১৯৭০ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৭১ সালের মার্চ—এই মাত্র ষোলটি মাস ছিল বাঙালির হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ। একদিকে প্রলয়ঙ্করী ভোলা ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ও পাকিস্তানি জান্তার চরম অমানবিকতা, অন্যদিকে ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের বিস্ময়কর গণরায়। কিন্তু ব্যালটের সেই ঐতিহাসিক বিজয়কে নস্যাৎ করতে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক চক্র যখন জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়, তখনই গর্জে ওঠে সমগ্র বাংলাদেশ। শুরু হয় অভূতপূর্ব অহিংস অসহযোগ আন্দোলন এবং ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে উচ্চারিত হয় বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ৭ই মার্চের ভাষণ—যা কার্যত পাকিস্তানের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়ে বাঙালি জাতিকে মুক্তির সশস্ত্র লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার ডাক দেয়।
১. ১৯৭০-এর প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও পাকিস্তানের চরম অবহেলা
১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর রাতে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট বিশ্বের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা ভয়াবহ ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় ‘ভোলা সাইক্লোন’ আঘাত হানে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে। বিশ ফুটেরও বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ভোলা ও পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ জনপদ মুহূর্তের মধ্যে সমুদ্রের অতলে তলিয়ে যায়। এক রাতেই প্রাণ হারায় আনুমানিক পাঁচ লক্ষ নিরীহ মানুষ।
এই জাতীয় মহাদুর্যোগের দিনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চরম বর্ণবাদী ও বিমাতাসুলভ রূপ নগ্নভাবে প্রকাশিত হয়। বিদেশি সাহায্য সংস্থাগুলো যখন ত্রাণ নিয়ে ছুটে আসছিল, তখন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান বেইজিং সফর শেষে ঢাকায় নেমে মাত্র কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে চলে যান। তিন সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও পশ্চিম পাকিস্তানে থাকা সামরিক হেলিকপ্টারগুলো উদ্ধারকাজে পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায় পাকিস্তানি জেনারেলরা। এই নারকীয় অবহেলায় ক্ষুব্ধ হয়ে প্রবীণ জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পল্টনের জনসভায় দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন: “আসসালামু আলাইকুম, পাকিস্তান!”
২. ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচন: ব্যালট বিপ্লব
ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতের ওপর দাঁড়িয়ে ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সমগ্র পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হয় প্রাপ্তবয়স্কদের সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ছয় দফার পক্ষে বাংলার জনগণ যে ঐতিহাসিক রায় প্রদান করে, তা বিশ্ব সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক পরম বিস্ময়:
- জাতীয় পরিষদ: পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ এককভাবে জয়লাভ করে ১৬৭টি আসনে। ফলে ৩১৩ আসনবিশিষ্ট পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে বঙ্গবন্ধু লাভ করেন নিরঙ্কুশ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
- প্রাদেশিক পরিষদ: পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের ৩০০টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ লাভ করে ২৮৮টি আসন।
- পশ্চিম পাকিস্তানের চিত্র: পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পায় ৮১টি আসন (মূলত পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে)।
গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সমগ্র পাকিস্তানের বৈধ নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা, সামন্ত প্রভু এবং ভুট্টোর সিন্ডিকেট কোনোভাবেই একজন বাঙালির কাছে শাসনক্ষমতা হস্তান্তর মেনে নিতে পারেনি।
৩. অধিবেশন স্থগিত ও ১ মার্চের বারুদ বিস্ফোরণ
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা করেন যে কোনো পশ্চিম পাকিস্তানি সংসদ সদস্য ঢাকায় গেলে তাঁর ঠ্যাং ভেঙে দেওয়া হবে এবং তিনি হুমকি দেন: “উধার তুম, ইধার হাম” (তোমরা ওপারে থাকো, আমরা এপারে শাসন করব)।
১৯৭১ সালের ১ মার্চ দুপুর ১টা ৫ মিনিটে ইয়াহিয়া খান আকস্মিকভাবে ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এই রেডিও ঘোষণার সাথে সাথে স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে ওঠে ঢাকা। কলকারখানা, অফিস-আদালত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখো জনতা রাজপথে নেমে স্লোগানে আকাশ কাঁপিয়ে তোলে: “বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো!” বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিকভাবে ঘোষণা করেন ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন।
২ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সমগ্র পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান সরকারের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। বিচারপতি, পুলিশ, সচিবালয়, ব্যাংক থেকে শুরু করে সমস্ত বেসামরিক প্রশাসন পরিচালিত হতে থাকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাসভবন থেকে। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রনেতারা উত্তোলন করেন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকা; ৩ মার্চ পল্টনে পাঠ করা হয় স্বাধীনতার ইশতেহার।
৪. ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ: মুক্তির মহাকাব্য
অসহযোগ আন্দোলনের সর্বোচ্চ শিখর স্পর্শ করে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ রোববার বিকেলে। বাঁশের লাঠি, লোহার রড আর স্বাধীনতার দৃপ্ত শপথ নিয়ে রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) সমবেত হয় দশ লক্ষাধিক মুক্তিকামী মানুষ। মাথার ওপর চক্কর দিতে থাকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সশস্ত্র হেলিকপ্টার।
সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর কালো মুজিব কোট পরিহিত বঙ্গবন্ধু দৃপ্ত পদক্ষেপে ডায়াসে উঠলেন। কোনো লিখিত কাগজ ছাড়াই একটানা ১৮ মিনিট ধরে তিনি যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন, তা ছিল একাধারে রণকৌশল, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং একটি জাতির মুক্তির মহাকাব্য:
“রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব—এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ! এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম! জয় বাংলা!”
— জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (৭ই মার্চ ১৯৭১)
বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের ভাষণে একদিকে চার দফা শর্ত দিয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখলেন যাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে গণহত্যা চালানোর আইনগত সুযোগ না পায়; অন্যদিকে প্রতিটি ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করার সুস্পষ্ট গেরিলা যুদ্ধের নির্দেশ দিলেন। ২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক ভাষণকে ‘মেমরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।
৫. প্রহসনের আলোচনা ও গণহত্যার নীলনকশা
বাঙালির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেখে ভীত ইয়াহিয়া খান ১৫ মার্চ ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনার নামে কালক্ষেপণ করতে। পরে তাঁর সাথে যোগ দেন ভুট্টো। কিন্তু এই তথাকথিত আলোচনা ছিল কেবলই এক ধূর্ত প্রতারণা। পর্দার অন্তরালে তখন পিআইএ-র বিমানে করে শ্রীলঙ্কা ঘুরে হাজার হাজার পাকিস্তানি সৈন্য ও অস্ত্র ঢাকায় নামানো হচ্ছিল।
১৮ মার্চ মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা এবং মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী যৌথভাবে প্রণয়ন করেন ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যার নীলনকশা—অপারেশন সার্চলাইট। ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় আলোচনার সমাপ্তি না টেনেই ইয়াহিয়া খান গোপনে করাচির উদ্দেশে বিমান ধরেন। ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী কালরাতের দিকে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- রহমান, শেখ মুজিবুর (২০১২)। অসমাপ্ত আত্মজীবনী। দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।
- রাঘবন, শ্রীনাথ (২০১৩)। ১৯৭১: আ গ্লোবাল হিস্ট্রি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
- সিসন ও রোজ (১৯৯০)। ওয়ার অ্যান্ড সেসেশন: পাকিস্তান, ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ। ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস।
- রাজা, খাদিম হোসেন (২০১২)। আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
- আহমেদ, সালাহউদ্দীন (২০০৪)। বাংলাদেশ: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।