বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশক নাগাদ বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্ব পরিচালনাকারী চারটি মৌলিক বলকে চিহ্নিত করেছিলেন: মহাকর্ষ বল, তড়িৎ-চৌম্বকীয় বল, সবল নিউক্লীয় বল এবং তেজস্ক্রিয় বিটা ক্ষয়ের জন্য দায়ী দুর্বল নিউক্লীয় বল। তড়িৎ-চৌম্বক বলের বাহক ছিল ভরহীন ফোটন এবং এর বিস্তার ছিল অসীম; আর দুর্বল বল কাজ করত কেবল পরমাণুর কেন্দ্রের অতি ক্ষুদ্র সীমানায় ($১০^{-১৮}$ মিটার)। এই দুটি আপাত বিপরীতধর্মী বলকে একত্রিত করা প্রায় অসম্ভব মনে হচ্ছিল—যতক্ষণ না পাকিস্তানি পদার্থবিজ্ঞানী আবদুস সালাম, আমেরিকান পদার্থবিজ্ঞানী স্টিভেন ওয়াইনবার্গ এবং শেলডন গ্ল্যাশো প্রতিসাম্য ভাঙনের জাদুকরী তত্ত্ব প্রয়োগ করে জন্ম দিলেন ঐক্যবদ্ধ তড়িৎ-দুর্বল তত্ত্ব (Electroweak Theory)।

ফার্মির দুর্বল তত্ত্ব ও গেজ প্রতিসাম্যের দ্বন্দ্ব

১৯৩৪ সালে এনরিকো ফার্মি বিটা ক্ষয়ের ব্যাখ্যায় চার-ফার্মিয়ন মিথস্ক্রিয়ার সূত্র দিয়েছিলেন। নিম্ন শক্তিতে তা চমৎকার কাজ করলেও উচ্চ শক্তিতে ($৩০০ text{ GeV}$-এর বেশি) সমীকরণগুলো ভেঙে পড়ত এবং রিনরমালাইজ করা সম্ভব হচ্ছিল না।

ইয়াং-মিলস গেজ তত্ত্বে বলের বাহক কণাগুলোকে হতে হয় ভরহীন (যেমন ফোটন)। কিন্তু দুর্বল বলের বাহক কণাগুলো যদি ভরহীন হতো, তবে দুর্বল বলের প্রভাব অসীম দূর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকার কথা—বাস্তবে যা কখনোই ঘটে না।

সালাম-ওয়াইনবার্গ-গ্ল্যাশো মডেল

১৯৬১ সালে শেলডন গ্ল্যাশো দেখান যে তড়িৎ ও দুর্বল বলের পেছনে $SU(2)_L times U(1)_Y$ প্রতিসাম্য গ্রুপ কাজ করতে পারে। কিন্তু কণাগুলোকে ভর দেওয়ার উপায় তিনি বের করতে পারেননি।

১৯৬৭-৬৮ সালে স্টিভেন ওয়াইনবার্গ এবং লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের অধ্যাপক আবদুস সালাম স্বাধীনভাবে হিগস মেকানিজম প্রয়োগ করলেন। তাঁরা দেখালেন যে মহাবিশ্বের সৃষ্টির প্রথম মুহূর্তে যখন তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি ছিল, তখন এই দুই বল অবিকল এক ছিল। কিন্তু মহাবিশ্ব শীতল হওয়ার সাথে সাথে হিগস ফিল্ড শূন্যস্থানে এক নির্দিষ্ট মান ($v approx ২৪৬ text{ GeV}$) অর্জন করে—যার ফলে মূল প্রতিসাম্যটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভেঙে যায় (Spontaneous Symmetry Breaking):

$$SU(2)_L times U(1)_Y to U(1)_{text{EM}}$$

ওয়াইনবার্গ কোণ এবং W ও Z বোসন

প্রতিসাম্য ভেঙে যাওয়ার ফলে চারটি বলের বাহক কণার মধ্যে তিনটি কণা বিপুল ভর অর্জন করে এবং একটি কণা চিরতরে ভরহীন থেকে যায় (ফোটন):

  • চার্জযুক্ত দুর্বল বোসন ($W^pm$): ভর প্রায় ৮০ $text{GeV}/c^2$ (প্রোটনের চেয়ে ৮০ গুণ ভারী!)
  • নিরপেক্ষ দুর্বল বোসন ($Z^0$): ভর প্রায় ৯১ $text{GeV}/c^2$
  • তড়িৎ-চৌম্বক ফোটন ($gamma$): ভর অবিকল শূন্য

এখানে $theta_W$ হলো বিখ্যাত ওয়াইনবার্গ কোণ (Weinberg Angle), যা তড়িৎ চার্জ ও দুর্বল বলের সম্পর্কের সেতুবন্ধন:

$$e = g sin theta_W$$

গার্গামেল ও সার্নে W এবং Z বোসনের আবিষ্কার

সালাম ও ওয়াইনবার্গের তত্ত্বের সবচেয়ে সাহসী ভবিষ্যদ্বাণী ছিল একটি সম্পূর্ণ নতুন ধরনের মিথস্ক্রিয়া: নিরপেক্ষ দুর্বল কারেন্ট (Neutral Weak Current), যা পূর্বে কখনো দেখা যায়নি। ১৯৭৩ সালে সার্ন (CERN)-এর বিশালাকার গার্গামেল বুদবুদ চেম্বারে নিউট্রিনো আঘাতের ফলে একটি ইলেকট্রনের পিছু হটার স্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া গেল—প্রমাণিত হলো নিরপেক্ষ কারেন্ট সত্য।

১৯৭৯ সালে আবদুস সালাম, স্টিভেন ওয়াইনবার্গ এবং শেলডন গ্ল্যাশোকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। চার বছর পর, ১৯৮৩ সালে সার্নের প্রোটন-অ্যান্টিপ্রোটন সংঘর্ষক যন্ত্রে কার্লো রুবিয়া এবং সিমন ভ্যান ডার মীর সরাসরি $W^pm$ ও $Z^0$ কণা দুটি আবিষ্কার করলেন কাঁটায় কাঁটায় তাদের ভবিষ্যদ্বাণীকৃত ভরে। তড়িৎ, চুম্বকত্ব এবং তেজস্ক্রিয়তা চিরতরে একই সূত্রে গাঁথা হলো।