পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে মধ্যযুগীয় বাংলার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ তার সর্বোচ্চ চূড়ায় উপনীত হয়। এই স্বর্ণযুগের মহান রূপকার ছিলেন হোসেন শাহী রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (শাসনকাল ১৪৯৪–১৫১৯ খ্রি.)। সমসাময়িক কবি ও ঐতিহাসিকদের কাছে নৃপতি-তিলক এবং জগৎ-ভূষণ অভিধায় অভিষিক্ত এই সুলতান বাংলায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন অনন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি। তাঁর দরবারেই প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা ও সাহিত্য রাজকীয় মর্যাদায় ভূষিত হয়, নবদ্বীপে সূচনা ঘটে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রেমধর্মের বৈষ্ণব মহাজাগরণ এবং বাংলার মাটিতে রচিত হয় ছোট সোনা মসজিদ ও বাঘা মসজিদের মতো অমর স্থাপত্যকলা।
১. আলাউদ্দিন হোসেন শাহের উত্থান ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা
পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দশকে হাবশি (আবিসিনীয়) ক্রীতদাস ও প্রাসাদরক্ষীদের একের পর এক ষড়যন্ত্র ও হত্যাকাণ্ডে লখনৌতির সালতানাত চরম সংকটে পড়েছিল। ১৪৯৪ সালে সুলতানের বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ আলাউদ্দিন হোসেন অভিজাত হিন্দু-মুসলিম নাগরিক ও সৈনিকদের ঐক্যবদ্ধ সমর্থনে হাবশি শাসক মোজাফফর শাহকে উৎখাত করে সিংহাসনে আরোহণ করেন।
সিংহাসনে বসেই হোসেন শাহ দুর্নীতিগ্রস্ত প্রাসাদরক্ষী বাহিনীকে ভেঙে দেন, রাজধানী গৌড়ে কঠোর শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং আসামের কামতা রাজ্য ও উড়িষ্যার গজপতি রাজাদের আগ্রাসন প্রতিহত করে বাংলার সীমান্ত সুরক্ষিত করেন। তিনি ঘোষণা করেন যে তাঁর দরবারে কোনো সম্প্রদায় বা জাতপাতের ভিত্তিতে নয়, শুধুমাত্র মেধার ভিত্তিতে উচ্চপদে নিয়োগ দেওয়া হবে।
২. বাংলা সাহিত্যের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা
হোসেন শাহী আমলের সবচেয়ে অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক অবদান ছিল মাতৃভাষা বাংলাকে রাজকীয় সাহিত্যের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা। তৎকালীন রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ সংস্কৃতে বিশ্বাসী ছিল এবং বাংলায় রামায়ণ-মহাভারত চর্চাকে পাপ মনে করত (এমনকি সংস্কৃত প্রবাদ ছিল: “অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানি চ / ভাষায়াং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ”—অর্থাৎ যে বাংলায় পুরাণ শুনবে সে রৌরব নরকে যাবে)। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ও তাঁর সেনাপতিরা এই সামাজিক কুসংস্কার চূর্ণ করে বাংলা অনুবাদের দরজা উন্মুক্ত করে দেন:
- মহাভারতের বাংলা অনুবাদ: চট্টগ্রামের সুবাদার লস্কর পরাগল খানের নির্দেশে মহাকবি কবীন্দ্র পরমেশ্বর রচনা করেন মহাভারতের প্রথম বাংলা সংক্ষিপ্ত সংস্করণ—পাণ্ডববিজয়। পরবর্তীতে পরাগল খানের পুত্র ছুটি খানের পৃষ্ঠপোষকতায় কবি শ্রীকর নন্দী রচনা করেন মহাভারতের অশ্বমেধ পর্বের অনুবাদ।
- শ্রীকৃষ্ণবিজয় ও গুণরাজ খান: প্রখ্যাত বাঙালি কবি মালাধর বসুকে সুলতান ভূষিত করেছিলেন গুণরাজ খান এবং তাঁর পুত্রকে সত্যরাজ খান রাজকীয় উপাধিতে।
- বিজয় গুপ্ত ও মনসামঙ্গল: সুলতানের সুবিচারের প্রশংসা করে মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ কবি বিজয় গুপ্ত তাঁর মনসামঙ্গল কাব্যে লিখেছেন:
“সুলতান হোসেন শাহা নৃপতি-তিলক / তঁহার পালনে প্রজা সুখে থাকে লোক / যেমন অর্জুন রাজা তেমনি সুন্দর / সকল গুণের নিধি ধর্মাবতার…”
— বিজয় গুপ্ত, মনসামঙ্গল (আনু. ১৪৯৫ খ্রি.)
৩. শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু ও গৌড়ীয় বৈষ্ণব বিপ্লব
সুলতান হোসেন শাহের শাসনামলে নদীয়ার নবদ্বীপে আবির্ভূত হন বিশ্বখ্যাত আধ্যাত্মিক যুগপুরুষ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু (১৪৮৬–১৫৩৪ খ্রি.)। সংকীর্তনের মাধ্যমে ধনী-দরিদ্র, ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল ও হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সর্বজনীন প্রেমের বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে তিনি প্রাচীন জাতপাতভিত্তিক বর্ণবাদের শিকড় কাঁপিয়ে দেন।
রক্ষণশীল ব্যক্তিরা নবদ্বীপে চৈতন্যদেবের সংকীর্তনের বিরুদ্ধে তৎকালীন মুসলিম প্রশাসকের কাছে অভিযোগ জানালে সুলতান হোসেন শাহ এক ঐতিহাসিক রাজকীয় ফরমান জারি করেন: “চৈতন্যদেবকে তাঁহার ধর্মপ্রচারে কোনো বাধা দেওয়া যাইবে না; তিনি স্বাধীনভাবে যেখানে ইচ্ছা হরিনাম প্রচার করিতে পারিবেন।” সুলতানের মন্ত্রিসভার দুই প্রভাবশালী শীর্ষ কর্মকর্তা—দবীর খাস (অর্থমন্ত্রী) ও সাকর মল্লিক (প্রধান সচিব)—সুলতানের চাকরি ত্যাগ করে চৈতন্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন এবং বৈষ্ণব দর্শনে অমর হয়ে ওঠেন রূপ গোস্বামী ও সনাতন গোস্বামী নামে।
৪. স্থাপত্যের অনন্য রত্ন: ছোট সোনা ও বাঘা মসজিদ
হোসেন শাহী আমলের শান্তি ও ধনসম্পদের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষর বহন করে তৎকালীন অনন্য পোড়ামাটি ও পাথরের ইসলামিক স্থাপত্য:
- ছোট সোনা মসজিদ (গৌড়): ওয়ালী মোহাম্মদ নামক এক রাজকর্মকর্তা কর্তৃক নির্মিত এই মসজিদটি ছিল হোসেন শাহী যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি। কালো ব্যাসল্ট পাথর ও সূক্ষ্ম লতাপাতার খোদাইকাজে সুসজ্জিত এই মসজিদের পনেরোটি গম্বুজে স্বর্ণের পাত মোড়ানো ছিল, যা সূর্যের আলোয় সোনার মতো ঝলমল করত বলেই এর নাম হয়েছিল ‘ছোট সোনা মসজিদ’।
- বাঘা মসজিদ (রাজশাহী): ১৫২৩ সালে হোসেন শাহের পুত্র সুলতান নুসরাত শাহ কর্তৃক নির্মিত। এর বাইরের দেয়ালে খোদাই করা অনন্য পোড়ামাটির ফলকে ডালিম গাছ, পদ্মফুল ও ময়ূরের দৃশ্য বাংলার নিজস্ব লোকশিল্পের জয়গান ঘোষণা করে।
৫. পর্তুগিজদের পদার্পণ: ইউরোপীয় বাণিজ্যের সূত্রপাত
হোসেন শাহের শাসনের শেষভাগে বাংলার বঙ্গোপসাগরে প্রথমবারের মতো আগমন ঘটে ইউরোপীয় পর্তুগিজ নাবিকদের। ১৫১৮ সালে জোয়াও দে সিলভেইরার নেতৃত্বে একদল পর্তুগিজ চট্টগ্রামে পদার্পণ করে। বাংলার রেশম, সুতিবস্ত্র ও মসলার বিশাল বাণিজ্য প্রত্যক্ষ করে পর্তুগিজরা চট্টগ্রামকে নাম দেয় পোর্তো গ্রান্দে (Porto Grande / বৃহৎ বন্দর) এবং হুগলির সাতগাঁও বন্দরকে নাম দেয় পোর্তো পেকেনো (Porto Pequeno / ক্ষুদ্র বন্দর)। এর মধ্য দিয়ে বাংলার মাটিতে সূচিত হয় ইউরোপীয় বণিকদের প্রথম পদচিহ্ন—যা দুই শতাব্দী পরে এক নতুন বৈশ্বিক সাম্রাজ্যিক সংঘাতের পটভূমি তৈরি করেছিল।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- তরফদার, মমতাজুর রহমান (১৯৬৫)। হোসেন শাহী বেঙ্গল (১৪৯৪–১৫৩৮)। এশিয়াটিক সোসাইটি অব পাকিস্তান।
- ইটন, রিচার্ড এম. (১৯৯৩)। দ্য রাইজ অব ইসলাম অ্যান্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার। ক্যালিফোর্নিয়া প্রেস।
- সেন, দীনেশচন্দ্র (১৯১১)। হিস্ট্রি অব বেঙ্গলি ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড লিটারেচার। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়।
- ক্যাম্পোস, জে. জে. এ. (১৯১৯)। হিস্ট্রি অব দ্য পর্তুগিজ ইন বেঙ্গল। বাটারওয়ার্থ, কলকাতা।