বিংশ শতাব্দীর প্রথম চার দশক বাংলাকে পরিণত করেছিল ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্নিগর্ভ রণক্ষেত্রে। ১৯০৫ সালে সাম্রাজ্যবাদী ভাইসরয় লর্ড কার্জন প্রশাসনিক সুবিধার মিথ্যা অজুহাতে বাংলাকে হিন্দু-মুসলিম বিভেদের ভিত্তিতে বিভক্ত করার কুখ্যাত ষড়যন্ত্র আঁটেন। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে বাংলার লক্ষ কোটি মানুষ, সৃষ্টি হয় ঐতিহাসিক স্বদেশী আন্দোলন এবং জন্ম নেয় একদল দুঃসাহসী সশস্ত্র বিপ্লবী—যাঁদের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন মাস্টারদা সূর্য সেন। ১৯৩০ সালের ঐতিহাসিক চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণ-এর মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেওয়া এই বিপ্লবীদের আত্মত্যাগ এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু-র আপসহীন নেতৃত্ব ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল।
১. কার্জনের বিভেদনীতি ও ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গ
১৯০০ সালের দিকে ব্রিটিশ শাসকরা অনুভব করে যে শিক্ষিত ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন বাঙালি বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ই ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র সচিব এইচ. এইচ. রিজলি এক গোপন নোটে লিখেছিলেন: “ঐক্যবদ্ধ বাংলা একটি মহাশক্তি; বিভক্ত বাংলা বিভিন্ন দিকে টানাটানি করবে… আমাদের অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো আমাদের শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এই ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে দ্বিখণ্ডিত ও দুর্বল করে দেওয়া।”
১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জন বাংলাকে বিভক্ত করেন: মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল নিয়ে গঠিত হয় পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ (রাজধানী ঢাকা) এবং অপর অংশ থাকে পশ্চিমবঙ্গ (রাজধানী কলকাতা)। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতৃত্ব—বিশেষ করে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ—এই সিদ্ধান্তকে পূর্ববঙ্গের অনুন্নত জনগণের অর্থনৈতিক ও শিক্ষা প্রসারের সুযোগ হিসেবে স্বাগত জানান। কিন্তু কলকাতার জাতীয়তাবাদী নেতারা একে বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র আন্দোলনের ডাক দেন।
২. স্বদেশী আন্দোলন ও মুসলিম লীগের জন্ম
বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সমগ্র বাংলায় শুরু হয় এক উত্তাল গণআন্দোলন—স্বদেশী আন্দোলন। ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বাংলায় পালিত হয় অরন্ধন দিবস। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে রাজপথে নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ; কবি রচনা করেন তাঁর অমর গান “আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” এবং হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের প্রতীক হিসেবে হাতে পরিয়ে দেওয়া হয় রাখি।
এই আন্দোলনে শুরু হয় বিলিতি পণ্য বর্জন, ম্যানচেস্টারের কাপড় ও লিভারপুলের লবণে অগ্নিসংযোগ এবং নিজস্ব তাঁতশিল্প ও সাবান তৈরির দেশীয় কারখানা স্থাপন।
একই সাথে পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের রাজনৈতিক অধিকার সুরক্ষার তাগিদে নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে ১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার শাহবাগে অনুষ্ঠিত হয় সর্বভারতীয় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলন। ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর এই ঐতিহাসিক সম্মেলনেই প্রতিষ্ঠিত হয় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ—যা চার দশক পরে ভারতীয় উপমহাদেশের মানচিত্র নতুন করে এঁকেছিল।
তুমুল গণআন্দোলন ও বিপ্লবী সন্ত্রাসের মুখে টিকতে না পেরে ১৯১১ সালের ডিসেম্বরে দিল্লির দরবারে সম্রাট পঞ্চম জর্জ বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করেন এবং ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তর করেন। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ক্ষুব্ধ পূর্ববঙ্গের মুসলিমদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্রিটিশরা ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—যা পরবর্তীকালে পরিণত হয় বাঙালির সমস্ত আত্মমর্যাদা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বাতিঘরে।
৩. সশস্ত্র বিপ্লব: অনুশীলন সমিতি ও মাস্টারদা সূর্য সেন
সংবিধান মেনে আবেদনের রাজনীতিতে আস্থা হারিয়ে বাংলার হাজার হাজার তরুণ সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নেয়। ঢাকায় পুলিন বিহারী দাসের অনুশীলন সমিতি এবং কলকাতায় বাঘা যতীনের যুগান্তর দল গোপনে বোমা তৈরি ও ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেটদের হত্যায় নিয়োজিত হয়।
সশস্ত্র বিপ্লবের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় রচিত হয় ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের মাটিতে। শিক্ষকতার কারণে যিনি সবার প্রিয় মাস্টারদা নামে পরিচিত ছিলেন, সেই মহানায়ক সূর্য সেন-এর নেতৃত্বে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি-র বিপ্লবীরা এক অবিশ্বাস্য দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন:
- ১৮ এপ্রিল রাতে বিপ্লবীরা একসাথে দামপাড়া পুলিশ অস্ত্রাগার, অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগার, টেলিগ্রাফ ভবন দখল করেন এবং রেললাইন কেটে দিয়ে চট্টগ্রামকে বাকি বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
- অস্ত্রাগার দখল করে জাতীয় পতাকা উত্তোলনপূর্বক মাস্টারদা সূর্য সেন ঘোষণা করেন স্বাধীন ভারতের প্রথম অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার।
- ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর শত শত সুসজ্জিত সেনাকে পর্যুদস্ত করেন মাত্র কয়েকজন তরুণ বিপ্লবী। এই যুদ্ধে টেগরা (হরিগোপাল বল), ত্রিপুরা সেন সহ বারো জন কিশোর বিপ্লবী বীরের মতো শাহাদাত বরণ করেন।
- বীরাঙ্গনা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার: ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পাহাড়তলী ইউরোপীয় ক্লাবে (যেখানে লেখা থাকত: “কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ”) সফল সশস্ত্র অভিযান চালান মাস্টারদার স্নেহধন্যা ২১ বছর বয়সী বিপ্লবী নারী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। আহত অবস্থায় ইংরেজদের হাতে বন্দিত্ব এড়াতে তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন এবং হন ভারতের প্রথম নারী শহীদ।
১৯৩৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে মাস্টারদা গ্রেপ্তার হন। অমানুষিক নির্যাতন করে তাঁর দাঁত ও নখ উপড়ে ফেলার পর ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি মধ্যরাতে চট্টগ্রাম কারাগারে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তাঁর মরদেহ লোহার খাঁচায় ভরে গোপনে বঙ্গোপসাগরের অতল জলে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর এই আত্মত্যাগ সমগ্র ভারতবর্ষের যুবসমাজকে মুক্তির আগুনে প্রজ্বলিত করে তোলে।
৪. নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অগ্নিপথ
বাংলার আরেক বিশ্বকাঁপানো সন্তান ছিলেন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু (১৮৯৭–১৯৪৫)। ১৯৩৮ ও ১৯৩৯ সালে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে তিনি আপসহীন সংগ্রামের ডাক দেন। গান্ধীর অহিংস নীতির সাথে মতভেদের কারণে তিনি পদত্যাগ করে ফরোয়ার্ড ব্লক গঠন করেন।
ইংরেজরা তাঁকে কলকাতায় গৃহবন্দি করলে ১৯৪১ সালের জানুয়ারিতে তিনি পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে এক মহাকাব্যিক অন্তর্ধান সম্পন্ন করেন। ছদ্মবেশে কাবুল ও মস্কো হয়ে তিনি বার্লিনে পৌঁছান এবং সাবমেরিনে পাড়ি দিয়ে সিঙ্গাপুরে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি গড়ে তোলেন ৬০ হাজার সেনার আজাদ হিন্দ ফৌজ (INA) এবং ডাক দেন: “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব!” ১৯৪৪ সালে আজাদ হিন্দ ফৌজ বার্মা সীমান্ত পার হয়ে মনিপুরের মৈরাংয়ে স্বাধীন ভারতের ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা উত্তোলন করে। এই সংগ্রামের পরই ব্রিটিশরা বুঝতে পারে যে ভারতীয় সেনাদের বন্দুক দিয়ে আর ভারতবর্ষ শাসন করা অসম্ভব।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- সরকার, সুমিত (১৯৭৩)। দ্য স্বদেশী মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল: ১৯০৩–১৯০৮। নতুন দিল্লি।
- গর্ডন, লিওনার্ড এ. (১৯৯০)। ব্রাদার্স এগেইনস্ট দ্য রাজ: শরৎ ও সুভাষচন্দ্র বসু। ভাইকিং।
- চক্রবর্তী, গণেশ (১৯৭৪)। সূর্য সেন ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন। সাহিত্য সংসদ, কলকাতা।
- রায়, রজতকান্ত (১৯৮৪)। সোশ্যাল কনফ্লিক্ট অ্যান্ড পলিটিক্যাল আনরেস্ট ইন বেঙ্গল। অক্সফোর্ড।