১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্জিত স্বাধীনতার রক্তিম প্রভাত বাঙালির জন্য নিয়ে এসেছিল যেমন অপার গর্ব ও আনন্দ, তেমনই এক চরম অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ শেষে বাংলাদেশ তখন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে—শূন্য রাজকোষ, বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা, মাইন পোঁতা সমুদ্রবন্দর এবং এক কোটি গৃহহারা ছিন্নমূল শরণার্থী। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুরু করেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের এক মহাকাব্যিক সংগ্রাম। কিন্তু পরবর্তী তিন দশক দেশকে অতিক্রম করতে হয়েছে একের পর এক রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি ও রাজনৈতিক ঝড়: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে সপরিবারে জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ড, জিয়া ও এরশাদের দীর্ঘ সামরিক শাসন, ১৯৯০-এর ঐতিহাসিক স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং একই সাথে তৈরি পোশাক শিল্প (RMG) ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের গ্রামীণ ব্যাংকের হাত ধরে গ্রামীণ অর্থনীতির এক অবিশ্বাস্য নীরব বিপ্লব।

১. বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ১৯৭২-এর সংবিধান

আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। রেসকোর্স ময়দানে অশ্রুসিক্ত নয়নে লাখো জনতার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এমন এক দেশের, যাকে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা উপহাস করে বলত “তলাবিহীন ঝুড়ি” (Bottomless Basket)।

মাত্র দশ মাসের এক অবিশ্বাস্য স্বল্প সময়ের মধ্যে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে প্রণীত হয় আধুনিক বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানবিক সংবিধান—১৯৭২ সালের গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। এই সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূল স্তম্ভ নির্ধারণ করা হয়:

  • জাতীয়তাবাদ: ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ।
  • সমাজতন্ত্র: শোষণমুক্ত ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও সম্পদের সুষম বণ্টন।
  • গণতন্ত্র: মৌলিক মানবাধিকার, আইনের শাসন ও সার্বজনীন ভোটাধিকার।
  • ধর্মনিরপেক্ষতা: সকল ধর্মের সমান অধিকার ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সহাবস্থান।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের মার্চের মধ্যেই ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সমস্ত সেনাকে স্বদেশে ফেরত পাঠান, মাত্র তিন বছরে বিশ্বের ১৩০টিরও বেশি দেশের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি আদায় করেন এবং ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে বাংলায় প্রথম ভাষণ দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে অধিষ্ঠিত করেন।

২. যুদ্ধোত্তর সংকট ও ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডি

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি যখন বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ১৯৭৪-এর প্রলয়ঙ্করী বন্যার কারণে চরম দুর্ভিক্ষের মুখে পড়ে, তখন অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি দমনে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের শুরুতে একদলীয় শাসনকাঠামো বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠা করে দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন।

কিন্তু এই সামাজিক পরিবর্তনের সুফল ঘরে তোলার পূর্বেই নেমে আসে ইতিহাসের সবচেয়ে নারকীয় কালো রাত। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালরাতে একদল বিপথগামী সেনাসদস্য ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে বর্বরোচিত হামলা চালায়। ঘাতকরা সপরিবারে হত্যা করে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তিন পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল ও দশ বছরের নিষ্পাপ শিশু শেখ রাসেলকে। বিদেশে অবস্থানের কারণে অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান কেবল তাঁর দুই কন্যা—শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

এর মাত্র আড়াই মাস পর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দি অবস্থায় হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতাকে—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে।

৩. সামরিক শাসন: জিয়াউর রহমান থেকে এইচ এম এরশাদ

১৫ আগস্টের বিয়োগান্তক ঘটনার পর অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। জিয়া সংবিধানে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে ধর্মীয় মূল্যবোধ সংযোজন করেন, “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”-এর ধারণা প্রবর্তন করেন, প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক (SAARC) গঠনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন।

১৯৮২ সালের মার্চে এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরশাদের দীর্ঘ আট বছরের শাসনামলে তিনি স্থানীয় সরকারে ‘উপজেলা ব্যবস্থা’ প্রবর্তন করেন এবং সংবিধানে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেন, কিন্তু তাঁর স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দিন দিন তীব্রতর হতে থাকে।

৪. ১৯৯০-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান ও গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার

স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আশির দশক জুড়ে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা (১৫ দলীয় জোট) এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া (৭ দলীয় জোট)। ১৯৯০ সালের শেষভাগে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতৃত্বে এই আন্দোলন রূপ নেয় ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে।

নাজির উদ্দিন জেহাদ এবং চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম খান মিলনের আত্মত্যাগে সমগ্র বাংলাদেশ অচল হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরশাসক এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ-এর নেতৃত্বে গঠিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় অবাধ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন। দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে পুনরায় সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

৫. তৃণমূলের আর্থ-সামাজিক বিস্ময়: পোশাক শিল্প ও ক্ষুদ্রঋণ

নব্বইয়ের দশকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও বাংলাদেশের মেহনতি মানুষ এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর ঘটিয়ে বিশ্ববাসীকে চমকে দেয়:

  • তৈরি পোশাক শিল্পের (RMG) মহাবিপ্লব: আশির দশকে দেশ গার্মেন্টসের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ পরিণত হয় চীনের পর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশে। এই খাতে কর্মসংস্থান হয় চল্লিশ লক্ষাধিক মানুষের—যার সিংহভাগই গ্রামীণ নারী। পোশাক শিল্প বাংলার রক্ষণশীল গ্রামীণ সমাজে নারীর ক্ষমতায়ন ও আত্মমর্যাদায় এক বিশাল সামাজিক নীরব বিপ্লব ঘটায়।
  • ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রামীণ ব্যাংক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রমাণ করেন যে দরিদ্র মানুষ ঋণখেলাপি নয়, বরং জামানতহীন ক্ষুদ্রঋণ তাদের দারিদ্র্য জয়ের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তাঁর প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংক বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয় এবং ২০০৬ সালে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক যৌথভাবে লাভ করেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার। একই সাথে স্যার ফজলে হাসান আবেদের প্রতিষ্ঠিত ব্র্যাক (BRAC) পরিণত হয় পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায়।
  • বাংলাদেশ প্যারাডক্স: রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও বাংলাদেশ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও মানব উন্নয়নে ভারত ও পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে শিশুমৃত্যু হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীর সমতা অর্জনে বিশ্বে এক রোল মডেলে পরিণত হয়।

প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • লিফশুলৎজ, লরেন্স (১৯৭৯)। বাংলাদেশ: দি আনফিনিশড রেভোলিউশন। জেড প্রেস, লন্ডন।
  • মনিরুজ্জামান, তালুকদার (১৯৮২)। দ্য বাংলাদেশ রেভোলিউশন অ্যান্ড ইটস আফটারম্যাথ। ইউপিএল।
  • ইউনূস, মুহাম্মদ (১৯৯৯)। ব্যাংকার টু দ্য পুওর। পাবলিক অ্যাফেয়ার্স, নিউ ইয়র্ক।
  • সেন, অমর্ত্য ও জঁ দ্রোজ (২০১৩)। ভারত: উন্নয়ন ও বঞ্চনা। আনন্দ পাবলিশার্স।
  • আহমেদ, মওদুদ (১৯৯৫)। গণতন্ত্র এবং চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট। ইউপিএল।