ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগে শের শাহ সুরির সাম্রাজ্য এবং মুঘল সম্রাট আকবরের উত্থানের মধ্যবর্তী দ্বন্দ্বে স্বাধীন বাংলা সালতানাত চূড়ান্ত সংকটের মুখোমুখি হয়। ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে শেষ আফগান সুলতান দাউদ খান কররানীর পতনের পর মুঘলরা আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাকে তাদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা করে। কিন্তু কাগজ-কলমে বাংলা জয় হলেও প্রায় চার দশক ধরে মুঘলদের অগ্রযাত্রাকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে রেখেছিল বাংলার এক অপরাজেয় দেশপ্রেমিক শক্তি: বারো ভূঁইয়া। সোনারগাঁয়ের শাসক ঈসা খাঁ মসনদ-ই-আলা-র নেতৃত্বে হিন্দু ও মুসলিম জমিদারদের এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ নদীমাতৃক গেরিলা যুদ্ধের মাধ্যমে আকবরের শ্রেষ্ঠ সেনাপতিদের বারবার পরাজিত করেছিল—যতক্ষণ না সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতী ১৬১০ সালে ঢাকা-কে রাজধানী বানিয়ে এই প্রদেশকে বশীভূত করেন।

১. সুর সাম্রাজ্যের উত্থান ও কররানী সালতানাতের পতন

১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে দূরদর্শী আফগান সেনাপতি শের শাহ সুরি সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহকে পরাজিত করে বাংলাকে সুর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। বাংলার অতুলনীয় কৃষি ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে শের শাহ যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করেন। তিনি মেঘনা নদীর তীরের প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁও থেকে সিন্ধু নদের তীরের পেশোয়ার/অ্যাটক পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ মহাসড়ক সড়ক-ই-আজম (গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড) সম্প্রসারিত করেন এবং দ্রুতগামী ঘোড়ার ডাকচৌকি স্থাপন করেন।

সুর বংশের পতনের পর কররানী আফগান রাজবংশ বাংলায় শাসন কায়েম রাখে। কিন্তু শেষ শাসক দাউদ খান কররানী সম্রাট আকবরের আনুগত্য প্রত্যাখ্যান করে নিজের নামে মুদ্রা চালু করলে ১৫৭৬ সালের জুলাই মাসে রাজমহলের প্রান্তরে মুঘল সেনাপতি মুনিম খানের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। দাউদ খান পরাজিত ও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। বাংলা আনুষ্ঠানিকভাবে মুঘল সাম্রাজ্যের ১৯তম সুবাহ হিসেবে ঘোষিত হলেও মূল প্লাবনভূমি মুঘলদের নিয়ন্ত্রণের বাইরেই থেকে যায়।

২. ঈসা খাঁ ও বারো ভূঁইয়াদের ঐতিহাসিক প্রতিরোধ

বর্ষাকালে পূর্ববঙ্গের নদীমাতৃক অঞ্চল ‘ভাটি’ ছিল ঘোড়সওয়ার মুঘল বাহিনীর জন্য এক ভয়াল মৃত্যুফাঁদ। এই ভূপ্রাকৃতিক সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে বারো জন স্বাধীনচেতা স্থানীয় নৃপতি বা বারো ভূঁইয়া মুঘল আধিপত্যের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এই প্রতিরোধের প্রধান প্রাণপুরুষ ছিলেন সোনারগাঁও ও ভাটি অঞ্চলের অধিপতি ঈসা খাঁ মসনদ-ই-আলা।

সম্রাট আকবরের রাজদরবারের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর অমর গ্রন্থ আকবরনামা-য় ঈসা খাঁর অপরাজেয় নৌবাহিনীর বিশদ বিবরণ দিয়েছেন:

“ভাটির মহাপরাক্রমশালী জমিদার ঈসা খাঁ তাঁহার চতুষ্পার্শ্বের সমস্ত সামন্তকে বশীভূত করিয়াছিলেন… তাঁহার অধীনে ছিল অসংখ্য রণতরী সংবলিত এক সুবিশাল নৌবাহিনী (নওয়ারা)। ইহার সাহায্যে তিনি রাজকীয় মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজ স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখিয়াছিলেন। শুষ্ক সমতলে অশ্বারোহী যুদ্ধ করিতে অভ্যস্ত মুঘল সেনারা ভাটির অজস্র নদী, নালা ও প্লাবিত জলমগ্ন প্রান্তরে কিছুই করিয়া উঠিতে পারিত না।”
— আবুল ফজল, আকবরনামা (১৫৯৮ খ্রি.)

আকবর তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রাজপুত সেনাপতি রাজা মানসিংহ-কে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করে পাঠালে ঈসা খাঁ নদীমাতৃক গেরিলা যুদ্ধে মুঘল বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন। ১৫৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে বিক্রমপুরের নিকটবর্তী মেঘনা নদীর ত্রিমোহনায় এক মহাকাব্যিক নৌযুদ্ধে ঈসা খাঁ ও মাসুম খান কাবুলি মুঘল নৌবহর সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেন। এই যুদ্ধে মানসিংহের প্রিয় পুত্র দুর্জন সিংহ নিহত হন এবং মুঘলরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। কথিত আছে, মল্লযুদ্ধে মানসিংহের তরবারি ভেঙে গেলে ঈসা খাঁ তাঁকে নিরস্ত্র অবস্থায় হত্যা না করে নিজের তরবারি এগিয়ে দিয়েছিলেন—যে মহানুভবতায় মুগ্ধ হয়ে মানসিংহ ঈসা খাঁর জীবিতাবস্থায় আর পূর্ববঙ্গে হামলা চালাননি।

৩. সুবাদার ইসলাম খাঁ চিশতী ও রাজধানী ঢাকার পত্তন (১৬১০ খ্রি.)

সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীর সুবাহ বাংলাকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে তাঁর বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ সেনাপতি ইসলাম খাঁ চিশতী-কে ১৬০৮ সালে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। ইসলাম খাঁ বুঝতে পেরেছিলেন যে ঘোড়া দিয়ে বাংলায় জয় সম্ভব নয়; বাংলার জলযুদ্ধ জয়ের জন্য প্রয়োজন সুবিশাল মুঘল নৌবাহিনী (নওয়ারা)।

ভারী কামানবাহী ঘুরাব ও দ্রুতগামী কোষা নৌকা নিয়ে গঠিত বিশাল নৌবহর প্রস্তুত করে ইসলাম খাঁ একে একে বারো ভূঁইয়াদের দুর্গ আক্রমণ করেন। তিনি ঈসা খাঁর পুত্র মুসা খাঁ, যশোরের প্রতাপাদিত্য এবং শ্রীপুরের কেদার রায়কে পরাজিত করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন।

এই নদীমাতৃক সামরিক অভিযান সফলভাবে পরিচালনা করতে এবং বঙ্গোপসাগরের পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের প্রতিহত করার লক্ষ্যে ইসলাম খাঁ ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে রাজমহল থেকে রাজধানী সরিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দরে স্থানান্তর করেন—যার নাম ঢাকা। সম্রাট জাহাঙ্গীরের সম্মানার্থে এর নতুন নামকরণ করা হয় জাহাঙ্গীরনগর। ১৬১০ সালের এই ঐতিহাসিক ক্ষণ থেকেই আধুনিক বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে রাজধানী ঢাকার গৌরবময় চারশত বছরের ইতিহাসের সূচনা ঘটে।


প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • আবুল ফজল (১৫৯৮)। আকবরনামা (অনুবাদ: এইচ. বিভারিজ)। এশিয়াটিক সোসাইটি।
  • মির্জা নাথান (১৬৩০)। বাহারিস্তান-ই-গায়বি (অনুবাদ: এম. আই. বোরাহ)। আসাম সরকার।
  • করিম, আবদুল (১৯৯২)। হিস্ট্রি অব বেঙ্গল: মুঘল পিরিয়ড (১ম খণ্ড)। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
  • সরকার, যদুনাথ (১৯৪৮)। দ্য হিস্ট্রি অব বেঙ্গল: ২য় খণ্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।