ক্লাসিক্যাল সাধারণ আপেক্ষিকতায় ব্ল্যাক হোল একটি চরম মহাকর্ষীয় গহ্বর যেখান থেকে আলো পর্যন্ত কোনো কিছুই কখনো বের হতে পারে না। কিন্তু যখন বক্র স্থান-কালের পটভূমিতে কোয়ান্টাম ক্ষেত্রতত্ত্ব প্রয়োগ করা হয়, তখন দেখা যায় ব্ল্যাক হোল সম্পূর্ণ বাস্তব তাপগতিবিদ্যার নিয়ম মেনে চলে: এর একটি নির্দিষ্ট পরম তাপমাত্রা রয়েছে, এটি তাপীয় বিকিরণ নির্গমন করে এবং এর দিগন্তের ক্ষেত্রফলের সমানুপাতিক বিপুল মাইক্রোস্কোপিক এন্ট্রপি রয়েছে। জ্যাকব বেকেনস্টাইন ও স্টিফেন হকিং কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই আবিষ্কার মহাকর্ষ, কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ও পরিসংখ্যানিক পদার্থবিদ্যাকে এক সুতোয় গেঁথেছে।

১. ব্ল্যাক হোল মেকানিক্সের চারটি নীতি

১৯৭৩ সালে বার্ডিন, কার্টার এবং হকিং ক্লাসিক্যাল তাপগতিবিদ্যার সাথে সাদৃশ্য রেখে ব্ল্যাক হোলের জ্যামিতিক মেকানিক্সের চারটি সূত্র প্রতিপাদন করেন:

নীতি ক্লাসিক্যাল তাপগতিবিদ্যা ব্ল্যাক হোল মেকানিক্স
শূন্যতম সাম্যাবস্থায় তাপমাত্রা $T$ সর্বত্র সমান স্থিতিশীল ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনে পৃষ্ঠ মহাকর্ষ $kappa$ সর্বত্র ধ্রুবক
প্রথম $dE = T dS + dW$ $dM = frac{kappa}{8pi} dA + Omega_H dJ + Phi_H dQ$
দ্বিতীয় $Delta S ge 0$ (এন্ট্রপি কখনো কমে না) $Delta A ge 0$ (হকিং এরিয়া উপপাদ্য: ব্ল্যাক হোলের মোট ক্ষেত্রফল কখনো হ্রাস পায় না)
তৃতীয় সসীম ধাপে $T = 0$ এ পৌঁছানো অসম্ভব সসীম সংখ্যক ধাপে এক্সট্রিমাল ব্ল্যাক হোলে ($kappa = 0$) পৌঁছানো অসম্ভব

২. বেকেনস্টাইন এন্ট্রপি ও হলোগ্রাফিক নীতি

জ্যাকব বেকেনস্টাইন উপলব্ধি করেন যে ব্ল্যাক হোলের যদি নিজস্ব কোনো এন্ট্রপি না থাকে, তবে উচ্চ এন্ট্রপির বস্তু ব্ল্যাক হোলে নিক্ষেপ করলে তাপগতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্র লঙ্ঘিত হবে। তিনি প্রস্তাব করেন যে ব্ল্যাক হোলের দিগন্তের ক্ষেত্রফল $A$-ই হলো এর আসল এন্ট্রপি। পরবর্তীতে স্টিফেন হকিং কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরির সাহায্যে এর নিখুঁত ধ্রুবক নির্ণয় করেন:

S_{text{BH}} = frac{k_B c^3 A}{4 G hbar} = frac{k_B A}{4 ell_P^2}

যেখানে $ell_P = sqrt{frac{Ghbar}{c^3}} approx ১.৬১৬ times ১০^{-৩৫}text{ মি}$ হলো প্ল্যাঙ্ক দৈর্ঘ্য। সাধারণ পদার্থের এন্ট্রপি আয়তনের ওপর নির্ভর করলেও ব্ল্যাক হোলের এন্ট্রপি নির্ধারিত হয় এর বহিস্থ দ্বিমাত্রিক ক্ষেত্রফল দ্বারা ($S propto A$)। এই বৈপ্লবিক অন্তর্দৃষ্টি থেকেই জেরার্ড টি হুফট ও লিওনার্ড সাসকাইন্ডের হলোগ্রাফিক নীতির (Holographic Principle) জন্ম হয়।

৩. হকিং বিকিরণ ও ব্ল্যাক হোলের বাষ্পীভবন

হকিং দেখান যে দিগন্তের নিকটবর্তী কোয়ান্টাম শূন্যতার ওঠানামার ফলে কণা-প্রতিকণা জোড়া বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ঋণাত্মক শক্তির কণা হরাইজনের ভেতরে প্রবেশ করে ব্ল্যাক হোলের ভর হ্রাস করে, অন্যদিকে ধনাত্মক কণাটি বাইরে ছিটকে আসে। একটি স্থিতিশীল ব্ল্যাক হোল থেকে কৃষ্ণবস্তুর মতো নির্গত এই তাপমাত্রাকে বলা হয় হকিং তাপমাত্রা (Hawking Temperature):

T_H = frac{hbar c^3}{8pi G M k_B} approx ৬.১৭ times ১০^{-৮} left(frac{M_odot}{M}right) text{ K}

যেহেতু তাপমাত্রা ভরের ব্যস্তানুপাতিক ($T_H propto 1/M$), তাই ব্ল্যাক হোলের আপেক্ষিক তাপ ঋণাত্মক (Negative Specific Heat): যত বেশি বিকিরণ নির্গত হয়, ব্ল্যাক হোল তত বেশি উত্তপ্ত হয় এবং বাষ্পীভবনের গতি বাড়ে। একটি সৌর ভরের ব্ল্যাক হোল সম্পূর্ণ বিলীন হতে সময় লাগে $tau_{text{evap}} approx ২.১ times ১০^{৬৭}text{ বছর}$।

৪. তথ্য কূটাভাস ও পেজ কার্ভ

যদি একটি বিশুদ্ধ কোয়ান্টাম অবস্থা ব্ল্যাক হোলে পতিত হওয়ার পর তা মিশ্র তাপীয় হকিং বিকিরণে পরিণত হয়ে শূন্যে বিলীন হয়, তবে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মৌলিক নীতি (Unitarity) ভেঙে পড়ে—সৃষ্টি হয় ব্ল্যাক হোল তথ্য কূটাভাস (Information Paradox)। ডন পেজ প্রমাণ করেন যে বাষ্পীভবন যদি এককত্ব রক্ষা করে, তবে বিকিরণের এনট্যাঙ্গলমেন্ট এন্ট্রপি একটি পেজ কার্ভ (Page Curve) অনুসরণ করবে: শুরুতে এন্ট্রপি বাড়লেও ‘পেজ টাইমে’ (যখন অর্ধেক ভর বাষ্পীভূত হয়) তা শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছাবে এবং পরবর্তীতে তা ধীরে ধীরে হ্রাস পেয়ে শূন্যে নেমে আসবে—অর্থাৎ সমস্ত তথ্য কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্টের মাধ্যমে মহাবিশ্বে পুনরুদ্ধার হবে।