১২০৪ খ্রিস্টাব্দে আফগানিস্তানের ঘোর অঞ্চলের খলজ উপজাতির এক দুঃসাহসী সামরিক অধিনায়ক, ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি, ঝাড়খণ্ডের দুর্গম অরণ্যপথ অতিক্রম করে মাত্র আঠারো জন অশ্বারোহী নিয়ে নদীয়া রাজপ্রাসাদে অতর্কিত প্রবেশ করেন। এই আকস্মিক আক্রমণ সেন বংশের শাসনকে স্তব্ধ করে দিয়ে বাংলার ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী নতুন যুগের সূচনা করে: বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা, লখনৌতিকে (গৌড়) কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং সুফি সাধকদের মানবিক দাওয়াতের মাধ্যমে বাংলার গ্রামীণ সমাজে এক নিঃশব্দ আধ্যাত্মিক বিপ্লব।

১. নদিয়ার সেই ঐতিহাসিক আক্রমণ (১২০৪ খ্রি.)

বখতিয়ার খলজির নদীয়া অভিযানের প্রত্যক্ষ বিবরণ পাওয়া যায় সমসাময়িক ফার্সি ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ জুযজানির বিখ্যাত গ্রন্থ তাবাকাত-ই-নাসিরী-তে। মিনহাজ বখতিয়ারের অভিযানের চার দশক পর লখনৌতি ভ্রমণ করে সেই অভিযানে অংশগ্রহণকারী প্রবীণ সৈনিকদের কাছ থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন:

“মুহম্মদ বখতিয়ার এত দ্রুত অগ্রসর হইয়াছিলেন যে মাত্র আঠারো জন অশ্বারোহী তাঁহার সঙ্গে তাল মিলাইতে পারিয়াছিল; মূল সৈন্যবাহিনী পশ্চাতে রহিয়া গিয়াছিল। নদীয়া নগরীর তোরণে পৌঁছিয়া তাঁহাদিগকে সাধারণ অশ্ব ব্যবসায়ী মনে করা হয়। তিনি দ্বিপ্রহরে প্রাসাদে প্রবেশ করিলেন, যখন রায় লক্ষ্মণসেন মধ্যাহ্নভোজনে উপবিষ্ট ছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে শোরগোল উঠিল যে তুর্কিরা আসিয়া পড়িয়াছে; তখন রায় লক্ষ্মণসেন পিছনের দরজা দিয়া নদীয়ার নদীপথে পূর্ববঙ্গের (বিক্রমপুর) অভিমুখে পলায়ন করিলেন…”
— মিনহাজ-ই-সিরাজ জুযজানি, তাবাকাত-ই-নাসিরী (১২৬০ খ্রি.)

ঔপনিবেশিক ঐতিহাসিকরা একে মাত্র আঠারো জন দিয়ে বাংলা জয়ের কাহিনি হিসেবে চিত্রিত করলেও আধুনিক ইতিহাসবিদরা দেখিয়েছেন যে এটি ছিল মূল রাজপ্রাসাদে একটি সুপরিকল্পিত গেরিলা কমান্ডো হামলা। রাজা লক্ষণসেন পালিয়ে গিয়ে পূর্ববঙ্গের সুরম্য দুর্গনগরী বিক্রমপুর-এ অবস্থান নেন। সেখানে লক্ষণসেন এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন আরও কয়েক দশক স্বাধীন হিন্দু রাজ্য পরিচালনা করেছিলেন।

২. লখনৌতি ও ‘বলঘাকপুর’-এর বিদ্রোহের ইতিহাস

বখতিয়ার খলজি উত্তর ও পশ্চিম বাংলার শাসনভার সুসংহত করে প্রাচীন লক্ষণাবতীর ধ্বংসাবশেষে গড়ে তোলেন নতুন রাজধানী লখনৌতি (পরবর্তীকালে যা গৌড় নামে পরিচিত হয়)। তিনি সেখানে বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও সরাইখানা নির্মাণ করেন।

পরবর্তী প্রায় দেড়শত বছর বাংলা ছিল দিল্লির সুলতানদের জন্য সবচেয়ে কঠিন ও অশান্ত প্রদেশ। গিয়াসউদ্দিন বলবন থেকে শুরু করে আলাউদ্দিন খলজি এবং মুহম্মদ বিন তুঘলক পর্যন্ত দিল্লির পরাক্রমশালী শাসকরা বারবার বাংলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। বাংলার সুবিশাল নদীনালা এবং বছরের ছয় মাস বর্ষার প্লাবন দিল্লির অশ্বারোহী বাহিনীর চলাচলে দুর্লঙ্ঘ্য বাধা সৃষ্টি করত। ফলে এখানকার সুবাদাররা প্রায়শই দিল্লির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে নিজেদের নামে মুদ্রা চালু করতেন। এই কারণে সমসাময়িক দিল্লির ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানি লখনৌতির নাম দিয়েছিলেন বলঘাকপুর—যার অর্থ “বিদ্রোহের শহর”।

৩. সুফি সাধকদের আধ্যাত্মিক বিপ্লব

লখনৌতির দুর্গগুলো যখন সামরিক শাসন পরিচালনা করছিল, তখন বাংলার বিস্তীর্ণ প্রত্যন্ত জনপদে ইসলাম ও মানবতার প্রচার ঘটিয়েছিলেন সুদূর মধ্য এশিয়া, পারস্য ও আরব থেকে আগত সুফি ও দরবেশগণ। তাঁদের অহিংস জীবনধারা, মানবপ্রেম এবং বর্ণভেদহীন সাম্যের বার্তা তৎকালীন জাতপাতের যাতাকলে পিষ্ট বাংলার অবহেলিত সাধারণ মানুষকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে:

  • হজরত শাহ জালাল (র.) (১৩০৩ খ্রি.): ইয়েমেন থেকে ৩৬০ জন আউলিয়া সঙ্গী নিয়ে তিনি শ্রীহট্টে (সিলেট) আগমন করেন এবং অত্যাচারী রাজা গৌর গোবিন্দকে পরাজিত করেন। তাঁর দরগাহ ও খানকা উত্তর-পূর্ব বাংলার শিক্ষা, সংস্কার ও আধ্যাত্মিকতার প্রধান কেন্দ্রে রূপ নেয়।
  • খান জাহান আলী (র.) ও বাগেরহাটের খলিফাতাবাদ: পঞ্চদশ শতকে সুফি যোদ্ধা ও প্রশাসক হযরত খান জাহান আলী সুন্দরবনের গহীন বনভূমি পরিষ্কার করে গড়ে তোলেন খলিফাতাবাদ নগর রাষ্ট্র। তিনি লবণাক্ত ও রোগপীড়িত উপকূলীয় জনগণের জন্য শত শত মিষ্টি পানির বিশালাকার দিঘি খনন করেন এবং বিশ্বখ্যাত ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ষাট গম্বুজ মসজিদ সহ তিন শতাধিক নান্দনিক মসজিদ নির্মাণ করেন।
  • বাবা আদম শহীদ (বিক্রমপুর) ও মখদুম শাহ দৌলা (শাহজাদপুর, পাবনা): যাঁরা ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার তীরে প্রথম মুসলিম বসতি স্থাপন ও সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে নেতৃত্ব দেন।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে এই সুফি দরবেশরা কেবল ধর্মপ্রচারক ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন অরণ্যজয়ী কৃষি-উদ্যোক্তা। তাঁরা নদী অববাহিকায় বন কেটে নতুন কৃষিভূমি সৃষ্টি করেছিলেন, সেখানে গড়ে তুলেছিলেন মসজিদভিত্তিক গ্রামীণ সমাজ। এই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বাংলার নদী ও মাটির সাথে ইসলামী জীবনবোধের এক শাশ্বত মেলবন্ধন রচিত হয়।


প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • মিনহাজ-ই-সিরাজ জুযজানি (১২৬০)। তাবাকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদ: আবদুল করিম)। বাংলা একাডেমি।
  • ইটন, রিচার্ড এম. (১৯৯৩)। দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার। ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস।
  • করিম, আবদুল (১৯৫৯)। সোশ্যাল হিস্ট্রি অব দ্য মুসলিমস ইন বেঙ্গল। এশিয়াটিক সোসাইটি।
  • বারানি, জিয়াউদ্দিন। তারিখ-ই-ফিরুজ শাহী। বিবলিওথেকা ইন্ডিকা।