সপ্তদশ শতাব্দী জুড়ে বাংলা পরিণত হয়েছিল বিশাল মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে মূল্যবান রত্নে। রাজকীয় ফার্সি সনদে জান্নাতুল বিলাদ (“দেশসমূহের স্বর্গ”) হিসেবে অভিহিত সুবাহ বাংলা ছিল সমকালীন অ-পশ্চিমা বিশ্বের সর্বাপেক্ষা ধনী ও শিল্পোন্নত প্রদেশ। সমগ্র মুঘল সাম্রাজ্যের মোট রাজস্বের প্রায় অর্ধেকের জোগানদাতা এবং বৈশ্বিক শিল্পোৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশের উৎপাদক হিসেবে বাংলা পরিণত হয়েছিল বিশ্বের সর্বপ্রধান বস্ত্রশিল্পের কর্মশালায়। রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে সুবাদার মীর জুমলা ও শায়েস্তা খাঁর শাসনামলে বাংলা উপভোগ করেছিল অতুলনীয় নাগরিক প্রাচুর্য, সমুদ্র উপকূলের জলদস্যুমুক্ত শান্তি এবং এমন এক বিশ্ববাণিজ্য যা পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের বণিকদের এই বদ্বীপে টেনে এনেছিল।
১. মুঘল সাম্রাজ্যের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি
মুঘল শান্তির (প্যাক্স মুঘলিকা) সুবাদে বাংলার কৃষি ও কুটির শিল্পে এক অবিশ্বাস্য বিপ্লব সাধিত হয়। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে বাংলায় আগত ফরাসি পর্যটক ও চিকিৎসক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার ১৬৬৮ সালে তাঁর ভ্রমণগ্রন্থে গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছিলেন:
“বাংলা রাজ্যে প্রবেশ করিবার জন্য শত দ্বার উন্মুক্ত রহিয়াছে, কিন্তু প্রস্থান করিবার একটি পথও নাই। পৃথিবীর কোথাও আমি এত অফুরন্ত চাল, চিনি, তরিতরকারি, হাঁস-মুরগি ও গবাদি পশুর প্রাচুর্য দেখি নাই। ইউরোপীয়রা আমেরিকার খনি হইতে যে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ ও রৌপ্য আনয়ন করে, বাংলার সিল্ক, মসলিন ও বস্ত্র ক্রয়ের জন্য তাহা এই ভূমিতে চিরতরে আটকা পড়িয়া যায়—যাহা এই দেশকে ধারণাতীতভাবে সমৃদ্ধ করিয়াছে।”
— ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ার, ট্রাভেলস ইন দ্য মোঘল এম্পায়ার (১৬৬৮ খ্রি.)
তৎকালীন বিশ্বে বাংলা ছিল মূল্যবান রৌপ্য ও স্বর্ণমুদ্রার এক সুবিশাল রিজার্ভার। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ডাচ ভিওসি (VOC), ফরাসি কোম্পানি এবং আর্মেনীয় বণিকরা জাহাজ বোঝাই রূপার বার এনে বাংলার পণ্য ক্রয় করত:
- ঢাকার বিশ্বখ্যাত মসলিন: মেঘনা নদীর তীরে উৎপন্ন বিরল প্রজাতির ফুটি কার্পাস তুলা থেকে ঢাকার তাঁতিরা তৈরি করতেন কিংবদন্তিতুল্য মসলিন—মলমল খাস, আব-ই-রওয়ান (প্রবহমান পানি) এবং শবনাম (ভোরের শিশির)। এই কাপড় এত সূক্ষ্ম ছিল যে ৫০ গজ দীর্ঘ একটি থান অনায়াসে একটি সাধারণ আংটির ভেতর দিয়ে পার করে দেওয়া যেত।
- রেশম ও জাহাজ নির্মাণ: কাশিমবাজার ও মুর্শিদাবাদে হাজার হাজার রেশম কারখানা গড়ে উঠেছিল। পাশাপাশি চট্টগ্রামের ডকইয়ার্ডে সুলভ মূল্যে উন্নত মেহগনি ও সেগুন কাঠে তৈরি হতো সুবিশাল যুদ্ধজাহাজ ও বাণিজ্যিক জাহাজ—যা উসমানীয় খিলাফত ও ইউরোপের নৌবাহিনীতেও ব্যবহৃত হতো।
- বারুদ তৈরিতে শোরা (সল্টপিটার): সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধে ইউরোপীয় সেনাবাহিনীগুলোর ব্যবহৃত কামানের বারুদের ৭০ শতাংশ উচ্চমানের পটাশিয়াম নাইট্রেট (শোরা) সরবরাহ করত বাংলা।
২. সুবাদার মীর জুমলা ও আসাম অভিযান (১৬৬০–১৬৬৩)
১৬৬০ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সেনাপতি মীর জুমলা-কে বাংলার সুবাদার নিযুক্ত করেন। ঢাকায় অবস্থান করে মীর জুমলা মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাত থেকে ঢাকাকে রক্ষা করতে শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীর মুখে সোনারকান্দা, হাজীগঞ্জ ও ইদ্রাকপুর দুর্গ নির্মাণ করে জলসীমান্ত নিশ্ছিদ্র করেন।
১৬৬১ সালের নভেম্বরে মীর জুমলা ১২ হাজার অশ্বারোহী, ৩০ হাজার পদাতিক এবং ৩২৩টি রণতরী নিয়ে আসাম অভিমুখে এক অবিস্মরণীয় অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি কোচবিহার জয় করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মধ্য দিয়ে আসামের রাজধানী গড়গাঁও অধিকার করেন। এই অভিযানের স্মারক হিসেবে মীর জুমলার তৈরি বিশালাকার ব্রোঞ্জের কামান বিবি মরিয়ম আজও ঢাকার ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে সংরক্ষিত।
৩. শায়েস্তা খাঁর সোনালী যুগ: শান্তি ও প্রাচুর্য (১৬৬৪–১৬৮৮)
মীর জুমলার পর সুবাদার নিযুক্ত হন সম্রাট আওরঙ্গজেবের মামা নবাব শায়েস্তা খাঁ। তিনি প্রায় চব্বিশ বছর (১৬৬৪–১৬৭৮ ও ১৬৮০–১৬৮৮) দক্ষতার সাথে বাংলা শাসন করেন। শায়েস্তা খাঁর আমল ছিল মুঘল বাংলার মহিমান্বিত স্বর্ণযুগ:
- চট্টগ্রাম বিজয় (১৬৬৬ খ্রি.): দীর্ঘকাল ধরে আরাকানের মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুরা (হার্মাদ) বাংলার উপকূলীয় জনপদে লুণ্ঠন ও দাস ব্যবসা চালিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। ১৬৬৫ সালে শায়েস্তা খাঁ এক বিশাল নৌ ও স্থল অভিযান পরিচালনা করেন। সন্দ্বীপের কাছে রক্তক্ষয়ী নৌযুদ্ধে মগ নৌবাহিনী ধ্বংস হয় এবং ১৬৬৬ সালের জানুয়ারিতে মুঘলরা চট্টগ্রাম দুর্গ জয় করে। শায়েস্তা খাঁ হাজার হাজার অপহৃত বাঙালি কৃষককে দাসত্ব থেকে মুক্ত করেন এবং চট্টগ্রামের নতুন নাম দেন ইসলামাবাদ।
- ঢাকার লালবাগ কেল্লা ও অনন্য স্থাপত্য: শায়েস্তা খাঁর সময়ে ঢাকায় নির্মিত হয় ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা (কেল্লা আওরঙ্গবাদ), তাঁর প্রিয় কন্যা ইরান দুখতের মার্বেল পাথরে মোড়ানো অপূর্ব সমাধি পরি বিবির মাজার, ছোট কাটরা সরাইখানা এবং সাত গম্বুজ মসজিদ।
- টাকায় আট মণ চাল: শায়েস্তা খাঁর সুশাসনের ফলে কৃষিজ প্রাচুর্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে মাত্র এক রৌপ্য টাকায় আট মণ (প্রায় ৩০০ কেজি) চাল পাওয়া যেত। তিনি ঢাকা ত্যাগ করার সময় নগরের পশ্চিম তোরণ বন্ধ করে দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন—যে শাসক ভবিষ্যতে টাকায় আট মণ চালের ব্যবস্থা করতে পারবেন, কেবল তিনিই এই তোরণ পুনরায় উন্মুক্ত করবেন।
৪. ইউরোপীয় বণিকদের আগমন ও কলকাতার পত্তন
বাংলার বিপুল বাণিজ্যের লোভে সপ্তদশ শতকের শেষভাগে ইউরোপের বৃহৎ বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলো ভাগীরথী নদীর তীরে একে একে কুঠি স্থাপন করে। ডাচরা চুঁচুড়ায়, ফরাসিরা চন্দননগরে এবং ডেনিশরা শ্রীরামপুরে বসতি গড়ে তোলে।
১৬৯০ সালের আগস্ট মাসে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি জব চার্নক ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীরে সুতানুটি গ্রামে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করেন। সুবাদার ইব্রাহিম খানের কাছ থেকে কোম্পানি সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলিকাতা—এই তিন গ্রামের জমিদারির স্বত্ব কিনে নেয় এবং সেখানে নির্মাণ করে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ। একটি সামান্য বাণিজ্যিক কুঠি হিসেবে শুরু হলেও মাত্র এক শতাব্দীর মধ্যে এই কলকাতা নগরীই পরিণত হয় সমগ্র ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের রাজধানীতে—যা শেষ পর্যন্ত বাংলার স্বাধীনতাকে গ্রাস করেছিল।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- বার্নিয়ার, ফ্রাঁসোয়া (১৬৭০)। ট্রাভেলস ইন দ্য মোঘল এম্পায়ার। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস।
- করিম, আবদুল (১৯৬৪)। ঢাকা: দ্য মুঘল ক্যাপিটাল। এশিয়াটিক সোসাইটি অব পাকিস্তান।
- প্রকাশ, ওম (১৯৮৫)। দ্য ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অ্যান্ড দ্য ইকোনমি অব বেঙ্গল। প্রিন্সটন।
- সরকার, যদুনাথ (১৯৪৮)। দ্য হিস্ট্রি অব বেঙ্গল: ২য় খণ্ড। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।