মহাবিস্ফোরণের পরবর্তী মাত্র বিশ মিনিট মহাবিশ্ব ছিল এক সুবিশাল, প্রচণ্ড উত্তপ্ত ও অনবরত শীতল হতে থাকা থার্মোনিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর। এই আদিম পারমাণবিক অগ্নিকুণ্ডে প্রোটন ও নিউট্রন থেকে সরাসরি জন্ম নেয় মহাবিশ্বের সবচেয়ে হালকা মৌলসমূহ: ডিউটেরিয়াম ($^2text{H}$), হিলিয়াম-৩ ($^3text{He}$), হিলিয়াম-৪ ($^4text{He}$) এবং লিথিয়াম-৭ ($^7text{Li}$)। বিগ ব্যাং নিউক্লিওসিন্থেসিস (BBN) হলো আধুনিক মহাবিশ্বতত্ত্বের সবচেয়ে প্রাচীনতম প্রত্যক্ষ ভিত্তি—যা প্রমাণ করে সৃষ্টির মাত্র এক সেকেন্ড পরের মহাবিশ্ব ঠিক কীরূপে ক্রিয়াশীল ছিল।
১. দুর্বল মিথস্ক্রিয়ার ফ্রিজ-আউট (t ~ ১ সেকেন্ড)
সৃষ্টির প্রথম সেকেন্ডে তাপমাত্রা যখন প্রায় এক কোটি কেলভিন ($T sim ১০^{১০}text{ K}$ বা $০.৮text{ MeV}$), তখন নিউট্রন এবং প্রোটন দুর্বল পারমাণবিক বলের মাধ্যমে নিরন্তর একে অপরে রূপান্তরিত হচ্ছিল:
n + nu_e longleftrightarrow p + e^-, quad n + e^+ longleftrightarrow p + bar{nu}_e
নিউট্রন এবং প্রোটনের অনুপাত বোল্টসম্যান সমীকরণ মেনে চলছিল:
left(frac{n}{p}right) approx e^{-Delta m / T}
যেখানে নিউট্রন ও প্রোটনের ভরের পার্থক্য $Delta m = ১.২৯৩text{ MeV}$। মহাবিশ্বের দ্রুত প্রসারণের ফলে দুর্বল বলের বিক্রিয়া হার মহাবিশ্বের সম্প্রসারণের হারের চেয়ে ধীর হয়ে যায়। ঠিক $T approx ০.৮text{ MeV}$ তাপমাত্রায় এই প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ বা ‘ফ্রিজ-আউট’ (Freeze-out) হয়ে যায়। ফলে নিউট্রন ও প্রোটনের অনুপাত স্থির হয়ে যায় ১:৬ অনুপাতে।
২. মুক্ত নিউট্রনের ক্ষয় ও ডিউটেরিয়াম বাধা
ফ্রিজ-আউটের পর নিউট্রন তৈরির বিক্রিয়া থেমে যাওয়ায় মুক্ত নিউট্রনগুলো তেজস্ক্রিয় বিটা ক্ষয়ের মাধ্যমে প্রোটনে পরিণত হতে থাকে (নিউট্রনের গড় আয়ুষ্কাল $tau_n approx ৮৭৯.৪text{ সেকেন্ড}$)।
তাহলে সাথে সাথে নিউক্লিয়ার ফিউশন শুরু হলো না কেন? ফিউশন শুরু হতে হলে আগে প্রোটন ও নিউট্রন মিলে ডিউটেরিয়াম তৈরি হতে হয় ($p + n to {}^2text{H} + gamma$)। কিন্তু ডিউটেরিয়ামের নিউক্লিয়ার বাঁধন শক্তি অতি দুর্বল ($২.২২text{ MeV}$)। অন্যদিকে মহাবিশ্বে প্রতি একটি ব্যারিয়নের বিপরীতে ছিল এক বিলিয়ন উচ্চ-শক্তির ফোটন কণা! ফলে যেইমাত্র একটি ডিউটেরিয়াম তৈরি হচ্ছিল, তীব্র গামা রশ্মি তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে দিচ্ছিল। এই অচলাবস্থাকে বলা হয় ডিউটেরিয়াম বাধা (Deuterium Bottleneck)।
মহাবিশ্ব আরও প্রসারিত হয়ে তাপমাত্রা $০.০৮text{ MeV}$-এ নেমে আসার আগ পর্যন্ত (প্রায় ২০০-৩০০ সেকেন্ড) ফিউশন থমকে থাকে। এই বিলম্বের কারণে নিউট্রন ক্ষয় হয়ে নিউট্রন-প্রোটন অনুপাত ১:৬ থেকে কমে ১:৭-এ নেমে আসে।
৩. হিলিয়াম-৪ এর দ্রুত সৃষ্টি ও ২৫% ভরের উৎপত্তি
তাপমাত্রা $০.০৮text{ MeV}$-এ পৌঁছানোর সাথে সাথেই ডিউটেরিয়াম বাধা ভেঙে যায় এবং প্রলয়ঙ্করী গতিতে শৃঙ্খল বিক্রিয়া শুরু হয়। যেহেতু হিলিয়াম-৪ ($^4text{He}$) এর বাঁধন শক্তি অত্যন্ত বেশি ($২৮.৩text{ MeV}$), তাই মহাবিশ্বের প্রায় সমস্ত অবশিষ্ট নিউট্রন হিলিয়াম-৪-এ রূপান্তরিত হয়। মোট হিলিয়ামের ভর অনুপাত গাণিতিকভাবে নির্ণীত হয়:
Y_p = frac{2 (n/p)}{1 + (n/p)} approx frac{2(1/7)}{1 + 1/7} = frac{2/7}{8/7} = ২৫%
আধুনিক স্পেকট্রোস্কোপিক পর্যবেক্ষণে মহাবিশ্বের আদিম হিলিয়ামের পরিমাণ পাওয়া গেছে ২৪.৫%—যা তাত্ত্বিক গণনার সাথে ১০০% নিখুঁতভাবে মিলে যায়।
৪. ভর-৫ এবং ভর-৮ এর পারমাণবিক শূন্যতা
বিগ ব্যাং-এ লোহা বা কার্বন তৈরি হলো না কেন? কারণ প্রকৃতিতে ৫ বা ৮ পারমাণবিক ভরের কোনো স্থিতিশীল পরমাণু নেই। হিলিয়ামের সাথে প্রোটন বা নিউট্রন ধাক্কা খেলে তৈরি হয় $^5text{He}$ বা $^5text{Li}$, যা তাৎক্ষণিকভাবে ভেঙে যায়। আবার দুটি হিলিয়াম মিলে তৈরি হয় $^8text{Be}$, যা সেকেন্ডের অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশে পুনরায় দুটি হিলিয়ামে রূপ নেয়। সাধারণ নক্ষত্রে এই বাধা ট্রিপল-আলফা বিক্রিয়ার মাধ্যমে পেরোনো গেলেও বিগ ব্যাং-এর দ্রুত সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বে তা সম্ভব ছিল না। ফলে আদি মহাবিশ্ব গঠিত হয় ৭৫% হাইড্রোজেন, ২৫% হিলিয়াম এবং সামান্যতম ডিউটেরিয়াম ও লিথিয়াম দিয়ে—আর বাকি সমস্ত ভারী মৌল সৃষ্টির দায়িত্ব অর্পিত হয় কোটি কোটি বছর পর জন্ম নেওয়া নক্ষত্রসমূহের ওপর।