একাদশ শতাব্দীর শেষভাগে দীর্ঘ চারশত বছরের বৌদ্ধ পাল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। এই শূন্যতায় দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আগত এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধা রাজবংশ বাংলার শাসনভার গ্রহণ করে: সেন রাজবংশ (আনু. ১০৯৭–১২০৪ খ্রি.)। নিজেদের ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’ বলে দাবি করা সেন রাজারা বাংলায় পুনরায় বৈদিক ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুজ্জীবন ঘটান। সমাজ সংস্কারের নামে কঠোর বর্ণভেদ ও কৌলীন্য প্রথা প্রতিষ্ঠা করার পাশাপাশি তাঁরা নবদ্বীপের রাজদরবারে সংস্কৃত সাহিত্যের এক স্বর্ণযুগ সৃষ্টি করেছিলেন—যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কবি জয়দেব ও তাঁর অমর সৃষ্টি গীতগোবিন্দ।

১. কর্ণাটক থেকে বাংলায় আগমন ও বিজয়সেনের উত্থান

একাদশ শতকে দক্ষিণ ভারতের কল্যাণীর চালুক্য অথবা চোল রাজাদের সামরিক অভিযানের সূত্র ধরে সেন বংশের পূর্বপুরুষরা বাংলায় আগমন করেন। রাঢ় অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারী এই পরিবারের আদিপুরুষ সামন্তসেন শেষ জীবনে গঙ্গার তীরে তপস্বী হিসেবে জীবনযাপন করেন। কিন্তু তাঁর পৌত্র বিজয়সেন (শাসনকাল আনু. ১০৯৭–১১৬০ খ্রি.) নিজ সামরিক প্রতিভাবলে সমগ্র বাংলায় সেন আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন।

রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে আবিষ্কৃত এবং সভাকবি উমাপতিধর রচিত বিখ্যাত দেওপাড়া প্রশস্তি-তে বিজয়সেনের দিগ্বিজয়ের মহাকাব্যিক বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে:

“যিনি বীর, নান্য, বর্ধন ও রাঘবকে পরাজিত করিয়াছিলেন; যিনি গৌড়রাজকে পলায়নে বাধ্য করিয়াছিলেন এবং কামরূপ ও কলিঙ্গ জয় করিয়াছিলেন… সেই মহারাজ বিজয়সেন মেরু পর্বতের শিখরের ন্যায় আকাশচুম্বী এক সুরম্য প্রদ্যুম্নেশ্বর শিবমন্দির নির্মাণ করিলেন।”
— দেওপাড়া শিলালিপি (১২শ শতক)

বিজয়সেন দুর্বল পাল রাজাদের বিতাড়িত করে বরেন্দ্র, গৌড়, রাঢ় ও বঙ্গ অঞ্চলকে নিজের অধীনে এনে এক অখণ্ড সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন এবং উত্তরবঙ্গে বিজয়পুর ও পূর্ববঙ্গে বিক্রমপুরে দুটি রাজধানী স্থাপন করেন।

২. বল্লালসেন ও কৌলীন্য প্রথার কঠোর শাসন

বিজয়সেনের পর সিংহাসনে আরোহণ করেন তাঁর মহাপণ্ডিত পুত্র বল্লালসেন (শাসনকাল আনু. ১১৬০–১১৭৯ খ্রি.)। বল্লালসেন নিজে ছিলেন একাধারে সুশাসক ও শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত। তিনি দুটি বিখ্যাত সংস্কৃত আকরগ্রন্থ রচনা করেন: দানসাগর (ধর্মীয় দান-ধ্যানের নিয়মাবলী) এবং অদ্ভুতসাগর (জ্যোতির্বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক লক্ষণের সংকলন, যা পরে তাঁর পুত্র শেষ করেন)।

বল্লালসেনের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত সংস্কার ছিল কৌলীন্য প্রথা-র প্রবর্তন। চার শতাব্দীর বৌদ্ধ সাম্যবাদী ভাবধারা মুছে ফেলে কঠোর বৈদিক সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে তিনি ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বৈদ্য সম্প্রদায়কে বিভিন্ন স্তরে বিভক্ত করেন। নয়টি বিশেষ গুণের (আচার, বিনয়, বিদ্যা, প্রতিষ্ঠা, তীর্থদর্শন, নিষ্ঠা, বৃত্তি, তপ ও দান) অধিকারী বংশগুলোকে ‘কুলীন’ মর্যাদা দেওয়া হয়।

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এই কৌলীন্য প্রথা বাংলায় এক চরম সামাজিক অভিশাপে রূপ নেয়। কুলমর্যাদা রক্ষার জন্য বহুবিবাহ, বৃদ্ধের সাথে শিশুকন্যার বিবাহ এবং তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষদের ওপর বর্ণবাদী অত্যাচারের এক অন্ধকার যুগ নেমে আসে।

৩. লক্ষণসেনের রাজদরবার ও পঞ্চরত্ন সাহিত্যিক

বল্লালসেনের পুত্র লক্ষণসেন (শাসনকাল আনু. ১১৭৯–১২০৪ খ্রি.) পরিণত বয়সে সিংহাসনে বসেন। যুদ্ধজয়ের পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল সমগ্র ভারতে। নবদ্বীপের (নদীয়া) রাজদরবারে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পঞ্চরত্ন নামে পরিচিত পাঁচজন শ্রেষ্ঠ সংস্কৃত সাহিত্যিকের এক অনন্য পরিষদ:

  • কবি জয়দেব: সংস্কৃত সাহিত্যের অমর গীতিকাব্য গীতগোবিন্দ-এর রচয়িতা। রাধা ও কৃষ্ণের প্রেমলীলা নিয়ে রচিত এই কাব্যের সুর ও ছন্দ বাংলার বৈষ্ণব সাহিত্যের প্রাণপ্রতিষ্ঠা করেছিল।
  • ধোয়ী: লক্ষণসেনের সভাকবি যিনি কালিদাসের মেঘদূতের অনুকরণে রচনা করেন বিখ্যাত দূতকাব্য পবনদূত।
  • উমাপতিধর, শরণ ও গোবর্ধন: উচ্চমানের ধ্রুপদী সংস্কৃত কবি। গোবর্ধন রচনা করেছিলেন আর্যাসপ্তশতী।
  • শ্রীধরদাস: লক্ষণসেনের রাজকর্মচারী যিনি ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে রচনা করেন বিখ্যাত সংস্কৃত কবিতা সংকলন সদুক্তিকর্ণামৃত, যেখানে প্রাচীন ভারতের ৪৮৫ জন কবির ২,৩৭০টি শ্লোক সংরক্ষিত হয়েছে।

৪. সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও পতনের পদধ্বনি

রাজদরবারে সাহিত্যের আলোকচ্ছটা থাকলেও সেন সাম্রাজ্যের সামাজিক ভিত্তি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া বর্ণব্যবস্থার কারণে সাধারণ কৃষক, তাঁতি, জেলে এবং পদদলিত বৌদ্ধরা রাষ্ট্র থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। উচ্চবর্ণের ক্ষুদ্র অভিজাতদের সাথে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর এই আত্মিক দূরত্বের কারণেই ত্রয়োদশ শতাব্দীর শুরুতে মাত্র কয়েকজন অশ্বারোহী যোদ্ধার আগমনেই সেন সাম্রাজ্যের স্তম্ভ তাসের ঘরের মতো কেঁপে উঠেছিল।


প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • মজুমদার, রমেশচন্দ্র (১৯৪৩)। হিস্ট্রি অব বেঙ্গল: ১ম খণ্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
  • কিলহর্ন, এফ. (১৮৯২)। দ্য দেওপাড়া ইনস্ক্রিপশন অব বিজয়সেন। এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা।
  • চক্রবর্তী, মনোমোহন (১৯০৬)। সংস্কৃত লিটারেচার ইন বেঙ্গল ডিউরিং দ্য সেনা পিরিয়ড। এশিয়াটিক সোসাইটি।
  • রায়, নীহাররঞ্জন (১৯৪৯)। বাঙালীর ইতিহাস: আদি পর্ব। বুক এম্পোরিয়াম, কলকাতা।