারণ সফল হলেও এর মধ্যে কয়েকটি গুরুতর মৌলিক সমস্যা রয়ে গিয়েছিল: কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের এলাকাগুলো কখনোই পরস্পরের সংস্পর্শে না এসেও তাদের তাপমাত্রা হুবহু এক হলো কীভাবে (হরাইজন সমস্যা)? আর মহাবিশ্বের জ্যামিতি এত নিখুঁতভাবে সমতলই বা হলো কীভাবে (সমতলতা সমস্যা)? ১৯৮০ সালে অ্যালান গুথ, আন্দ্রেই লিন্ডে এবং আলেক্সেই স্টারোবিনস্কি এই সংকটের বৈপ্লবিক সমাধান প্রদান করেন: মহাজাগতিক স্ফীতি বা কসমিক ইনফ্লেশন (Cosmic Inflation)—সৃষ্টির প্রথম $১০^{-৩৬}$ সেকেন্ডে স্থান-কালের এক অতি-তীব্র সূচকীয় মহাপ্রসারণ।

১. ক্লাসিক্যাল মহাবিশ্বতত্ত্বের তিনটি মৌলিক সংকট

ক্লাসিক্যাল বিগ ব্যাং মডেলে তিনটি চরম অমীমাংসিত প্রশ্ন ছিল:

  • হরাইজন সমস্যা (Horizon Problem): আকাশের এক প্রান্তের তাপমাত্রার সাথে বিপরীত প্রান্তের তাপমাত্রা এক লক্ষ ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত অভিন্ন। অথচ আলোর গতি সীমাবদ্ধ হওয়ায় সৃষ্টির শুরুতে এই অঞ্চলগুলো পরস্পরের থেকে এত দূরে ছিল যে তাদের মধ্যে কোনো তাপীয় ভারসাম্য স্থাপন অসম্ভব ছিল।
  • সমতলতা সমস্যা (Flatness Problem): মহাবিশ্বের সামগ্রিক ঘনত্ব সংকট ঘনত্বের চেয়ে সামান্য কম বা বেশি হলেই মহাবিশ্ব কোটি কোটি বছর আগে সংকুচিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যেত অথবা প্রসারিত হয়ে হিমশীতল হয়ে যেত। এই সমতলতা বজায় রাখতে প্ল্যাঙ্ক সময়ে মহাবিশ্বকে $১০^{৬০}$ ভাগের এক ভাগের নির্ভুলতায় সমতল হতে হতো!
  • চৌম্বক মনোপোল সমস্যা: গ্র্যান্ড ইউনিফাইড থিওরি অনুসারে সৃষ্টির শুরুতে বিপুল ভারী চৌম্বক মনোপোল তৈরি হওয়ার কথা, যা মহাবিশ্ব জুড়ে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

২. ইনফ্লেটন ফিল্ড ও স্লো-রোল মহাপ্রসারণ

ইনফ্লেশন প্রস্তাব করে যে সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণ ছিল একটি স্কেলার ক্ষেত্রের হাতে—যার নাম ইনফ্লেটন (Inflaton) $phi$। এর কার্যকর ক্লাইন-গর্ডন সমীকরণ হলো:

ddot{phi} + 3Hdot{phi} + V'(phi) = 0

যখন এই ক্ষেত্রটি তার স্থিতিশক্তি বিভব $V(phi)$-এর অতি চ্যাপ্টা ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ে (স্লো-রোল পর্যায়), তখন এর গতিশক্তি স্থিতিশক্তির চেয়ে অনেক নগণ্য থাকে। ফলে মহাবিশ্বের চাপ প্রচণ্ড ঋণাত্মক হয়ে পড়ে ($P approx -rho c^2$), এবং স্থান-কাল সূচকীয় হারে প্রসারিত হয়:

a(t) propto e^{Ht}

মাত্র এক সেকেন্ডের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশে স্থান-কালের আকার অন্তত $১০^{২৬}$ গুণ বৃদ্ধি পায়! এর ফলে একটি অতি ক্ষুদ্র সংযুক্ত অঞ্চলের তাপমাত্রা গোটা মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে, চৌম্বক মনোপোলগুলো শূন্যে মিলিয়ে যায় এবং একটি বেলুন ফোলানোর মতো স্থানিক বক্রতা নিখুঁত সমতলে রূপ নেয়।

৩. স্লো-রোল প্যারামিটার

ইনফ্লেশনের স্থায়িত্ব নির্ধারিত হয় দুটি মাত্রাহীন স্লো-রোল প্যারামিটার দ্বারা:

epsilon equiv frac{M_{text{Pl}}^2}{2} left( frac{V’}{V} right)^2 ll 1, quad eta equiv M_{text{Pl}}^2 frac{V”}{V} ll 1

বিভব শেষ হলে স্লো-রোল ভেঙে পড়ে ($epsilon to 1$) এবং ইনফ্লেটন ক্ষেত্র দ্রুত স্পন্দিত হয়ে তার সমস্ত শক্তি সাধারণ কণা ও তাপে রূপান্তরিত করে—একে বলা হয় রিহিটিং (Reheating) বা মহাবিশ্বের পুনর্জাগরণ।

৪. কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশন থেকে গ্যালাক্সির জন্ম

ইনফ্লেশনের সবচেয়ে মহাকাব্যিক আবিষ্কার হলো যে আমাদের রাতের আকাশের কোটি কোটি গ্যালাক্সি আসলে সাব-অ্যাটমিক কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তার ফসল! ইনফ্লেশন চলাকালে শূন্যস্থানের যে মাইক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম অস্থিরতা বা ফ্ল্যাকচুয়েশন ($deltaphi$) সৃষ্টি হয়েছিল, স্থান-কালের তীব্র প্রসারণে তা আলোকবর্ষব্যাপী প্রসারিত হয়ে স্থায়ী ঘনত্বের তরঙ্গে জমাট বাঁধে। এই আদিম কোয়ান্টাম তরঙ্গের পাওয়ার স্পেকট্রামের সূচকীয় মান প্রেডিক্ট করা হয় $n_s approx ০.৯৬৫$। আধুনিক প্ল্যাঙ্ক স্যাটেলাইটের পর্যবেক্ষণ এই গাণিতিক মানকে অবিশ্বাস্য নির্ভুলতায় নিশ্চিত করেছে—প্রমাণ করেছে যে অতি-বৃহৎ মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে অতি-ক্ষুদ্র কোয়ান্টাম অনিশ্চয়তার গর্ভ থেকে।