১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণাঙ্গনে কামান দাগার মাঝে জার্মান জ্যোতির্বিজ্ঞানী কার্ল শোয়ার্জশিল্ড আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা সমীকরণের প্রথম নিখুঁত সমাধান বের করলেন। তাঁর সমীকরণে ফুটে উঠল মহাবিশ্বের এক অবিশ্বাস্য ও ভয়াল রূপ: যদি কোনো গোলকাকার ভরকে একটি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের ভেতর সংকুচিত করা হয়, তবে তার মুক্তিবেগ আলোর গতিকেও ছাড়িয়ে যাবে—জন্ম নেবে এমন এক মহাকর্ষীয় অতল গহ্বর যেখান থেকে আলো পর্যন্ত কখনো ফিরে আসতে পারে না: কৃষ্ণগহ্বর (Black Hole)।
শোয়ার্জশিল্ড মেট্রিক ও ঘটনা দিগন্ত (Event Horizon)
একটি অঘূর্ণায়মান ভরের বাইরের স্থান-কালের জ্যামিতি নির্ধারিত হয় শোয়ার্জশিল্ড মেট্রিক দ্বারা:
$$ds^2 = -left(1 – frac{r_s}{r}right) c^2 dt^2 + left(1 – frac{r_s}{r}right)^{-1} dr^2 + r^2 dOmega^2$$
এই সমীকরণে দুটি অদ্ভুত সীমা রয়েছে:
- ঘটনা দিগন্ত ($r = r_s$): কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশের এক অদৃশ্য সীমানা, যাকে অতিক্রম করলে আর কোনোভাবেই বাইরের জগতে ফেরা যায় না। একে বলা হয় শোয়ার্জশিল্ড ব্যাসার্ধ:
$$r_s = frac{2GM}{c^2}$$ পুরো পৃথিবীকে ব্ল্যাক হোল বানাতে চাইলে এর ব্যাসার্ধ হতে হবে মাত্র ৯ মিলিমিটার; আর সূর্যের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৩ কিলোমিটার। - কেন্দ্রীয় সিঙ্গুলারিটি ($r = 0$): কৃষ্ণগহ্বরের কেন্দ্রস্থল, যেখানে সমস্ত ভর একটি শূন্য আয়তনের বিন্দুতে পুঞ্জীভূত হয়ে স্থান-কালের বক্রতা ও ঘনত্বকে অসীম করে দেয়—যেখানে সাধারণ আপেক্ষিকতা সমীকরণ নিজেই ভেঙে পড়ে।
চন্দ্রশেখর সীমা ও নক্ষত্রের অন্তিম নিয়তি
১৯৩০ সালে মাত্র উনিশ বছর বয়সে ভারতীয় বিজ্ঞানী সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর জাহাজে মাদ্রাজ থেকে ইংল্যান্ড যাওয়ার পথে নক্ষত্রদের অন্তিম নিয়তি হিসাব করলেন। কোয়ান্টাম ইলেকট্রন অবক্ষয় চাপ এবং মহাকর্ষের মধ্যকার ভারসাম্য হিসাব করে তিনি প্রমাণ করলেন শ্বেত বামন নক্ষত্রদের একটি সর্বোচ্চ ভরের সীমা রয়েছে—চন্দ্রশেখর সীমা (Chandrasekhar Limit):
$$M_{text{Ch}} approx ১.৪৪ M_odot$$
সূর্যের ভরের ১.৪৪ গুণের চেয়ে ভারী নক্ষত্র মহাকর্ষীয় পতন রোধ করতে পারে না; তারা চুপসে গিয়ে তৈরি করে নিউট্রন স্টার অথবা চূড়ান্তভাবে ব্ল্যাক হোল।
হকিং বিকিরণ ও কৃষ্ণগহ্বরের তাপগতিবিদ্যা
১৯৭২ সালে জ্যাকব বেকেনস্টাইন দেখান যে কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্তের ক্ষেত্রফল আসলে তার বিশৃঙ্খলা বা এনট্রপির পরিমাপ। ১৯৭৪ সালে স্টিফেন হকিং কৃষ্ণগহ্বরের সীমানায় কোয়ান্টাম ফিল্ড থিওরি প্রয়োগ করে এক অভাবনীয় সত্য প্রকাশ করলেন: কৃষ্ণগহ্বর পুরোপুরি কালো নয়; তারা ধীরে ধীরে তাপীয় বিকিরণ ছড়ায়—যাকে বলে হকিং বিকিরণ (Hawking Radiation):
$$T_H = frac{hbar c^3}{8pi G M k_B}$$
এবং কৃষ্ণগহ্বরের মোট এনট্রপি তার ঘটনা দিগন্তের ক্ষেত্রফলের এক-চতুর্থাংশের সমান:
$$S_{text{BH}} = frac{k_B c^3 A}{4 G hbar}$$
তথ্য প্যারাডক্স ও প্রথম বাস্তব আলোকচিত্র
হকিংয়ের এই আবিষ্কার জন্ম দেয় ব্ল্যাক হোল ইনফরমেশন প্যারাডক্সের: কৃষ্ণগহ্বর বাষ্পীভূত হয়ে বিলীন হয়ে গেলে তার ভেতরে পড়া সমস্ত তথ্যের কী হবে? কোয়ান্টাম বলবিদ্যার তথ্য অবিনশ্বরতার নীতি কি তবে মিথ্যা? এই বিতর্ক সমাধানের চেষ্টাই জন্ম দিয়েছে আধুনিক হলোগ্রাফিক নীতি ও স্ট্রিং থিওরির নতুন দিগন্তের।
২০১৯ সালের এপ্রিলে ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ (EHT) বিশ্বজুড়ে আটটি রেডিও টেলিস্কোপ একত্রিত করে দূরবর্তী M87 গ্যালাক্সির দানবীয় কৃষ্ণগহ্বরের ঘটনা দিগন্তের ছায়ার প্রথম বাস্তব ছবি তোলে। ১০০ বছর পূর্বে আইজ্যাক নিউটনের ধারণাকে অতিক্রম করে যে মহাকর্ষীয় গহ্বরের স্বপ্ন দেখেছিলেন আইনস্টাইন ও শোয়ার্জশিল্ড—তা মানবজাতির চোখে এক বাস্তব মহাজাগতিক সত্য হিসেবে ধরা দিল।