আলো আসলে কী? আইজ্যাক নিউটনের মতে, আলো ছিল অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার (Corpuscles) প্রবাহ, যা বিলিয়ার্ড বলের মতো সরলরেখায় চলে প্রতিফলিত হয়। অন্যদিকে ডাচ গণিতবিদ ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন্স দাবি করেছিলেন, আলো কোনো কণা নয়—বরং মহাশূন্যে ইথারের মধ্য দিয়ে সঞ্চালিত এক যান্ত্রিক তরঙ্গ। নিউটনের বিপুল খ্যাতির কারণে প্রায় এক শতাব্দী ধরে হাইগেন্সের তরঙ্গ তত্ত্ব উপেক্ষিত ছিল। অবশেষ ১৮০১ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী টমাস ইয়াং একটি কার্ডবোর্ডে দুটি সূক্ষ্ম ছিদ্র করে আলোর প্রকৃতি নিয়ে শতাব্দীর বিতর্ক চিরতরে বদলে দেন।

১. হাইগেন্সের নীতি ও তরঙ্গাভিমুখের জ্যামিতি

১৬৭৮ সালে ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন্স প্রস্তাব করেন যে, কোনো তরঙ্গের প্রতিটি বিন্দু এক একটি গৌণ তরঙ্গের উৎস হিসেবে কাজ করে। এই গৌণ তরঙ্গগুলো তাদের নিজস্ব গোলকীয় তরঙ্গ তৈরি করে সম্মুখপানে এগিয়ে যায় এবং তাদের স্পর্শক রেখা পরবর্তী নতুন তরঙ্গাভিমুখ (Wavefront) গঠন করে।

হাইগেন্সের তত্ত্বে বলা হয়েছিল, আলো যখন হালকা মাধ্যম থেকে ঘন মাধ্যমে প্রবেশ করে, তখন তার গতি কমে যায়। কিন্তু নিউটনের কণা তত্ত্ব বলত উল্টো কথা—ঘন মাধ্যমের কণাগুলো আলোর কণাকে আকর্ষণ করায় পানিতে আলোর গতি বৃদ্ধি পাবে। তৎকালীন সময়ে আলোর গতি সঠিকভাবে পরিমাপ করার প্রযুক্তি ছিল না।

২. টমাস ইয়াং-এর দ্বি-চির ব্যতিচার পরীক্ষা (১৮০১)

টমাস ইয়াং গতি না মেপেই আলোর তরঙ্গের প্রমাণ দেন। আলো যদি নিরেট কণা হতো, তবে দুটি সমান্তরাল ছিদ্রের মধ্য দিয়ে গিয়ে পেছনের পর্দায় কেবল দুটি উজ্জ্বল রেখা তৈরি হতো। কিন্তু আলো যদি তরঙ্গ হয়, তবে দুটি চির থেকে নির্গত তরঙ্গ পরস্পরের ওপর আপতিত হবে।

যেখানে একটি তরঙ্গের শীর্ষ অপর তরঙ্গের শীর্ষের সাথে মেলে, সেখানে গঠনমূলক ব্যতিচার (Constructive Interference) ঘটে এবং উজ্জ্বল আলোর সৃষ্টি হয়। আর যেখানে তরঙ্গের শীর্ষের সাথে তরঙ্গপাদ মেলে, সেখানে ধ্বংসাত্মক ব্যতিচারে অন্ধকার সৃষ্টি হয়। পর্দায় দেখা গেল চমৎকার আলো ও অন্ধকারের পর্যায়ক্রমিক ব্যতিচার ডোরার প্যাটার্ন:

$$d sintheta = mlambda quad (text{উজ্জ্বল পট্টি বা গঠনমূলক})$$
$$d sintheta = left(m + frac{1}{2}right)lambda quad (text{অন্ধকার পট্টি বা ধ্বংসাত্মক})$$

ইয়াং পর্দার ডোরার ব্যবধান পরিমাপ করে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরিমাপ করেন এবং দেখান যে বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য প্রায় ৪০০ ন্যানোমিটার এবং লাল আলোর প্রায় ৭০০ ন্যানোমিটার।

৩. ফ্রেনেল এবং পয়সনের উজ্জ্বল বিন্দু (Poisson’s Spot)

১৮১৮ সালে ফরাসি বিজ্ঞানী ওগুস্তাঁ-জঁ ফ্রেনেল তরঙ্গের সুনির্দিষ্ট গাণিতিক রূপ দাঁড় করান। নিউটনপন্থী গণিতবিদ সিমেওঁ পোয়াসোঁ ফ্রেনেলকে ভুল প্রমাণ করার জন্য ব্যঙ্গ করে বলেন: “ফ্রেনেলের সমীকরণ মানলে তো একটি নিরেট গোলকাকার বস্তুর ছায়ার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে একটি উজ্জ্বল আলোর বিন্দু দেখা যাওয়ার কথা—যা হাস্যকর!”

বিজ্ঞানী ফ্রাঁসোয়া আরাগো তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষাটি করে দেখেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে দেখা গেল, নিরেট গোলকের ছায়ার ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতেই ফুটে উঠেছে একটি উজ্জ্বল আলোকবিন্দু! যে যুক্তি দিয়ে তরঙ্গ তত্ত্বকে উড়িয়ে দিতে চাওয়া হয়েছিল, তা-ই হয়ে উঠল তার চরম বিজয় প্রমাণ।

তরঙ্গ বনাম কণা: ইয়াং ও ফ্রেনেলের গবেষণা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করল আলো তরঙ্গ। তবে এক শতাব্দী পর প্লাঙ্ক ও আইনস্টাইন প্রমাণ করবেন যে নিউটনের কণাবাদী ধারণাও পুরোপুরি ভুল ছিল না—উন্মোচিত হবে আলোক-তড়িৎ ক্রিয়া ও কোয়ান্টাম ডাবল-নেচার।