১৯৬০-এর দশকের শেষের দিকে কণা পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল প্রায় সম্পূর্ণ হয়ে উঠলেও এর মূলে ছিল এক ভয়াবহ সংকট: প্রকৃতির মৌলিক সমীকরণগুলো অনুযায়ী কোনো কণারই কোনো নিজস্ব ভর থাকার কথা ছিল না! ইলেকট্রন ও কোয়ার্ক যদি ভরহীন হতো, তবে তারা আলোর গতিতে ছুটে বেড়াত—পরমাণু কখনো দানা বাঁধত না, তৈরি হতো না কোনো নক্ষত্র, গ্রহ বা মানবদেহ। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর ২০১২ সালের ৪ জুলাই সুইজারল্যান্ডের সার্নে (CERN) পৃথিবীর সর্বকালের সবচেয়ে বৃহৎ যন্ত্র—লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে আবিষ্কৃত হলো বহু প্রতীক্ষিত হিগস বোসন কণা, যা উন্মোচন করল ভরের আসল উৎস।

গেজ প্রতিসাম্যের বাধা: ভর কেন নিষিদ্ধ?

কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরিতে মৌলিক মিথস্ক্রিয়াগুলো গেজ প্রতিসাম্য দ্বারা পরিচালিত হয়। সমীকরণে কোনো কণার ভর ($m$) সরাসরি যুক্ত করলে অমনি মৌলিক প্রতিসাম্য ভেঙে খানখান হয়ে যায় এবং সমীকরণগুলো অসীমে বিস্ফোরিত হয়। ফলে কণাদের স্বভাবজাত কোনো ভর থাকার উপায় ছিল না।

হিগস-এংলার্ট মেকানিজম ও মেক্সিকান হ্যাট বিভব

১৯৬৪ সালে পিটার হিগস, ফ্রাঁসোয়া এংলার্ট এবং রবার্ট ব্রুট এক অভূতপূর্ব গাণিতিক সমাধান প্রস্তাব করলেন। প্রকৃতির মৌলিক সূত্রগুলো প্রতিসাম্য বজায় রাখলেও আমাদের মহাবিশ্বের শূন্যস্থান (ভ্যাকুয়াম) নিজেই একটি বিশেষ ক্ষেত্র ধারণ করে—হিগস ক্ষেত্র (Higgs Field)।

এই ক্ষেত্রের শক্তি বিভব দেখতে অবিকল মেক্সিকান টুপির মতো (Mexican Hat Potential):

$$V(Phi) = mu^2 |Phi|^2 + lambda |Phi|^4$$

টুপির চূড়াটি প্রতিসম হলেও তা অস্থির। মহাবিশ্ব সৃষ্টি হওয়ার পর শীতল হতে হতে হিগস ফিল্ড টুপির খাঁজে গড়িয়ে পড়ে এবং পুরো মহাবিশ্বজুড়ে এক স্থায়ী মান ধারণ করে—যাকে বলে ভ্যাকুয়াম প্রত্যাশা মান (VEV):

$$v approx ২৪৬ text{ GeV}$$

কণারা কীভাবে ভর লাভ করে?

মহাবিশ্বের সর্বত্র অদৃশ্য মধুর মতো ছড়িয়ে থাকা এই হিগস ক্ষেত্রের ভেতর দিয়ে চলার সময় বিভিন্ন কণা বাধাগ্রস্ত হয়। যে কণা হিগস ক্ষেত্রের সাথে যত বেশি মিথস্ক্রিয়া করে (ইউকাওয়া কাপলিং), সে কণা তত বেশি জড়তা বা ভর অনুভব করে:

$$m_f = frac{y_f v}{sqrt{2}}$$

টপ কোয়ার্ক তীব্রভাবে আটকে যায়, তাই তা বিপুল ভারী; ইলেকট্রন খুব কম মিথস্ক্রিয়া করে, তাই তা অতি হালকা; আর ফোটন হিগস ক্ষেত্রের সাথে বিন্দুমাত্র মিথস্ক্রিয়া করে না, তাই সে সম্পূর্ণ ভরহীন হয়ে আলোর গতিতে ছুটে চলে! আর এই হিগস ক্ষেত্রের নিজস্ব কম্পনই হলো হিগস বোসন কণা।

লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার ও ২০১২ সালের ঐতিহাসিক দিন

এই কণা শনাক্ত করার জন্য জেনেভায় ভূগর্ভের ১০০ মিটার গভীরে তৈরি করা হয় ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ বৃত্তাকার সুরঙ্গ—লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার (LHC)। অতিপরিবাহী চুম্বকের সাহায্যে দুটি প্রোটন রশ্মিকে আলোর গতির ৯৯.৯৯৯৯৯৯১% গতিতে ত্বরান্বিত করে পরস্পরের সাথে প্রবল শক্তিতে সংঘর্ষ ঘটানো হয়।

২০১২ সালের ৪ জুলাই সার্নের মিলনায়তনে যখন ৮৩ বছর বয়সী অশ্রুসজল পিটার হিগসের সামনে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানী দল ঘোষণা করল যে ১২৫ জিইভি ($১২৫.১ text{ GeV}/c^2$) ভরের হিগস বোসন কণা নিখুঁতভাবে ধরা পড়েছে—তখন পুরো বিজ্ঞান জগত আনন্দে ফেটে পড়ে। প্রমাণিত হলো মহাবিশ্বের শূন্যস্থান আসলে শূন্য নয়, এক অনন্ত শক্তির মহাকাব্যিক উৎস।