মহাবিশ্বের প্রতিটি কাঠামো—উপ-পারমাণবিক কণা ও গ্রহ থেকে শুরু করে জ্বলন্ত নক্ষত্র ও গ্যালাক্সি ক্লাস্টার পর্যন্ত—সবকিছুই তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের নির্দয় নিয়মের অধীন এক ক্ষণস্থায়ী রূপ মাত্র। সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং ডার্ক এনার্জির সমীকরণ আমাদেরকে কোটি কোটি বছরের সুদূর ভবিষ্যতে উঁকি দেওয়ার সুযোগ দেয়। সমতল $Lambdatext{CDM}$ মহাবিশ্বে স্থান-কালের চূড়ান্ত পরিণতি হলো একটি চিরস্থায়ী, অন্ধকার, বিচ্ছিন্ন এবং হিমশীতল শূন্যতা: মহাজাগতিক তাপীয় মৃত্যু (Thermodynamic Heat Death)।
১. মহাকালের পাঁচটি মহাজাগতিক যুগ
জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেড অ্যাডামস ও গ্রেগরি লাফলিন মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ ইতিহাসকে পাঁচটি স্বতন্ত্র যুগে বিভক্ত করেছেন:
- আদিম যুগ (সৃষ্টির প্রথম ১ লক্ষ বছর): বিগ ব্যাং, ইনফ্লেশন, নিউক্লিওসিন্থেসিস এবং প্রথম পরমাণু গঠনের যুগ।
- নক্ষত্রের যুগ ($১০^৬ – ১০^{১৪}$ বছর): আমাদের বর্তমান যুগ। মহাবিশ্ব জ্বলন্ত তারায় পূর্ণ। কিন্তু প্রায় একশো বিলিয়ন বছরের মধ্যে মহাবিশ্বের সমস্ত গ্যাস ফুরিয়ে যাবে। সবচেয়ে দীর্ঘজীবী লাল বামন নক্ষত্রগুলোও প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন বছর পর নিভে যাবে। $১০^{১৪}$ বছর পর মহাবিশ্বে সমস্ত নক্ষত্রের আলো চিরতরে নিভে যাবে।
- ক্ষয়িষ্ণু যুগ ($১০^{১৪} – ১০^{৪০}$ বছর): মহাবিশ্বে অবশিষ্ট থাকবে কেবল মৃত নক্ষত্রের ছাই: শ্বেত বামন, নিউট্রন তারা ও ব্ল্যাক হোল। গ্যালাক্সিগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে মহাকাশে হারিয়ে যাবে। গ্র্যান্ড ইউনিফাইড থিওরি সত্য হলে প্রোটন কণার ক্ষয় ($p to e^+ + pi^0$) ঘটবে এবং সমস্ত কঠিন পদার্থ পচে তেজস্ক্রিয় ফোটনে পরিণত হবে।
- ব্ল্যাক হোলের যুগ ($১০^{৪০} – ১০^{১০০}$ বছর): মহাবিশ্বের একমাত্র অবশিষ্ট বাসিন্দা হবে ব্ল্যাক হোলসমূহ। কিন্তু কোয়ান্টাম হকিং বিকিরণের কারণে নক্ষত্রজাত ব্ল্যাক হোলগুলো $১০^{৬৭}$ বছরে এবং মহাদানব ব্ল্যাক হোলগুলো প্রায় $১০^{১০০}$ বছরে সম্পূর্ণ বাষ্পীভূত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে।
- অন্ধকার যুগ ($১০^{১০০}$ বছরের পর): মহাবিশ্বে অবশিষ্ট থাকবে কেবল পরম শূন্যতায় ভেসে থাকা অতি-ক্ষীণ ফোটন ও নিউট্রিনো। মহাবিশ্বের এন্ট্রপি তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছাবে—কোনো কার্যক্ষম শক্তি আর কখনোই অবশিষ্ট থাকবে না।
২. ডি সিটার স্পেসটাইম ও মহাজাগতিক ইভেন্ট হরাইজন
ডার্ক এনার্জির কারণে স্থান-কালের সূচকীয় সম্প্রসারণ চিরকাল চলতে থাকবে ($a(t) propto e^{Ht}$)। এর ফলে মহাবিশ্বে সৃষ্টি হবে একটি অপরিবর্তনীয় কসমিক ইভেন্ট হরাইজন (প্রায় ১৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে)। আমাদের স্থানীয় গ্যালাক্সির বাইরের সমস্ত গ্যালাক্সি এই দিগন্ত পেরিয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাবে। আগামী একশো বিলিয়ন বছর পর জন্ম নেওয়া কোনো জ্যোতির্বিদ রাতের আকাশে তাকিয়ে কেবল একটি নিঃসঙ্গ গ্যালাক্সি দেখতে পাবে—মহাবিশ্বের বাকি সমস্ত গ্যালাক্সি চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যাবে এবং বিগ ব্যাং বা সিএমবির সমস্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ মুছে যাবে।
৩. মহাবিশ্বের অন্যান্য সম্ভাব্য নিয়তি
ডার্ক এনার্জির প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে মহাবিশ্বের পরিণতি ভিন্নও হতে পারে:
- বিগ রিপ (Big Rip): যদি ডার্ক এনার্জি ফ্যান্টম প্রকৃতির হয় ($w < -1$), তবে আগামী ২০-৫০ বিলিয়ন বছরের মধ্যে সম্প্রসারণের তীব্রতায় গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ এবং সবশেষে পরমাণুর নিউক্লিয়াস পর্যন্ত ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে স্থান-কাল ধ্বংস হয়ে যাবে।
- বিগ ক্রাঞ্চ (Big Crunch): ডার্ক এনার্জি যদি ঋণাত্মক মানে পরিবর্তিত হয়, মহাবিশ্বের প্রসারণ উল্টে গিয়ে সবকিছু পুনরায় একটি অতি-ক্ষুদ্র উত্তপ্ত বিন্দুতে পিষ্ট হয়ে যাবে।
- কনফরমাল সাইক্লিক মহাবিশ্ব (CCC): স্যার রজার পেনরোজ প্রস্তাব করেছেন যে অন্ধকার যুগে যখন কোনো ভর অবশিষ্ট থাকবে না এবং সবকিছু আলোতে পরিণত হবে, তখন স্থান-কালের দূরত্বের মাপকাঠি অর্থহীন হয়ে পড়বে। এই অসীম শীতল শেষ সীমান্তটিই একটি কনফরমাল রূপান্তরের মাধ্যমে নতুন একটি বিগ ব্যাং-এর জন্ম দিতে পারে—শুরু হবে নতুন এক মহাজাগতিক চক্র (Aeon)।
৪. পরম তাপগতিবিদ্যার দিগন্ত
শূন্য ডি সিটার মহাবিশ্বেরও একটি নিজস্ব কোয়ান্টাম তাপমাত্রা থাকে: গিবনস-হকিং তাপমাত্রা $T_{text{dS}} sim ১০^{-৩০}text{ K}$। এই তাপমাত্রায় প্রায় $১০^{১০^{১২০}}$ বছর পর কোয়ান্টাম ওঠানামার মাধ্যমে হয়তো আবার জন্ম হতে পারে নতুন কোনো স্থান-কালের—যা মনে করিয়ে দেয় যে পরম সমাপ্তির মাঝেও গণিত ও কোয়ান্টাম জ্যামিতির সম্ভাবনা চিরকাল জাগ্রত থাকে।