১৯১১ সালে আর্নেস্ট রাদারফোর্ডের পরমাণু নিউক্লিয়াস আবিষ্কারের পর ক্লাসিক্যাল পদার্থবিজ্ঞান এক চরম সংকটে পড়ল: ম্যাক্সওয়েলের তড়িৎ-চৌম্বকীয় তত্ত্ব অনুযায়ী ধনাত্মক নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে ঘূর্ণায়মান ত্বরান্বিত ইলেকট্রন নিরবচ্ছিন্ন শক্তি বিকিরণ করবে এবং এক পিকোসেকেন্ডেরও কম সময়ে সর্পিলাকারে নিউক্লিয়াসে পতিত হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে! মহাবিশ্বের কোনো বস্তুরই টিকে থাকার কথা ছিল না। ১৯১৩ সালে সাতাশ বছর বয়সী ড্যানিশ পদার্থবিজ্ঞানী নিলস বোর কোয়ান্টাম কক্ষপথের ধারণার মাধ্যমে এই বৈজ্ঞানিক অচলাবস্থার অবসান ঘটান।

গ্রহীয় মডেলের প্যারাডক্স ও রাদারফোর্ডের আবিষ্কার

রাদারফোর্ডের আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছিল যে পরমাণুর প্রায় সমস্ত ভর ও ধনাত্মক চার্জ একটি অতি ক্ষুদ্র কেন্দ্রে পুঞ্জীভূত—যাকে বলে নিউক্লিয়াস ($r sim ১০^{-১৫}$ মিটার), আর তাকে ঘিরে আবর্তন করছে ইলেকট্রনের মেঘ ($r sim ১০^{-১০}$ মিটার)। কিন্তু লারমরের ক্লাসিক্যাল সূত্র অনুযায়ী ত্বরান্বিত আধানের শক্তি ক্ষয়ের হার:

$$P = frac{q^2 a^2}{6pi varepsilon_0 c^3}$$

এর ফলে হাইড্রোজেন পরমাণুর ইলেকট্রন মাত্র $১.৬ times ১০^{-১১}$ সেকেন্ডে প্রোটনে আছড়ে পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে পরমাণু অত্যন্ত স্থিতিশীল এবং হাইড্রোজেন গ্যাসকে উত্তপ্ত করলে তা কোনো রংধনু নয়, বরং নির্দিষ্ট বিচ্ছিন্ন বর্ণালী রেখা (বামার সিরিজ) নির্গমন করে।

বোরের তিনটি বিপ্লবী স্বতঃসিদ্ধ

১৯১৩ সালে ফিলসফিক্যাল ম্যাগাজিন-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বোর রাদারফোর্ডের নিউক্লিয়ার কাঠামোর সাথে প্লাঙ্কের কোয়ান্টাম তত্ত্ব যুক্ত করে তিনটি মৌলিক স্বীকার্য ঘোষণা করলেন:

  1. স্থিতিশীল কক্ষপথ: ইলেকট্রন পরমাণুর ভেতরে কেবল নির্দিষ্ট কিছু অবিকিরণশীল বৃত্তাকার কক্ষপথে অবস্থান করে, যেখানে ক্লাসিক্যাল বিকিরণের নিয়ম প্রযোজ্য নয়।
  2. কৌণিক ভরবেগের কোয়ান্টায়ন: ঘূর্ণায়মান ইলেকট্রনের কৌণিক ভরবেগ $L$ প্লাঙ্কের হ্রাসকৃত ধ্রুবক $hbar = frac{h}{2pi}$-এর পূর্ণসংখ্যার গুণিতক:
    $$L = m_e v r = n hbar = frac{n h}{2pi}, quad n in {১, ২, ৩, dots}$$
  3. কোয়ান্টাম উল্লম্ফন (Quantum Jumps): ইলেকট্রন এক অনুমোদিত কক্ষপথ থেকে অন্য কক্ষপথে লাফিয়ে পড়ার সময়ই কেবল নির্দিষ্ট শক্তির ফোটন শোষণ বা বিকিরণ করে:
    $$Delta E = E_2 – E_1 = h nu$$

বোর ব্যাসার্ধ ও পরমাণুর শক্তিস্তর

কুলম্বের স্থির তড়িৎ আকর্ষণ বল এবং কেন্দ্রাতিগ বলের ভারসাম্য রক্ষা করে কৌণিক ভরবেগের কোয়ান্টায়ন শর্ত বসিয়ে বোর প্রতিটি কক্ষপথের ব্যাসার্ধের সূত্র প্রতিপাদন করলেন:

$$r_n = frac{4pi varepsilon_0 hbar^2}{m_e e^2} n^2 = a_0 n^2$$

প্রথম কক্ষপথের ($n = 1$) জন্য এই ব্যাসার্ধ হলো বিখ্যাত বোর ব্যাসার্ধ (Bohr radius):

$$a_0 approx ০.৫২৯ text{ অ্যাংস্ট্রম} = ০.৫২৯ times ১০^{-১০} text{ মিটার}$$

এবং ইলেকট্রনের মোট শক্তির স্তর নির্ধারিত হয়:

$$E_n = -frac{m_e e^4}{32 pi^2 varepsilon_0^2 hbar^2} frac{1}{n^2} = -frac{১৩.৬ text{ eV}}{n^2}$$

রিডবার্গ সূত্র ও বোর মডেলের ঐতিহাসিক বিজয়

দুই স্তরের শক্তির পার্থক্যের মাধ্যমে বোর বের করলেন বর্ণালী রেখার নির্ভুল গাণিতিক প্রতিপাদন, যা অভিজ্ঞতালব্ধ রিডবার্গ সূত্রের সাথে নিখুঁতভাবে মিলে গেল:

$$frac{1}{lambda} = R_infty left( frac{1}{n_1^2} – frac{1}{n_2^2} right), quad R_infty = frac{m_e e^4}{8 varepsilon_0^2 h^3 c} approx ১.০৯৭ times ১০^৭ text{ মিটার}^{-১}$$

আইনস্টাইন এই আবিষ্কার শুনে মন্তব্য করেছিলেন, “এটি বিজ্ঞানের অন্যতম সেরা আবিষ্কার।” বোরের এই সাফল্য কোয়ান্টাম বলবিদ্যার জন্ম দিল এবং কোপেনহেগেনকে পরিণত করল পৃথিবীর তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের প্রধান তীর্থক্ষেত্রে।