১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে এক অবিস্মরণীয় বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের মধ্য দিয়ে অস্তমিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলার সার্বভৌমত্বের রক্তিম সূর্য। নবাব মুর্শিদ কুলি খাঁ ও আলীবর্দী খাঁর হাত ধরে যে বাংলা এক স্বয়ংসম্পূর্ণ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে বিকশিত হয়েছিল, সেই স্বাধীনতাকে রক্ষা করতে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তেইশ বছর বয়সী তরুণ দেশপ্রেমিক নবাব সিরাজউদ্দৌলা। কিন্তু ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ধূর্ত সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ-এর সাথে হাত মিলিয়ে প্রধান সেনাপতি মীর জাফর এবং ধনকুবের ব্যাংকার জগৎ শেঠ যে জঘন্য দেশদ্রোহের জাল বুনেছিল, তার পরিণতিতে বাংলার ললাটে নেমে আসে প্রায় দুই শতকের ঔপনিবেশিক দাসত্ব ও শোষণের কালো অধ্যায়।

১. স্বাধীন নবাবী: মুর্শিদ কুলি খাঁ থেকে আলীবর্দী খাঁ

১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর দিল্লি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন বাংলায় এক অনন্য আর্থিক ও প্রশাসনিক বিপ্লব ঘটান মুর্শিদ কুলি খাঁ। ১৭১৭ সালে তিনি ঢাকাকে বিদায় জানিয়ে ভাগীরথীর তীরে মুর্শিদাবাদ-এ রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি নামমাত্র মুঘল আনুগত্য বজায় রেখে কার্যত স্বাধীন নবাবী প্রতিষ্ঠা করেন এবং ‘মালগুজারি’ ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলার অর্থনীতিকে সুদৃঢ় করেন।

পরবর্তীতে ১৭৪০ সালে সিংহাসনে বসেন সাহসী সেনানায়ক নবাব আলীবর্দী খাঁ। আলীবর্দীর ষোল বছরের শাসনকালের প্রধান সংকট ছিল মারাঠা বর্গীদের রক্তক্ষয়ী আক্রমণ (১৭৪১–১৭৫১ খ্রি.)। নাগপুরের রঘুজী ভোঁসলের নেতৃত্বে হাজার হাজার মারাঠা অশ্বারোহী প্রতি বছর বাংলায় ঢুকে গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে দিত এবং নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালাত (যা বাঙালির বিখ্যাত ঘুমপাড়ানি গানে স্থান পেয়েছে: “ছেলে ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো / বর্গী এলো দেশে…”)। আলীবর্দী বীরত্বের সাথে বর্গীদের প্রতিহত করেন এবং উড়িষ্যা ছেড়ে দিয়ে শান্তিচুক্তি করেন।

ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে আলীবর্দী কঠোর নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। তিনি প্রায়শই বলতেন: “ইউরোপীয়রা মৌমাছির ন্যায়; তাহাদিগকে বিরক্ত না করিলে উহারা মধু দিবে, কিন্তু উহাদের চাকে হাত দিলে উহারা হুল ফুটাইয়া মারিয়া ফেলিবে।”

২. সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসন আরোহণ ও ইংরেজ সংঘাত

১৭৫৬ সালের এপ্রিলে আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর তাঁর ভালোবাসার দৌহিত্র তেইশ বছরের তরুণ মির্জা মুহম্মদ সিরাজউদ্দৌলা মসনদে আরোহণ করেন। কিন্তু শুরুতেই তিনি পরিবার ও দরবারের ষড়যন্ত্রের মুখে পড়েন—একদিকে খালা ঘসেটি বেগম ও পূর্ণিয়ার শওকত জং, অপরদিকে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রকাশ্য ধৃষ্টতা:

  • অনুমতিহীন দুর্গ নির্মাণ: ফরাসিদের সাথে যুদ্ধের অজুহাতে ইংরেজরা নবাবের অনুমতি ব্যতিরেকে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে অতিরিক্ত প্রাচীর ও কামান স্থাপন করে।
  • দস্তকের অপব্যবহার: ইংরেজ কোম্পানির কর্মচারীরা শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সরকারি ছাড়পত্র ‘দস্তক’ ব্যক্তিগত চোরাচালানে ব্যবহার করে নবাবের রাজকোষকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত করছিল।
  • রাজকোষের অর্থ তছরুপকারীকে আশ্রয়: ঢাকার রাজকোষ থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাৎকারী কৃষ্ণদাসকে ইংরেজরা কলকাতায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রদান করে এবং নবাবের দূত নারায়ণ সিংহকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়।

সার্বভৌম কর্তৃত্ব রক্ষায় সিরাজ ১৭৫৬ সালের জুনে কলকাতা অভিযান চালিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ দখল করেন এবং ইংরেজদের বিতাড়িত করেন। এই পরাজয়ের গ্লানি ঢাকতে ব্রিটিশ চিকিৎসক জন যেফানিয়াহ হলওয়েল পরবর্তীতে “অন্ধকূপ হত্যা” (Black Hole Tragedy)-র কুখ্যাত রূপকথা বানিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রচার করেন যে একটি ১৮ ফুট কক্ষে ১৪৬ জন ইংরেজকে বন্দি করে ১২৩ জনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছিল—যা আধুনিক আন্তর্জাতিক গবেষকদের দ্বারা সম্পূর্ণ অসত্য ও যুদ্ধবাজ প্রোপাগান্ডা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।

৩. ক্লাইভ-মীর জাফর-জগৎ শেঠের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র

১৭৫৬ সালের ডিসেম্বরে মাদ্রাজ থেকে নৌবহর নিয়ে কলকাতায় আসেন ব্রিটিশ সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল চার্লস ওয়াটসন। ক্লাইভ কলকাতা পুনরুদ্ধার করেন এবং ফরাসিদের ঘাঁটি চন্দননগর দখল করেন। সিরাজের ৫০ হাজার সৈন্যের মুখোমুখি উন্মুক্ত যুদ্ধে জয়ের কোনো সম্ভাবনা নেই বুঝতে পেরে ক্লাইভ মুর্শিদাবাদের লোভী ও ক্ষুব্ধ অমাত্যদের সাথে গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।

এই ষড়যন্ত্রে যোগ দেন নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান, ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যাংকার ও মুদ্রা নিয়ন্ত্রক জগৎ শেঠ মহাতাব রায়, মহারাজা দুর্লভরাম (রায় দুর্লভ) এবং ধূর্ত ব্যবসায়ী উমিচাঁদ (আমির চাঁদ)। ১৭৫৭ সালের ৫ জুন স্বাক্ষরিত গোপন চুক্তি অনুযায়ী ঠিক হয়: যুদ্ধে মীর জাফর নিষ্ক্রিয় থাকবেন এবং সিরাজকে হটিয়ে ইংরেজরা মীর জাফরকে নবাব বানাবে; বিনিময়ে কোম্পানি পাবে বিপুল অর্থ ও চব্বিশ পরগনার জমিদারি, আর ক্লাইভ ব্যক্তিগতভাবে পাবেন লক্ষ লক্ষ পাউন্ড।

৪. পলাশীর আম্রকাননে ট্র্যাজেডি (২৩ জুন ১৭৫৭)

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সকালবেলা। মুর্শিদাবাদ থেকে ৩০ মাইল দক্ষিণে পলাশীর লক্ষ্মণবাগের আম্রকাননে মুখোমুখি হয় দুই বাহিনী। নবাবের পক্ষে ছিল ৫০ হাজার সৈন্য (৩৫ হাজার পদাতিক ও ১৫ হাজার অশ্বারোহী) এবং ফরাসি গোলন্দাজ সিনফ্রের পরিচালনায় ৫৩টি ভারী কামান। অপরদিকে রবার্ট ক্লাইভের সাথে ছিল মাত্র ৯৫০ জন ইউরোপীয় সৈন্য, ২,১০০ জন দেশীয় সিপাহি এবং ১০টি হালকা কামান।

যুদ্ধের শুরুতে নবাবের বিশ্বস্ত বীর সেনাপতি মীর মদন ও মোহন লাল বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁদের বিধ্বংসী কামানের মুখে ক্লাইভের বাহিনী দিশেহারা হয়ে আমবাগানের পরিখায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু দুপুর বারোটার দিকে হঠাৎ শুরু হয় মুষলধারে গ্রীষ্মের বৃষ্টি। ইংরেজরা ত্রিপল দিয়ে তাদের কামানের বারুদ ঢেকে রাখে, কিন্তু নবাবের অসতর্ক বাহিনী তা করতে ব্যর্থ হয়।

বৃষ্টি থামার পর ইংরেজদের বারুদ ভিজে গেছে ভেবে মীর মদন যখন অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে বীরদর্পে আক্রমণ চালান, তখন ইংরেজদের শুকনো কামান থেকে একঝাঁক গোলা এসে মীর মদনের বুকে বিদ্ধ হয়। বীর সেনাপতির শাহাদাতে তরুণ সিরাজ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তিনি মীর জাফরকে ডেকে নিজের রাজকীয় পাগড়ি তাঁর পায়ের কাছে রেখে বাংলার স্বাধীনতারক্ষার জন্য আকুল মিনতি জানান:

“সিরাজ নিজের মাথার পাগড়ি খুলিয়া মীর জাফরের পায়ের সম্মুখে রাখিয়া কাঁদিয়া বলিলেন: ‘আপনার কাছে আমি এই পাগড়ি ও আমার মান-সম্মান সঁপিয়া দিলাম। আপনি আমার মাতামহ আলীবর্দী খাঁর আজীবনের সঙ্গী; বাংলার এই চরম বিপদে দেশকে রক্ষা করিবার দায়িত্ব আপনার।’ মীর জাফর পবিত্র কুরআনে হাত রাখিয়া যুদ্ধ করিবার শপথ করিলেন, কিন্তু তাঁবু হইতে বাহির হইয়াই গোপনে ক্লাইভকে সংবাদ পাঠাইলেন অবিলম্বে আক্রমণ করিতে এবং নবাবকে যুদ্ধ বন্ধ করিয়া ছাউনিতে ফিরিবার পরামর্শ দিলেন।”
— গোলাম হোসেন সলিম, রিয়াজ-উস-সালাতিন (১৭৮৮ খ্রি.)

মোহন লালের বীর সৈন্যদল যখন প্রাণপণে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন প্রধান সেনাপতির নির্দেশে যুদ্ধ থামিয়ে পিছিয়ে আসার হুকুম আসে। মুহূর্তে নবাবের বিজয়ী সৈন্যদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। আর অন্যদিকে মীর জাফর, ইয়ার লতিফ ও রায় দুর্লভের অধীনে থাকা ৪০ হাজার সৈন্য কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইল—একটি বন্দুকের গুলিও ছুড়ল না। ক্লাইভের অতর্কিত আক্রমণে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় নবাবের বাহিনী।

বিশ্বাসঘাতকতার গভীরতা উপলব্ধি করে সিরাজ দ্রুত মুর্শিদাবাদে ফিরে সৈন্য সংগ্রহের চেষ্টা করেন, কিন্তু সবাই তাঁকে ত্যাগ করে। অবশেষে পাটনার উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে রাজমহলের কাছে তিনি ধরা পড়েন। ১৭৫৭ সালের ২ জুলাই রাতে মীর জাফরের পুত্র মিরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ নির্মমভাবে বন্দি সিরাজউদ্দৌলাকে হত্যা করে। পরদিন সিরাজের রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত মরদেহ হাতির পিঠে চড়িয়ে মুর্শিদাবাদের রাজপথে ঘোরানো হয়। সিরাজের পতনের সাথেই বাংলার স্বাধীনতার শেষ প্রদীপটি নিভে যায়—এবং সূচনা ঘটে প্রায় দুই শতাব্দীর এক নিষ্ঠুর ঔপনিবেশিক শোষণের মহাকাব্য।


প্রধান একাডেমিক তথ্যসূত্র

  • হিল, এস. সি. (১৯০৫)। বেঙ্গল ইন ১৭৫৬–১৭৫৭। জন মারে, লন্ডন।
  • সলিম, গোলাম হোসেন (১৭৮৮)। রিয়াজ-উস-সালাতিন (অনুবাদ: আবদুস সালাম)। এশিয়াটিক সোসাইটি।
  • মজুমদার, রমেশচন্দ্র (১৯৭৭)। দ্য মারাঠা সুপ্রিমেসি। ভারতীয় বিদ্যাভবন।
  • চৌধুরী, সুশীল (২০০০)। দ্য প্রিলিউড টু এম্পায়ার: পলাশী রেভোলিউশন অব ১৭৫৭। মনোহর।
  • গুপ্ত, বি. কে. (১৯৬৬)। সিরাজউদ্দৌলা অ্যান্ড দ্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ই. জে. ব্রিল, লাইডেন।