১৯৩৮ সালের ডিসেম্বর মাস—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তখন মানব সভ্যতা। সুইডেনের কনগালভ শহরে নির্বাসনে থাকা এক পদার্থবিজ্ঞানীর হাতে বার্লিন থেকে পাঠানো একটি চিঠি পৌঁছাল, যা বিজ্ঞানের গতিমুখ চিরতরে বদলে দিল। বার্লিনের রসায়নবিদ অটো হান ইউরেনিয়াম পরমাণুর ওপর নিউট্রন নিক্ষেপ করে ভারী মৌল তৈরি করতে গিয়ে পেয়েছিলেন বেরিয়াম—যার ভর ইউরেনিয়ামের প্রায় অর্ধেক! বিজ্ঞানী লিসা মাইটনার এবং তাঁর ভাগ্নে অটো ফ্রিশ তুষারাবৃত বনে হাঁটতে হাঁটতে অনুধাবন করলেন অবিশ্বাস্য সত্য: পরমাণুর কেন্দ্র দ্বিখণ্ডিত হয়েছে, আর মুক্ত হয়েছে আইনস্টাইনের $E = mc^2$ সূত্রের সেই বিধ্বংসী মহাজাগতিক শক্তি।

নিউক্লিয়াসের ভেতরের জগৎ ও নিউট্রনের আবিষ্কার

১৯৩২ সালে কেমব্রিজের ক্যাভেন্ডিশ ল্যাবরেটরিতে জেমস চ্যাডউইক পরমাণু নিউক্লিয়াসের শেষ মৌলিক উপাদান আবিষ্কার করলেন—নিউট্রন, যার ভর প্রোটনের প্রায় সমান কিন্তু কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ নেই ($m_n approx ১.৬৭৫ times ১০^{-২৭}$ কেজি)।

যেহেতু নিউট্রনের কোনো চার্জ নেই, তাই ধনাত্মক নিউক্লিয়াস একে বিকর্ষণ করে না। রোমে এনরিকো ফার্মি বুঝতে পারলেন যে ধীরগতির নিউট্রন হলো ভারী পরমাণুর বুক চিরে ভেতরে প্রবেশ করার আদর্শ হাতিয়ার।

বার্লিনের পরীক্ষাগার ও বেরিয়ামের ধাঁধা

বার্লিনে অটো হান এবং অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী লিসা মাইটনার ত্রিশ বছর ধরে একসাথে গবেষণা করছিলেন। কিন্তু ১৯৩৮ সালের জুলাইয়ে ইহুদি বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে নাৎসি জার্মানি থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে সুইডেনে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন মাইটনার।

বার্লিনে হান এবং ফ্রিটজ স্ট্রাসম্যান ইউরেনিয়ামে নিউট্রন আঘাত করে রাসায়নিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হলেন যে সেখানে বেরিয়াম ($Z = 56$) তৈরি হয়েছে। হতবাক হান গোপনে মাইটনারকে চিঠি লিখলেন: “ইউরেনিয়াম কি ভেঙে বেরিয়াম হয়ে যেতে পারে? তুমি পদার্থবিজ্ঞানের কোনো যুক্তি দিয়ে এর ব্যাখ্যা দিতে পারো?”

তরল ফোঁটা মডেল ও নিউক্লিয়াসের বিভাজন

কনগালভের জঙ্গলে বসে মাইটনার ও ফ্রিশ নিলস বোরের তরল ফোঁটা মডেল প্রয়োগ করলেন। একটি ভারী নিউক্লিয়াস হলো পানির ফোঁটার মতো—সবল নিউক্লীয় বল পৃষ্ঠটানের মতো একে একসাথে ধরে রাখে, আর ৯২টি প্রোটনের স্থির তড়িৎ বিকর্ষণ বল একে ভেঙে দিতে চায়।

ধীরগতির একটি নিউট্রন শোষণ করার পর ইউরেনিয়াম-২৩৫ নিউক্লিয়াস উত্তেজিত হয়ে ডাম্বেলের মতো লম্বাটে আকার ধারণ করে:

$$^{235}_{92}text{U} + ^1_0text{n} to ^{236}_{92}text{U}^* to ^{141}_{56}text{Ba} + ^{92}_{36}text{Kr} + ৩ ^1_0text{n} + Q$$

ডাম্বেলের মাঝের অংশ সরু হয়ে গেলে দুটি খণ্ডের প্রোটনগুলোর প্রবল কুলম্ব বিকর্ষণ বল নিউক্লিয়ার পৃষ্ঠটানকে ছাড়িয়ে যায় এবং আলোর গতির প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ গতিতে পরমাণুর কেন্দ্রটি সশব্দে ফেটে দুই টুকরো হয়ে যায়।

শক্তির নিখুঁত হিসাব: E = mc² এর বাস্তব রূপ

মাইটনার সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত হওয়া শক্তির হিসাব কষলেন। দুটি খণ্ডের মধ্যকার কুলম্ব বিকর্ষণজনিত গতিশক্তি দাঁড়ায়:

$$E = frac{1}{4pi varepsilon_0} frac{Z_1 Z_2 e^2}{r} approx ২০০ text{ MeV} approx ৩.২ times ১০^{-১১} text{ জুল}$$

এই বিপুল শক্তি কোথা থেকে এলো? মাইটনার ভর মেপে দেখলেন: বিভাজনের পর উৎপাদিত কণাগুলোর মোট ভর মূল ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসের চেয়ে প্রোটনের ভরের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিমাণ কম ($Delta m approx ০.২১৫ text{ u}$)। আইনস্টাইনের সূত্রে বসাতেই:

$$Q = Delta m c^2 approx ২০০ text{ MeV}$$

গণিত মিলে গেল নিখুঁতভাবে! জীববিজ্ঞানের কোষ বিভাজন থেকে ধার করে ফ্রিশ এর নাম দিলেন ফিশন (Fission)। এরপর লিও সিজার্ড যখন বুঝলেন প্রতিটি ফিশনে একাধিক নতুন নিউট্রন মুক্ত হয়, তখন স্বয়ংক্রিয় চেইন রিঅ্যাকশনের সম্ভাবনা উন্মুক্ত হলো—শুরু হলো ভয়াল ও অমিত সম্ভাবনাময় পারমাণবিক যুগ।