উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের চরম অর্থনৈতিক শোষণের মাঝেও বাংলার মাটি জন্ম দিয়েছিল আধুনিক বিশ্বের অন্যতম মহিমান্বিত সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব: বাংলার নবজাগরণ (Bengal Renaissance)। প্রাচ্যের শাশ্বত আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদী দর্শনের এক যুগান্তকারী মিলনে এই নবজাগরণ প্রাচীন কুসংস্কার ও সামাজিক অন্ধত্বকে চূর্ণ করে দেয়। এই যুগেই সৃষ্টি হয় আধুনিক বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে ঘটে বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার এবং বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের মতো দুই অমর যুগপুরুষ—যাঁরা বাঙালির আত্মাকে চিরকালের জন্য স্বাধীন ও মুক্তমনা করে তুলেছিলেন।
১. রাজা রামমোহন রায়: আধুনিক ভারতের প্রাতঃস্মরণীয় পথিকৃৎ
বাংলার নবজাগরণের প্রথম আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করেছিলেন অনন্য মনীষী রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২–১৮৩৩)। সংস্কৃত, আরবি, ফার্সি, হিব্রু, গ্রিক ও ইংরেজি ভাষায় পণ্ডিত রামমোহন প্রমাণ করেছিলেন যে উপনিষদের মূল শিক্ষা হলো এক সর্বজনীন, নিরাকার ও যুক্তিবাদী একেশ্বরবাদ।
রামমোহনের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক বিজয় ছিল হিন্দু বিধবাদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারার বর্বরোচিত প্রথা সতীদাহ নিবারণ। তাঁর নিরলস শাস্ত্রীয় বিতর্ক ও সামাজিক আন্দোলনের মুখে গভর্নর-জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা উচ্ছেদ আইন পাস করতে বাধ্য হন। ১৮২৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাহ্মসমাজ, আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে ১৮১৭ সালে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখেন এবং দেশীয় সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষে ঐতিহাসিক লড়াই করেন—যে কারণে তাঁকে বলা হয় “আধুনিক ভারতের জনক”।
ইয়ং বেঙ্গল ও হেনরি ডিরোজিওর বিপ্লবী যৌবন
১৮২০-এর দশকে কলকাতার হিন্দু কলেজের তরুণ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শিক্ষক ও কবি হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও (১৮০৯–১৮৩১)-র অনুপ্রেরণায় গড়ে ওঠে তরুণ বুদ্ধিজীবীদের দল ইয়ং বেঙ্গল (Young Bengal)। মুক্তচিন্তা, অজ্ঞেয়বাদ এবং অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে তাঁদের আপসহীন বিদ্রোহ হিন্দু সমাজের গোঁড়া রীতিনীতির ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। ডিরোজিও শিখিয়েছিলেন সত্যকে কোনো প্রাচীন শাস্ত্রের অন্ধত্বে নয়, মানুষের নিজস্ব যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে বিচার করতে।
২. ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর: করুণার সিন্ধু ও সমাজ সংস্কারক
রামমোহন যদি নবজাগরণের তাত্ত্বিক হন, তবে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর (১৮২০–১৮৯১) ছিলেন এর আপসহীন কর্মবীর—বাঙালির চিরকালীন ‘দয়ার সাগর’। মেদিনীপুরের এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নিয়ে নিজ মেধা ও আত্মমর্যাদাবলে তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদে অধিষ্ঠিত হন।
তৎকালীন সমাজে অবুঝ শিশুকন্যাদের বিধবা হওয়ার পর যে অমানবিক নির্যাতন সহ্য করতে হতো, তা দেখে বিদ্যাসাগরের হৃদয় কেঁদে উঠেছিল। তিনি পরাশর সংহিতা ঘেঁটে প্রমাণ করেন যে শাস্ত্রে বিধবা বিবাহের স্পষ্ট অনুমতি রয়েছে। গোঁড়া সমাজের প্রাণনাশের হুমকি উপেক্ষা করে তিনি ১৮৫৬ সালের হিন্দু বিধবা বিবাহ আইন পাস করান। পাশাপাশি তিনি নারীশিক্ষার প্রসারে ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুনের সাথে কলকাতায় প্রথম বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং নিজ খরচে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্যকে সুবিন্যস্ত করেন এবং রচনা করেন বাঙালির মাতৃভাষা শিক্ষার আদিপাঠ বর্ণপরিচয়।
৩. বাংলা সাহিত্যের মহাবিস্ফোরণ: মধুসূদন থেকে বঙ্কিমচন্দ্র
নবজাগরণের ছোঁয়ায় বাংলা ভাষা মধ্যযুগীয় পয়ারের শৃঙ্খল ভেঙে আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের সমকক্ষ হয়ে ওঠে:
- মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪–১৮৭৩): এক ক্ষণজন্মা প্রতিভাবান বিদ্রোহী কবি। তিনি বাংলা কবিতায় প্রবেশ করান অমিত্রাক্ষর ছন্দ (ব্ল্যাঙ্ক ভার্স), চতুর্দশপদী কবিতা (সনেট) এবং পাশ্চাত্য ট্র্যাজেডি। তাঁর মহাকাব্য মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১)-এ রামায়ণের চরিত্রগুলোকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে উল্টে দিয়ে দেশপ্রেমিক বীর মেঘনাদকে এক ট্র্যাজিক মহাবীর হিসেবে তুলে ধরা হয়।
- বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৩৮–১৮৯৪): বাংলা উপন্যাসের জনক। দুর্গেশনন্দিনী, কপালকুণ্ডলা এবং আনন্দমঠ (১৮৮২) উপন্যাসের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা কথাসাহিত্যে বিপ্লব ঘটান। তাঁর রচিত বন্দে মাতরম্ গানটি সমগ্র ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল রণধ্বনিতে পরিণত হয়েছিল।
- মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭–১৯১২): উনিশ শতকের শ্রেষ্ঠ মুসলিম সাহিত্যিক। কারবালার বিষাদময় রক্তক্ষয়ী ইতিহাস নিয়ে রচিত তাঁর কালজয়ী উপন্যাস বিষাদ-সিন্ধু বাংলা সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় সম্পদ।
৪. বিজ্ঞানের রাজদরবারে বাঙালি: জগদীশচন্দ্র ও প্রফুল্লচন্দ্র
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে দুই বাঙালি বিজ্ঞানী প্রমাণ করেন যে ঔপনিবেশিক দাসত্ব বাঙালির প্রতিভাকে বেঁধে রাখতে পারে না:
- আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮–১৯৩৭): বেতার যোগাযোগ ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিশ্বনন্দিত জনক। ১৮৯৫ সালে কলকাতার টাউন হলে তিনি বিশ্বের প্রথম মাইক্রোওয়েভ ও মিলিমিটার তরঙ্গ (৬০ গিগাহার্টজ) ব্যবহার করে দেওয়াল ভেদ করে গানপাউডারে বিস্ফোরণ ঘটান—যা মারকোনির বহু পূর্বে সফল হয়েছিল। তিনি আবিষ্কার করেন ক্রেসকোগ্রাফ যন্ত্র, যার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে প্রাণীদের মতো উদ্ভিদেরও সংবেদনশীলতা ও ব্যথা অনুভবের ক্ষমতা রয়েছে।
- আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় (১৮৬১–১৯৪৪): ভারতীয় রসায়ন বিজ্ঞানের জনক। ১৮৯৬ সালে মার্কিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কার করে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হন। পরাধীন ভারতে যুবকদের পরনির্ভরশীলতা ঘোচাতে তিনি ১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বেঙ্গল কেমিক্যাল অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল ওয়ার্কস—যা ছিল ভারতবর্ষের প্রথম দেশীয় ওষুধ কারখানা।
৫. বিশ্বমহাকাশে দুই সূর্য: রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল
বাংলার নবজাগরণের মহোচ্চ শিখর ছিলেন দুই চিরন্তন কবি—যাঁরা বাঙালির আবেগের দুটি চোখ:
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১–১৯৪১): ১৯১৩ সালে তাঁর অমর কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলি-র জন্য তিনি প্রথম অ-ইউরোপীয় হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। বিশ্বের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথই একমাত্র কবি, যাঁর রচিত দুটি গান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে—বাংলাদেশের আমার সোনার বাংলা এবং ভারতের জনগণমন-অধিনায়ক।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯–১৯৭৬): চিরকালীন ‘বিদ্রোহী কবি’। ১৯২২ সালে প্রকাশিত তাঁর ধূমকেতুসম কবিতা বিদ্রোহী ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও শোষণের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে গর্জে উঠেছিল:
“বলো বীর—
বলো উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!”
— কাজী নজরুল ইসলাম, বিদ্রোহী (১৯২২)
নজরুল চার সহস্রাধিক গান রচনা করে বাংলা সঙ্গীতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ এবং নজরুলের আপসহীন সাম্যবাদী বিদ্রোহ—এই দুই শক্তির ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছে আধুনিক বাঙালির মুক্তির অবিনাশী চেতনা।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- সরকার, সুমিত (১৯৭০)। দ্য বেঙ্গল রেনেসাঁস অ্যান্ড আদার এসেজ। পিপলস পাবলিশিং হাউস।
- দত্ত ও রবিনসন (১৯৯৫)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: দ্য মিরিয়াড-মাইন্ডেড ম্যান। সেন্ট মার্টিন্স প্রেস।
- মুজফ্ফর আহমদ (১৯৬০)। কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা। ন্যাশনাল বুক এজেন্সি।
- সেন, অমিয় (১৯৯৩)। হিন্দু রিভাইভালিজম ইন বেঙ্গল: ১৮৭২–১৯০৫। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
- রায়, নীহাররঞ্জন (১৯৮২)। রবীন্দ্র-সাহিত্যের ভূমিকা। ডি. এম. লাইব্রেরি, কলকাতা।