১৮৬৫ সালে স্কটিশ পদার্থবিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল প্রকাশ করেন তাঁর যুগান্তকারী গবেষণা “এ ডায়নামিক্যাল থিওরি অব দ্য ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড”। রিচার্ড ফাইনম্যান পরবর্তীকালে একে উনবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে আখ্যায়িত করেন: তড়িৎ, চুম্বকত্ব এবং আলোকবিদ্যাকে চারটি সংহত ব্যবকলনীয় সমীকরণের মাধ্যমে একটি সার্বজনীন কাঠামোতে আবদ্ধ করার ইতিহাস।
কুলম্ব, অ্যাম্পিয়ার ও ফ্যারাডের বিচ্ছিন্ন ধারা
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তড়িৎ এবং চুম্বকত্বকে সম্পূর্ণ পৃথক প্রাকৃতিক ঘটনা মনে করা হতো। রেশমে ঘষা অ্যাম্বার পালককে আকর্ষণ করে, আবার ম্যাগনেটাইট পাথর উত্তর-দক্ষিণে মুখ করে থাকে। ১৭৮৫ সালে শার্ল দ্য কুলম্ব দুটি স্থির আধানের মধ্যে ক্রিয়াশীল বলের দূরত্বের ব্যস্তানুপাতিক বর্গের সূত্র ($F propto frac{q_1 q_2}{r^2}$) আবিষ্কার করেন।
১৮২০ সালের বসন্তে হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান ওয়েরস্টেড এক বক্তৃতার সময় দেখান যে পরিবাহী তারে তড়িৎ প্রবাহিত হলে পাশে থাকা কম্পাস শলাকা বিচ্যুত হয়। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে অঁদ্রে-মারি অ্যাম্পিয়ার তড়িৎবাহী তারের মধ্যকার চৌম্বক বল পরিমাপ করেন।
কিন্তু প্রকৃত বৈপ্লবিক দর্শন নিয়ে এলেন মাইকেল ফ্যারাডে। কোনও প্রথাগত গণিত না জানা সত্ত্বেও তিনি জ্যামিতিক অনুভূতির সাহায্যে উদ্ভাবন করলেন ক্ষেত্র বা চৌম্বক বলরেখার ধারণা। ১৮৩১ সালে ফ্যারাডে আবিষ্কার করেন তড়িৎ-চৌম্বকীয় আবেশ: একটি পরিবর্তনশীল চৌম্বক ফ্লাক্স একটি বর্তনীতে তড়িৎচ্চালক বল সৃষ্টি করে ($mathcal{E} = -frac{dPhi_B}{dt}$)।
ম্যাক্সওয়েলের গাণিতিক বিপ্লব: সরণ প্রবাহ
ফ্যারাডে দেখিয়েছিলেন পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্র তড়িৎ ক্ষেত্র তৈরি করে। ম্যাক্সওয়েল যখন অ্যাম্পিয়ারের সূত্রে ডাইভারজেন্স প্রয়োগ করলেন, তখন তিনি একটি মৌলিক ত্রুটি লক্ষ্য করলেন। ডাইভারজেন্স অফ কার্ল সর্বদা শূন্য ($nabla cdot (nabla times mathbf{B}) equiv 0$); কিন্তু একটি ধারক (ক্যাপাসিটর) চার্জ হওয়ার সময় আধানের ধারাবাহিকতা সমীকরণ ($nabla cdot mathbf{J} = -frac{partial rho}{partial t}$) অ্যাম্পিয়ারের মূল সূত্রের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
ম্যাক্সওয়েল সাহসের সাথে সমীকরণে একটি নতুন পদ যোগ করলেন: সরণ প্রবাহ ($mathbf{J}_D = varepsilon_0 frac{partial mathbf{E}}{partial t}$)। এর মাধ্যমে প্রমাণিত হলো যে পরিবর্তনশীল তড়িৎ ক্ষেত্রও চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে—এক অভূতপূর্ব প্রতিসাম্য সৃষ্টি হলো প্রকৃতিতে।
ম্যাক্সওয়েলের চারটি সমীকরণ
অলিভার হেভিসাইড কর্তৃক আধুনিক ভেক্টর রূপে প্রকাশিত ম্যাক্সওয়েলের চারটি সমীকরণ হলো ক্লাসিক্যাল তড়িৎ-চৌম্বকবিদ্যার ভিত্তি:
$$nabla cdot mathbf{E} = frac{rho}{varepsilon_0} quad text{(তড়িৎ ক্ষেত্রে গাউসের সূত্র)}$$
$$nabla cdot mathbf{B} = 0 quad text{(চৌম্বক ক্ষেত্রে গাউসের সূত্র — চৌম্বক একক মেরুর অনুপস্থিতি)}$$
$$nabla times mathbf{E} = -frac{partial mathbf{B}}{partial t} quad text{(ফ্যারাডের আবেশ সূত্র)}$$
$$nabla times mathbf{B} = mu_0 mathbf{J} + mu_0 varepsilon_0 frac{partial mathbf{E}}{partial t} quad text{(অ্যাম্পিয়ার-ম্যাক্সওয়েল সূত্র)}$$
আলো: একটি তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ
শূন্যস্থানে যেখানে কোনো আধান ($rho = 0$) বা পরিবাহী প্রবাহ ($mathbf{J} = 0$) নেই, সেখানে ফ্যারাডের সূত্রে কার্ল প্রয়োগ করে ম্যাক্সওয়েল ত্রিমাত্রিক তরঙ্গ সমীকরণ প্রতিপাদন করলেন:
$$nabla^2 mathbf{E} = mu_0 varepsilon_0 frac{partial^2 mathbf{E}}{partial t^2}$$
এই সমীকরণ সরাসরি তরঙ্গ বেগ দেয় কেবল দুটি ধ্রুবকের অনুপাত থেকে:
$$c = frac{1}{sqrt{mu_0 varepsilon_0}} approx ৩.০ times ১০^৮ text{ মিটার/সেকেন্ড}$$
“আমরা এই সিদ্ধান্তে না পৌঁছে পারি না যে আলো প্রকৃতপক্ষে একই মাধ্যমের অনুপ্রস্থ স্পন্দন, যা তড়িৎ ও চৌম্বক ঘটনার কারণ।” — জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, ১৮৬৫
১৮৮৭ সালে হেনরিখ হার্টজ ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে রেডিও তরঙ্গ তৈরি ও শনাক্ত করে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বের অভ্রান্ততা প্রমাণ করেন। আলোকবিজ্ঞান চিরতরে তড়িৎ-চৌম্বকবিদ্যার অন্তর্ভূক্ত হলো।