পলাশীর যুদ্ধের করুণ পরিণতির পর বাংলায় সূচিত হয় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রায় এক শতাব্দী দীর্ঘ চরম অর্থনৈতিক লুণ্ঠন, ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন বা ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প ধ্বংস এবং মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয়। ১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে বিজয়ের পর ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে রবার্ট ক্লাইভ আদায় করেন দেওয়ানি সনদ, যার মধ্য দিয়ে কায়েম হয় কুখ্যাত ‘দ্বৈত শাসন’। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় কোম্পানির এই নির্দয় রাজস্ব শোষণের ফলে ঘটে ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা ভয়ঙ্কর ছিয়াত্তরের মন্বন্তর (১৭৭০ খ্রি.)—যেখানে এক কোটি নিরপরাধ মানুষ অনাহারে মৃত্যুবরণ করে। কিন্তু বাংলার মানুষ এই অন্যায় দাসত্বকে নীরবে মেনে নেয়নি; ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে তিতুমীরের ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লা, সাঁওতাল হুল এবং ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ পর্যন্ত বাংলার প্রতিটি ধূলিকণা রঞ্জিত হয়েছিল প্রতিরোধের রক্তে।
১. ১৭৬৫-র দেওয়ানি লাভ ও ‘বাংলার লুণ্ঠন’
১৭৬৪ সালের অক্টোবর মাসে বক্সারের যুদ্ধে বাংলার সাবেক নবাব মীর কাসিম, অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলা এবং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সম্মিলিত বাহিনীকে পরাজিত করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অপ্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তিতে পরিণত হয়। ১৭৬৫ সালের ১২ আগস্ট এলাহাবাদের এক তাবু দরবারে সম্রাট শাহ আলম ব্রিটিশ কোম্পানির লর্ড ক্লাইভের হাতে চিরস্থায়ী দেওয়ানি সনদ তুলে দিতে বাধ্য হন—যার ফলে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সমস্ত রাজস্ব আদায়ের একচ্ছত্র মালিকানা চলে যায় ইংরেজদের হাতে।
ক্লাইভ প্রতিষ্ঠা করেন কুখ্যাত দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা: সমস্ত রাজস্ব আদায় ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা চলে যায় ইংরেজদের হাতে, কিন্তু জনগণের জানমালের সুরক্ষা ও প্রশাসনের কোনো দায়িত্ব তারা নেয়নি; আর নামমাত্র পুতুল নবাবের ওপর থাকে দায়িত্ব, কিন্তু একটি পয়সাও রাজস্বের অধিকার থাকে না। কোম্পানির রাজস্ব আদায় ছিল দানবীয়: খাজনা দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয় এবং লবণ ও চালের মতো মৌলিক পণ্যের ব্যবসা ইংরেজরা একচেটিয়া করে নেয়। এর ফলে কোটি কোটি পাউন্ডের সম্পদ বাংলা থেকে পাচার হয়ে সরাসরি লন্ডনে চলে যায়—যাকে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন “সম্পদ পাচার” (Drain of Wealth)।
২. ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের মহাপ্রলয় (১৭৭০ খ্রি.)
১৭৬৯ সালে অনাবৃষ্টির কারণে ফসলের ক্ষতি হলে কোম্পানির নির্দয় কর আদায়ের মুখে নেমে আসে এশিয়ার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহতম কৃত্রিম মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষ: বাংলা ১১৭৬ সালের ছিয়াত্তরের মন্বন্তর। খাজনা মওকুফ কিংবা প্রজাদের সাহায্য করার পরিবর্তে কোম্পানির কর্মকর্তারা বেয়নেট ঠেকিয়ে অনাহারক্লিষ্ট কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায় করে এবং চালের মজুত গড়ে তুলে কৃত্রিম সংকটের মাধ্যমে কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়।
এর পরিণতি ছিল বীভৎস। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে বাংলার মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ—প্রায় এক কোটি মানুষ—অনাহারে ও মহামারীতে তিলে তিলে মারা যায়। গ্রামকে গ্রাম জনমানবহীন শ্মশানে পরিণত হয়, ধানক্ষেতগুলো বিরান জঙ্গলে রূপ নেয় এবং ভাগীরথী, পদ্মা ও বুড়িগঙ্গার পানিতে ভেসে যায় লাখ লাখ বেওয়ারিশ লাশ। এত বিপুল মানুষের মৃত্যুর পরও কোম্পানির পরিচালক বোর্ড লন্ডনে গর্ব করে চিঠি লিখেছিল যে, এক-তৃতীয়াংশ প্রজা মারা গেলেও ১৭৭১ সালে পূর্ববর্তী বছরের চেয়েও বেশি খাজনা আদায় করা হয়েছে!
৩. লর্ড কর্নওয়ালিস ও ১৭৯৩-এর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত
একটি অনুগত ভূস্বামী শ্রেণি তৈরি এবং প্রতি বছর নির্দিষ্ট রাজস্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৭৯৩ সালে গভর্নর-জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলায় জারি করেন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এই আইনের মাধ্যমে বাংলার গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার শিকড় উপড়ে ফেলা হয়:
- ঐতিহ্যবাহী খাজনা আদায়কারী এবং কোম্পানির সুবিধাভোগী দালালদের ভূমির চিরস্থায়ী মালিক বা জমিদার বানিয়ে দেওয়া হয়।
- যে সাধারণ কৃষকরা হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরায় মাটির প্রকৃত মালিক ছিল, রাতারাতি তারা পরিণত হয় জমিদারের ইচ্ছাধীন ক্ষমতাহীন প্রজাতে। তাঁদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় নানাবিধ অবৈধ কর (আবওয়াব) এবং মহাজনের চড়া সুদের শৃঙ্খল।
- জমিদার যদি বছরের নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পূর্বে ব্রিটিশ কালেক্টরের কাছে নির্দিষ্ট খাজনা জমা দিতে ব্যর্থ হতো, তবে তার জমিদারি নিলামে বিক্রি করে দেওয়া হতো (সূর্যাস্ত আইন)। এর ফলে কলকাতায় জন্ম নেয় এক নতুন পরজীবী ‘অনুপস্থিত জমিদার’ (Absentee Landlord) শ্রেণি, যাদের সাথে বাংলার মাটির কোনো আত্মিক সম্পর্ক ছিল না।
৪. গ্রামীণ সশস্ত্র প্রতিরোধ: ফকির-সন্ন্যাসী থেকে তিতুমীর
এই অসহনীয় ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষক সমাজ বারবার অস্ত্র তুলে নেয়:
- ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬৩–১৮০০): মজনু শাহ, ভবানী পাঠক এবং দেবী চৌধুরানীর নেতৃত্বে সন্ন্যাসী ও ফকিররা উত্তরবঙ্গের অরণ্য থেকে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করেন। তাঁরা ইংরেজদের কুঠি আক্রমণ করতেন, অস্ত্র ও শস্য লুট করে ক্ষুধার্ত কৃষকদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন।
- তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা (১৮৩১ খ্রি.): চব্বিশ পরগনার নারকেলবাড়িয়ায় সৈয়দ মীর নিসার আলী (তিতুমীর) ইংরেজ নীলকর এবং জমিদার কৃষ্ণদেব রায়ের মতো অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে বাংলার কৃষক সমাজকে সংগঠিত করেন। তিনি কৃষকদের ওপর আরোপিত অন্যায় দাড়ি কাটার কর প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেন এবং নারকেলবাড়িয়ায় তৈরি করেন বিখ্যাত বাঁশের কেল্লা। সেখানে তিনি স্বাধীন সরকার ঘোষণা করেন। ১৮৩১ সালের ১৯ নভেম্বর ব্রিটিশ মেজর স্কটের নেতৃত্বে পরিচালিত ভারী কামান ও আধুনিক রাইফেলের আক্রমণে তিতুমীর বীর বিক্রমে যুদ্ধ করে শহীদ হন।
- ফরায়েজি আন্দোলন: ফরিদপুরে হাজী শরীয়তুল্লাহ এবং তাঁর পুত্র দুদু মিয়া-র নেতৃত্বে কৃষকদের সংঘবদ্ধ করে ঘোষণা করা হয়: “সমস্ত জমির প্রকৃত মালিক মহান আল্লাহ; কোনো জমিদারের অধিকার নেই আল্লাহর জমিনের ওপর অন্যায় কর চাপানোর।”
- সাঁওতাল হুল (১৮৫৫ খ্রি.): রাজমহল পাহাড়ের চার বীর ভাই—সিধু, কানু, চাঁদ ও ভৈরব-এর নেতৃত্বে হাজার হাজার সাঁওতাল আদিবাসী তীর-ধনুক নিয়ে ইংরেজ ও মহাজনদের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী বিদ্রোহ গড়ে তোলে।
৫. বাংলায় ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ ও লালবাগ দুর্গের যুদ্ধ
পলাশীর ঠিক একশত বছর পর ভারতীয় সিপাহি ও জনতার দীর্ঘ পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ফেটে পড়ে ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বা সিপাহি বিপ্লবে। এই মহাবিপ্লবের প্রথম স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠেছিল বাংলার মাটিতেই: ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ কলকাতার নিকটবর্তী ব্যারাকপুর সেনানিবাসে ৩৪তম বেঙ্গল নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির বীর সিপাহি মঙ্গল পাণ্ডে ইংরেজ অফিসারদের বিরুদ্ধে প্রথম গুলি চালিয়ে ডাক দেন মুক্তির লড়াইয়ের।
এই বিদ্রোহ দ্রুত পূর্ব বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। ১৮৫৭ সালের ২২ নভেম্বর ঢাকার লালবাগ কেল্লা-য় অবস্থানরত ৭৩তম নেটিভ ইনফ্যান্ট্রির বাঙালি ও ভারতীয় সিপাহিরা ব্রিটিশ বাহিনীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। লালবাগের প্রাঙ্গণে সংঘটিত হয় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। বহু সিপাহি শহীদ হন এবং বন্দি ৪১ জন মুক্তিকামী সিপাহিকে ঢাকার আন্টাঘর ময়দানে (বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্ক / ভিক্টোরিয়া পার্ক) প্রকাশ্যে গাছের ডালে ঝুলিয়ে ফাঁসি দিয়ে ইংরেজরা এক নারকীয় ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করে। যদিও সামরিক শক্তিতে এই বিদ্রোহ দমন করা হয়, কিন্তু এর ফলেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একশত বছরের শোষণমূলক শাসনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে এবং ব্রিটিশ রানি সরাসরি ভারতের শাসনভার গ্রহণ করতে বাধ্য হন।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- হান্টার, উইলিয়াম উইলসন (১৮৬৮)। দ্য অ্যানালস অব রুরাল বেঙ্গল। লন্ডন।
- চন্দ্র, বিপান (১৯৬৬)। দ্য রাইজ অ্যান্ড গ্রোথ অব ইকোনমিক ন্যাশনালিজম ইন ইন্ডিয়া। নতুন দিল্লি।
- গুহ, রণজিৎ (১৯৮৩)। এলিমেন্টারি অ্যাসপেক্টস অব পিজেন্ট ইনসার্জেন্সি ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া। অক্সফোর্ড।
- সেন, সুরেন্দ্রনাথ (১৯৫৭)। এইটিন ফিফটি-সেভেন। ভারত সরকার।
- ভদ্র, গৌতম (১৯৮৩)। মুঘল যুগে কৃষি-অর্থনীতি ও কৃষক বিদ্রোহ। সুবর্ণরেখা, কলকাতা।