১৯৪০ থেকে ১৯৫০—এই একটি দশক ছিল বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে সংঘাতময়, রক্তাপ্লুত ও ট্র্যাজিক অধ্যায়। ১৯৪০ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক উত্থাপন করেন ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব, যা প্রাচ্যে স্বাধীন সার্বভৌম ‘রাষ্ট্রসমূহ’ গঠনের রূপরেখা দিয়েছিল। এর মাত্র তিন বছর পর উইনস্টন চার্চিলের ঔপনিবেশিক নীতির বলি হয়ে ১৯৪৩ সালের পঞ্চাশের মন্বন্তরে অনাহারে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায় প্রায় চল্লিশ লক্ষ নিরীহ বাঙালি। ১৯৪৬-এর দাঙ্গা এবং অখণ্ড স্বাধীন বাংলা গড়ার শেষ স্বপ্নের অপমৃত্যুর পর ১৯৪৭ সালের আগস্টে এক ব্রিটিশ আইনজীবীর কলমের খোঁচায় ঘটে দেশভাগের মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি—যা বাংলার বুক চিরে কোটি মানুষের রক্ত ও চোখের জলে এক চিরস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি করেছিল।
১. ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব ও শেরে বাংলা
১৯৩০-এর দশকের শেষভাগে বাংলার রাজনীতিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় জননায়ক ছিলেন কৃষক-প্রজা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। প্রজাস্বত্ব আইন ও মহাজনি ঋণ সালিশি বোর্ড গঠন করে তিনি বাংলার লক্ষ লক্ষ ঋণগ্রস্ত কৃষক পরিবারকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের লাহোর অধিবেশনে লক্ষাধিক মানুষের সামনে ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন বাংলার শেরে বাংলা। প্রস্তাবের মূল অংশে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক ভাষায় বলা হয়েছিল:
“নিখিল ভারত মুসলিম লীগের এই অধিবেশনের সুচিন্তিত অভিমত এই যে… ভৌগোলিকভাবে সংলগ্ন এলাকাগুলোকে অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করিতে হইবে; যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, যেমন ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চল, সেই অঞ্চলগুলোকে এমনভাবে পুনর্গঠিত করিতে হইবে যাহাতে গঠিত ইউনিটগুলো হইবে ‘স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রসমূহ’ (Independent States)।”
— লাহোর প্রস্তাবের মূল বয়ান (২৩ মার্চ ১৯৪০)
লাহোর প্রস্তাবে ব্যবহৃত বহুবচন “States” (রাষ্ট্রসমূহ) কথাটি ছিল বাঙালির ভবিষ্যৎ স্বাধীনতার বীজ। এতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা ও আসাম হবে একটি সম্পূর্ণ পৃথক, সার্বভৌম ও স্বাধীন রাষ্ট্র—যা উত্তর-পশ্চিমের পাঞ্জাব বা সিন্ধুর অধীনস্থ হবে না। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে দিল্লির কনভেনশনে জিন্না ও মুসলিম লীগ হাইকমান্ড কূটকৌশলে “States”-এর জায়গায় একক “State” বানিয়ে দিয়েছিলেন—যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক পটভূমি তৈরি করে।
২. চার্চিলের মানবসৃষ্ট মহামারী: ১৯৪৩-এর মন্বন্তর
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে ১৯৪৩ সালে বাংলায় নেমে আসে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের এক কালরাত: বাংলা ১৩৫০ সালের পঞ্চাশের মন্বন্তর। আধুনিক গবেষক এবং নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন অকাট্য প্রমাণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে এই দুর্ভিক্ষ ফসলের অভাবে নয়, বরং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের বর্ণবাদী ও নিষ্ঠুর যুদ্ধনীতির প্রত্যক্ষ কারণে ঘটেছিল।
১৯৪২ সালে জাপানিরা বার্মা দখল করলে ব্রিটিশরা বাংলায় সম্ভাব্য জাপানি অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ‘পোড়ামাটি নীতি’ বা ডেনায়েল পলিসি গ্রহণ করে। তারা উপকূলীয় অঞ্চলের ২৫ হাজারের বেশি ধান ও খাদ্য পরিবহনের নৌকা জ্বালিয়ে দেয় এবং সমস্ত শস্য বাজেয়াপ্ত করে। একই সাথে ব্রিটিশ যুদ্ধ মন্ত্রিসভা অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা জাহাজের গম ক্ষুধার্ত বাংলায় না দিয়ে ভূমধ্যসাগরে তাদের ইউরোপীয় সৈন্যদের জন্য গুদামজাত করে রাখে। ভাইসরয় ওয়াভেলের বারবার পাঠানো ত্রাণের আবেদন চার্চিল নিষ্ঠুরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
এর ফলে কলকাতার রাজপথ থেকে শুরু করে বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লক্ষ মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে ধুঁকে ধুঁকে মারা যায়। ফুটপাতে কঙ্কালসার মায়ের শুকনো স্তন চিবিয়ে দুধের শিশুর মৃত্যুর সেই মর্মান্তিক দৃশ্য কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলের অভিজাত ভোজের পাশেই উন্মোচিত হয়েছিল। এই নারকীয় মানবসৃষ্ট ট্র্যাজেডিকে বিশ্ববাসীর চোখে চিরতরে তুলে ধরেছিলেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। সস্তা প্যাকিং কাগজের ওপর চাইনিজ কালির মোটা টানে আঁকা তাঁর দুর্ভিক্ষ চিত্রমালা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক মহাকাব্যিক চিত্রদলিল।
৩. সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ‘অখণ্ড স্বাধীন বাংলা’র স্বপ্নভঙ্গ
১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট মুসলিম লীগের ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ (ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে)-এর দিনে কলকাতায় শুরু হয় স্মরণকালের সবচেয়ে নারকীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা—গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং। বাহাত্তর ঘণ্টায় পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয় এবং এই রক্তক্ষয় নোয়াখালী, ত্রিপুরা ও বিহারে ছড়িয়ে পড়ে। নোয়াখালীতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে মহাত্মা গান্ধী নগ্নপদে হেঁটে গ্রামে গ্রামে শান্তি মিশন পরিচালনা করেন।
এই রক্তাক্ত সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার মাঝেও বাংলার হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক অস্তিত্ব রক্ষায় এক অনন্য সাহসী উদ্যোগ নিয়েছিলেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, প্রখ্যাত কংগ্রেস নেতা শরৎচন্দ্র বসু (নেতাজির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা) এবং মুসলিম লীগের প্রগতিশীল নেতা আবুল হাশিম। ১৯৪৭ সালের মে মাসে তাঁরা যৌথভাবে উত্থাপন করেন অখণ্ড স্বাধীন বাংলা পরিকল্পনা (United Independent Bengal):
“বাংলা হইবে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও অখণ্ড রাষ্ট্র। ভারতীয় ইউনিয়নের সাথে বা পাকিস্তানের সাথে বাংলা কী সম্পর্ক রাখিবে, তাহা স্বাধীন বাংলার জনগণ নির্ধারণ করিবে… হাজার বছরের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি হিন্দু-মুসলিম কোনো বহিরাগত দূরবর্তী শক্তির ক্রীড়নক হইবে না।”
— শরৎ বসু–সোহরাওয়ার্দী চুক্তি (২০ মে ১৯৪৭)
মুহাম্মদ আলী জিন্না এই প্রস্তাবে শর্তসাপেক্ষে সম্মতি জানালেও জওহরলাল নেহরু ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস হাইকমান্ড এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে। তাঁরা জানিয়ে দেন যে ভারত ভাগ হলে বাংলা এবং পাঞ্জাবকেও ধর্মের ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত করতে হবে।
৪. ১৯৪৭-এর রক্তক্ষয়ী দেশভাগ ও ছিন্নমূল কান্না
সাত কোটি বাঙালির ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয় এক ব্রিটিশ আইনজীবী স্যার সিরিল র্যাডক্লিফ-কে, যিনি এর আগে কোনোদিন ভারতে পা রাখেননি। তীব্র গরমে মাত্র ৩৬ দিনে পুরোনো আদমশুমারি ও মানচিত্রের ওপর লাল কালির দাগ টেনে তিনি বিভক্ত করে দেন হাজার বছরের এক অখণ্ড ভূগোল।
১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট রাতারাতি জন্ম নেয় দুটি দেশ। বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়: হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ চলে যায় ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে, আর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ (পূর্ব পাকিস্তান) পরিণত হয় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরের পাকিস্তানের এক বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে।
লাখ লাখ বাঙালি রাতারাতি শরণার্থীতে পরিণত হয়। ভিটেমাটি ফেলে শিয়ালদহ স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আশ্রয় নেওয়া শত শত হিন্দু পরিবার আর ওপার থেকে আসা মুসলিম মুহাজিরদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে বাংলার আকাশ-বাতাস। হাজার বছরের এক অভিন্ন সংস্কৃতি কাঁটাতারের বেড়ায় বন্দি হলো। কিন্তু দেশভাগের প্রথম দিন থেকেই পূর্ববঙ্গের সচেতন মানুষ বুঝতে পেরেছিল: সাদা চামড়ার ব্রিটিশদের বিদায় দিয়ে তারা কেবল লাভ করেছে পশ্চিম পাকিস্তানি খাকি উর্দির এক নতুন ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- সেন, অমর্ত্য (১৯৮১)। পভার্টি অ্যান্ড ফ্যামিন্স। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
- মুখার্জি, মধুশ্রী (২০১০)। চার্চিলস সিক্রেট ওয়ার। বেসিক বুকস।
- চ্যাটার্জি, জয়া (১৯৯৪)। বেঙ্গল ডিভাইডেড: হিন্দু কমিউনালাইজম অ্যান্ড পার্টিশন। কেমব্রিজ।
- হাশিম, আবুল (১৯৭৪)। ইন রেট্রোস্পেক্ট। মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
- মনসুর আহমদ, আবুল (১৯৬৯)। আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর। নওরোয কিতাবিস্তান।