১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান নামক অবাস্তব ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রটির জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই পূর্ববঙ্গের জনগণ বুঝতে পারে যে তারা ব্রিটিশদের দাসত্ব থেকে মুক্তি পায়নি, বরং পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর এক নিষ্ঠুর অভ্যন্তরীণ উপনিবেশে বন্দি হয়েছে। পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিদের সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসন থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং বাংলার সোনালী আঁশ পাটের রপ্তানি আয় লুট করে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি ও ইসলামাবাদ গড়ে তোলা হয়। যখন এই শাসকগোষ্ঠী বাঙালির মাতৃভাষাকে মুছে ফেলার ধৃষ্টতা দেখায়, তখনই সূচিত হয় ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির মহান ভাষা আন্দোলন। রক্তে ভেজা সেই আত্মত্যাগ বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়—যার ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্টের বিজয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ছয় দফা এবং ১৯৬৯ সালের অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ভিত চিরতরে চূর্ণ হয়ে যায়।
১. অমর একুশে ফেব্রুয়ারি ও মহান ভাষা আন্দোলন (১৯৫২ খ্রি.)
দেশভাগের পরমুহূর্ত থেকেই পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালির ভাষার ওপর আঘাত হানে। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব করা হয়। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা গভর্নর-জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্না অহংকার করে ঘোষণা করেন:
“আমি আপনাদের অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানাইয়া দিতেছি যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হইবে একমাত্র উর্দু এবং অন্য কোনো ভাষা নহে। যে ব্যক্তি আপনাদের বিভ্রান্ত করিবার চেষ্টা করিবে, সে বাস্তবিকই পাকিস্তানের শত্রু।”
— মুহাম্মদ আলী জিন্না, কার্জন হলের ভাষণ (২৪ মার্চ ১৯৪৮)
কার্জন হলের সেই মুহূর্তেই তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সমবেত ছাত্ররা বজ্রকণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে: “না! না! না!” সমগ্র দেশের ৫৬ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে মাত্র ৪ শতাংশ মানুষের উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত বাঙালি মেনে নেয়নি।
১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে খাজা নাজিমুদ্দিন পুনরায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে সমগ্র পূর্ববঙ্গে আগুন জ্বলে ওঠে। সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন ১৩৫৮) দেশব্যাপী সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেয়। সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে।
২১শে ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সমবেত ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে দশজন দশজন করে মিছিল বের করে ব্যবস্থাপক পরিষদের দিকে অগ্রসর হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের সামনে পৌঁছামাত্র পুলিশ মিছিলে নির্বিচারে তাজা গুলি বর্ষণ করে। রাজপথ রঞ্জিত হয় আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, রফিক উদ্দিন আহমদ, আবদুস সালাম এবং নয় বছরের কিশোর অহিউল্লাহ ও শফিউর রহমানের তাজা রক্তে। পরদিন রাতেই ছাত্ররা গড়ে তোলে প্রথম শহীদ মিনার, যা পুলিশ ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। আবদুল গাফফার চৌধুরীর অমর গান বাঙালির জাতীয় শোকগীতিকায় রূপ নেয়:
“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি / আমি কি ভুলিতে পারি…”
রক্তাক্ত ২১শে ফেব্রুয়ারি একটি ভাষার দাবিকে অতিক্রম করে রূপান্তরিত হয় আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে। বাধ্য হয়ে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্ব দরবারে বাঙালির এই আত্মত্যাগকে চিরস্মরণীয় করে তোলে।
২. ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্টের মহাবিজয় ও সামরিক শাসন
১৯৫৪ সালের মার্চে পূর্ববঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সাধারণ নির্বাচন। শের-এ-বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় যুক্তফ্রন্ট। তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল ঐতিহাসিক ২১ দফা—যার মূল দাবি ছিল পূর্ববঙ্গের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন।
নির্বাচনে ঘটে এক অবিস্মরণীয় ব্যালট বিপ্লব: মুসলিমদের জন্য নির্ধারিত ২৩৭টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট পায় ২২৩টি আসন, আর ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন। কিন্তু গণরায়কে উপেক্ষা করে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় গভর্নর-জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন।
১৯৫৮ সালের অক্টোবরে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সংবিধান বাতিল করেন, রাজনীতি নিষিদ্ধ করেন এবং মৌলিক গণতন্ত্র (বেসিক ডেমোক্রেসি) নামক এক প্রহসনমূলক স্বৈরতন্ত্র চালু করেন।
৩. বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির মুক্তির সনদ ছয় দফা (১৯৬৬ খ্রি.)
১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে থাকে। কেন্দ্র পূর্ব বাংলার নিরাপত্তার জন্য মাত্র একটি ডিভিশন সৈন্য রেখে বাকি সমস্ত শক্তি কাশ্মীরে নিয়োগ করেছিল। যুদ্ধের পর ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সম্মেলনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান উত্থাপন করেন বাঙালির বাঁচার দাবি—ঐতিহাসিক ছয় দফা:
- ১ম দফা: লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্য একটি ফেডারেল রাষ্ট্রকাঠামো হবে এবং সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সংসদীয় গণতন্ত্র কায়েম থাকবে।
- ২য় দফা: কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকবে কেবল দুটি বিষয়—দেশরক্ষা এবং পররাষ্ট্র নীতি; বাকি সমস্ত বিষয় প্রদেশগুলোর অধীনে থাকবে।
- ৩য় দফা: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি পৃথক কিন্তু অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা থাকবে, অথবা মুদ্রা এক থাকলে প্রদেশ থেকে অর্থ পাচার রোধে সাংবিধানিক ব্যবস্থা থাকবে।
- ৪র্থ দফা: সকল প্রকার ট্যাক্স, কর ও শুল্ক ধার্য এবং আদায়ের ক্ষমতা থাকবে প্রদেশগুলোর হাতে; কেন্দ্রীয় সরকারকে ব্যয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রদেশ প্রদান করবে।
- ৫ম দফা: প্রদেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পৃথক হিসাব থাকবে এবং প্রদেশসমূহ নিজস্ব বাণিজ্য চুক্তি করার অধিকারী হবে।
- ৬ষ্ঠ দফা: আঞ্চলিক সংহতি ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য প্রদেশসমূহ নিজস্ব আধা-সামরিক বাহিনী (মিলিশিয়া বা প্যারা-মিলিটারি) গঠন ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
ছয় দফা ছিল মূলত বাঙালির স্বাধিকারের মহাসনদ (ম্যাগনা কার্টা)। আইয়ুব খান ছয় দফাকে “অস্ত্রের ভাষায় দমন” করার হুমকি দেন এবং শেখ মুজিব সহ হাজার হাজার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীকে বন্দি করেন। কিন্তু বাংলার প্রতিটি মানুষের অন্তরে ছয় দফা রূপ নেয় মুক্তির একমাত্র গন্তব্যে।
৪. আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান
শেখ মুজিবকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে আইয়ুব জান্তা ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে দায়ের করে কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য)। শেখ মুজিব এবং ৩৪ জন বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে তাঁরা ভারতের সাথে হাত মিলিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্ত করেছেন।
এই ষড়যন্ত্র মামলা বাঙালির ক্ষোভের বারুদে অগ্নিসংযোগ করে। ১৯৬৯ সালের শুরুতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলে ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলন, যা রূপ নেয় ১৯৬৯-এর অবিস্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানে। ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (আসাদ) পুলিশের গুলিতে শহীদ হন এবং ১৫ ফেব্রুয়ারি কুর্মিটোলা সেনানিবাসে বন্দি অবস্থায় বীর সার্জেন্ট জহুরুল হক-কে গুলি করে হত্যা করা হলে সমগ্র বাংলা বিদ্রোহের আগুনে জ্বলে ওঠে।
গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে আতঙ্কিত আইয়ুব সরকার ১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবুর রহমানকে বিনাশর্তে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে দশ লক্ষ জনতার ঐতিহাসিক মহাসমাবেশে ছাত্রসমাজের পক্ষ থেকে তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ভূষিত করেন এক অমর ও শাশ্বত উপাধিতে—“বঙ্গবন্ধু”। গণঅভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, যিনি সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন।
প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র
- উমর, বদরুদ্দীন (১৯৭০)। পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (১ম–৩য় খণ্ড)। মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা।
- জাহান, রওনক (১৯৭২)। পাকিস্তান: ফেইলিউর ইন ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশন। কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি প্রেস।
- রহমান, শেখ মুজিবুর (২০১২)। অসমাপ্ত আত্মজীবনী। দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।
- সবহান, রেহমান (১৯৬৮)। বেসিক ডেমোক্রেসিস অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ইন ইস্ট পাকিস্তান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
- মওদুদ আহমদ (১৯৭৯)। বাংলাদেশ: এরা অব শেখ মুজিবুর রহমান। ইউপিএল।