১৬৬৫ সালে যখন মহামারি প্লেগের কারণে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়, তখন বাইশ বছর বয়সী ছাত্র আইজ্যাক নিউটন ফিরে যান লিংকনশায়ারের উলসথর্পের নির্জন গ্রামে। পরবর্তী আঠারো মাসের সেই ঐতিহাসিক নির্জনতায় নিউটন মানব ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রার সূচনা করেন: তিনি তৈরি করেন ক্যালকুলাসের ভিত্তি, আলোর বর্ণালী পরীক্ষা এবং মহাকর্ষের আদিম রূপরেখা। এর বাইশ বছর পর, ১৬৮৭ সালে রয়্যাল সোসাইটি থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর সর্বকালের সেরা গ্রন্থ: ফিলোসফিয়ে ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথমেটিকা।

১. চিরায়ত বলবিদ্যার ভিত্তি: নিউটনের তিনটি গতিসূত্র

নিউটন কোনো দার্শনিক ভাবাবেগ দিয়ে শুরু করেননি; তিনি শুরু করেছিলেন ভর, ভরবেগ ($p = mv$) এবং বলের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞার মাধ্যমে:

$$text{প্রথম সূত্র (জড়তা): } sum vec{F} = 0 implies frac{dvec{v}}{dt} = 0$$

বাইরে থেকে বল প্রয়োগ না করলে স্থির বস্তু চিরকাল স্থির থাকবে এবং গতিশীল বস্তু সুষম দ্রুতিতে সরলরেখায় চলতে থাকবে।

$$text{দ্বিতীয় সূত্র (বলবিদ্যা): } vec{F} = frac{dvec{p}}{dt} = mfrac{dvec{v}}{dt} = mvec{a}$$

বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের হার তার ওপর প্রযুক্ত বলের সমানুপাতিক এবং বল যেদিকে ক্রিয়া করে বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনও সেদিকেই ঘটে।

$$text{তৃতীয় সূত্র (ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া): } vec{F}_{A to B} = -vec{F}_{B to A}$$

প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।

২. সার্বজনীন মহাকর্ষ: আপেল পতন থেকে চাঁদের আবর্তন

নিউটনের সবচেয়ে বড় অন্তর্দৃষ্টি ছিল একীকরণ: যে বলের কারণে গাছের আপেল নিচে মাটিতে পড়ে, ঠিক সেই একই মহাকর্ষ বল চাঁদকে সরলরেখায় মহাশূন্যে ছিটকে না দিয়ে পৃথিবীর কক্ষপথে বেঁধে রেখেছে।

পৃথিবীর ব্যাসার্ধের সাথে চাঁদের দূরত্বের তুলনা করে তিনি দেখেন, চাঁদ পৃথিবী থেকে প্রায় ৬০ পৃথিবীর ব্যাসার্ধ দূরে অবস্থিত। আর চাঁদের ত্বরণ পৃথিবীর পৃষ্ঠের ত্বরণের চেয়ে ঠিক $৬০^২ = ৩৬০০$ গুণ কম:

$$frac{g}{a_{text{moon}}} approx frac{৯.৮}{০.০০২৭২} approx ৩৬০০ = ৬০^২$$

এখান থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দূরত্বের বর্গের বিপরীতানুপাতিক সূত্র (Inverse-Square Law):

$$F = G frac{m_1 m_2}{r^2}$$

৩. কেপলারের সূত্রের গাণিতিক প্রমাণ

নিউটনের আগে ইয়োহানেস কেপলার পর্যবেক্ষণ থেকে গ্রহদের গতির তিনটি নিয়ম দিয়েছিলেন, কিন্তু কেন গ্রহগুলো এমন করে ঘোরে তার কোনো ভৌত কারণ তিনি জানতেন না। নিউটন তাঁর নতুন গণিত ক্যালকুলাস প্রয়োগ করে প্রমাণ করেন যে কেন্দ্রীয় মহাকর্ষ বলের প্রভাবেই:

  1. গ্রহদের কক্ষপথ উপবৃত্তাকার হতে বাধ্য যার একটি ফোকাসে সূর্য থাকে।
  2. কৌণিক ভরবেগের সংরক্ষণশীলতার কারণে সমান সময়ে সমান ক্ষেত্রফল অতিক্রান্ত হয়।
  3. আবর্তনকালের বর্গ কক্ষপথের অর্ধ-মুখ্য অক্ষের ঘনফলের সমানুপাতিক ($T^2 propto a^3$)।
$$T^2 = left(frac{4pi^2}{G(M + m)}right) a^3$$
ঘড়ির মতো সুশৃঙ্খল বিশ্ব: নিউটনের প্রিন্সিপিয়া প্রমাণ করল যে স্বর্গ আর মর্ত্য আলাদা কোনো নিয়ম মানে না। সমস্ত মহাবিশ্ব একটি বিশাল, নিয়মতান্ত্রিক ও গাণিতিক ঘড়ির মতো অভিন্ন ভৌত নীতিতে পরিচালিত।