১৯১৬ সালের জুনে আলবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতার গাণিতিক সূত্রে দেখালেন যে ত্বরান্বিত ভারী বস্তু মহাবিশ্বের স্থান-কালের চাদরে ঢেউ তোলে, যা আলোর গতিতে ছড়িয়ে পড়ে—মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (Gravitational Waves)। কিন্তু বস্তুর সাথে মহাকর্ষের মিথস্ক্রিয়া এতটাই অতি সূক্ষ্ম যে আইনস্টাইন নিজেও বিশ্বাস করতেন না মানবজাতি কখনো তা সরাসরি মাপতে পারবে। আইনস্টাইনের তাত্ত্বিক অনুমানের ঠিক এক শতাব্দী পর ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আমেরিকার ৩০০০ কিলোমিটার ব্যবধানে অবস্থিত লাইগো (LIGO)-র দুটি বিশালাকার ইন্টারফেরোমিটার ১৩০ কোটি আলোকবর্ষ দূর থেকে আসা দুটি ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষের তরঙ্গ ধারণ করে মহাকাশ বিজ্ঞানের এক নতুন যুগের দ্বার উন্মোচন করল।
আইনস্টাইনের তরঙ্গ সমীকরণ ও চতুর্মেরু সূত্র (Quadrupole Formula)
দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রে স্থান-কালকে বিবেচনা করা যায় সমতল মিনকভস্কি মেট্রিকের সাথে এক অতিক্ষুদ্র বিচ্যুতির ($h_{munu}$) যোগফল হিসেবে:
$$g_{munu} = eta_{munu} + h_{munu}$$
এই সমীকরণ সাজালে আলোর গতির মতো ত্রিমাত্রিক তরঙ্গ সমীকরণ তৈরি হয়:
$$Box h_{munu} = -frac{16pi G}{c^4} T_{munu}$$
মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নির্গমনের মোট ক্ষমতা নির্ভর করে ভরের চতুর্মেরু মোমেন্টের (Quadrupole Moment) পরিবর্তনের ওপর:
$$P = frac{G}{5c^5} leftlangle dddot{I}_{ij} dddot{I}_{ij} rightrangle$$
যেহেতু হরে রয়েছে আলোর গতির পঞ্চম ঘাত ($c^5 approx ২.৪৩ times ১০^{৪২}$), তাই সাধারণ কোনো বস্তুর নড়াচড়ায় এই তরঙ্গ তৈরি হয় না বললেই চলে; কেবল ব্ল্যাক হোল বা নিউট্রন নক্ষত্রের মতো মহাজাগতিক দানবদের প্রলয়ংকরী সংঘর্ষেই এমন তরঙ্গ তৈরি সম্ভব যা পরিমাপ করা যায়।
লাইগো (LIGO): মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সংবেদনশীল কান
রেনার ওয়েইস, কিপ থর্ন এবং রোনাল্ড ড্রেভারের পরিকল্পনায় নির্মিত Advanced LIGO-র রয়েছে দুটি ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এল-আকৃতির বাহু বিশিষ্ট লেজার ইন্টারফেরোমিটার—একটি ওয়াশিংটনের হ্যানফোর্ডে এবং অন্যটি লুইজিয়ানার লিভিংস্টোনে।
যখন একটি মহাকর্ষীয় তরঙ্গ পৃথিবীর ভেতর দিয়ে যায়, তখন সে স্থান-কালকে বাঁকিয়ে এক বাহুর দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে দেয় এবং অন্য বাহুর দৈর্ঘ্য সংকুচিত করে:
$$h = frac{2 Delta L}{L}$$
পৃথিবীতে পৌঁছানো তরঙ্গের মাত্রা ছিল প্রায় $h sim ১০^{-২১}$। ৪ কিলোমিটারের বাহুতে দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন দাঁড়ায়:
$$Delta L approx ১০^{-১৮} text{ মিটার}$$
যা একটি প্রোটনের ব্যাসের হাজার ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম! এই অবিশ্বাস্য পরিমাপ নিখুঁত করার জন্য কোয়ান্টাম আলোকবিজ্ঞান ও চার স্তরের পেন্ডুলামে ঝুলানো ৪০ কেজির বিশুদ্ধ সিলিকা কাঁচের দর্পণ ব্যবহার করা হয়।
GW150914: মহাবিশ্বের প্রথম কান খোলা
২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ইউটিসি ০৯:৫০:৪৫ সময়ে লাইগোর দুটি ডিটেক্টরে ০.২ সেকেন্ডের এক অদ্ভুত হুইসেল বা ‘চিরপ’ সংকেত বেজে উঠল। কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা গেল:
আজ থেকে ১৩০ কোটি বছর পূর্বে ৩৬টি সূর্যের সমান ভরের এবং ২৯টি সূর্যের সমান ভরের দুটি কৃষ্ণগহ্বর আলোর অর্ধেকেরও বেশি গতিতে ঘুরতে ঘুরতে একে অপরকে গ্রাস করে ৬২টি সূর্যের ভরের একটি একক ব্ল্যাক হোলে পরিণত হয়েছে। আর পলকের মধ্যে ৩টি সূর্যের সমান ভর সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে মহাবিশ্বে বিস্ফোরিত হয়েছে:
$$E = ৩ M_odot c^2 approx ৫.৪ times ১০^{৪৭} text{ জুল}$$
সেই ক্ষণিক মুহূর্তে ওই একক সংঘর্ষ থেকে নিঃসৃত মহাকর্ষীয় বিকিরণ মহাবিশ্বের সমস্ত দৃশ্যমান ছায়াপথের সমস্ত তারার সমন্বিত আলোর চেয়েও বেশি শক্তিশালী ছিল!
মাল্টি-মেসেঞ্জার জ্যোতির্বিজ্ঞান
২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট দুটি নিউট্রন নক্ষত্রের সংঘর্ষ (GW170817) শনাক্ত হওয়ার মাত্র ১.৭ সেকেন্ড পর মহাকাশে গামা-রে টেলিস্কোপে তার আলোক সংকেত পাওয়া গেল। বিশ্বজুড়ে ৭০টি অপটিক্যাল টেলিস্কোপ সেই স্থানে সোনা ও প্ল্যাটিনামের মতো ভারী মৌল সৃষ্টির প্রমাণ (কিলোনোভা) পেল। মানবজাতি এতকাল মহাবিশ্বকে কেবল আলোর চোখে দেখত; এখন সে মহাবিশ্বের স্থান-কালের স্পন্দন শোনার কান লাভ করল।